ফোনে স্ক্রলে ব্যস্ত রাখার জন্য কি টিভি শোগুলো ইচ্ছা করেই সহজ করে বানানো হচ্ছে

তুমি কি খেয়াল করেছ, প্রিয় কোনো সিরিজ দেখার সময়ও আমরা হাত থেকে ফোনটা নামাই না? একদিকে টিভি চলে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করি বা চ্যাট করি! এটা এখন প্রায় অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা নিয়ে নতুন একটা আলাপ সামনে এসেছে। আলাপটা হলো, দর্শকরা যেহেতু একই সঙ্গে দুই স্ক্রিনে মনোযোগ দিচ্ছেন, তাই নির্মাতারা ইচ্ছা করে গল্পটাকে সহজ করে তুলছেন, যাতে দর্শক ফোনে ব্যস্ত থাকলেও গল্পের প্লট বুঝতে পারেন।

এই বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে বিবিসির ‘আদার সাইড অব দ্য স্টোরি’। এটিকে বলতে পারো একটি নতুন ধারণা, যার নাম ‘সেকেন্ড স্ক্রিন ভিউইং’ বা দ্বিতীয় স্ক্রিন দেখা।

দ্বিতীয় স্ক্রিন দেখা বলতে বোঝায়, টিভি দেখার সময় একই সঙ্গে অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করা। যেমন ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ। একসময় টেলিভিশন ছিল প্রধান বিনোদনমাধ্যম। দর্শক মনোযোগ দিয়ে একটি অনুষ্ঠান দেখতেন। কিন্তু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম আসার পর সব বদলে গেল। আগে মানুষ নির্দিষ্ট সময় ধরে সিনেমা বা অনুষ্ঠান বেছে নিয়ে দেখত। এখন যেকোনো সময় যেকোনো কনটেন্ট বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। ফলে টিভি ধীরে ধীরে অনেকের জন্য মূল বিনোদন থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাকটিভিটিতে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

অনলাইনে অনেক দর্শক মনে করেন, স্ট্রিমিংয়ের এই অতিরিক্ত পছন্দ করে নেওয়ার সুযোগ টেলিভিশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। এক রেডিট ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘কোনো শো আর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে না। এক ছুটির দিনে দেখে ফেলা হলে তারপর নতুন শো এসে এর জায়গা নিয়ে নেয়।’ দ্বিতীয় স্ক্রিন দেখা নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করছেন। এখন কোনো সিনেমা বা সিরিজে গল্পের চরিত্ররা বারবার নিজেদের অনুভূতি বা পরিকল্পনা স্পষ্ট করে বলে। যেন দর্শক অমনোযোগী হলেও গল্প বুঝতে পারেন। কিছু দর্শকের মতে, ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর শেষ সিজনে এসে এমন সরল গল্প বলার উদাহরণ দেখা গেছে।

টিকটকে এক ব্যবহারকারী দর্শকদের আহ্বান জানিয়েছেন, ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’–এর সিজন পাঁচে এক্সপোজিটরি ডায়ালগগুলো খেয়াল করতে। এক্সপোজিটরি ডায়ালগ হলো এমন সংলাপ, যা গল্প এগিয়ে নেওয়ার বদলে সরাসরি ব্যাখ্যা করে দেয়। তাঁর দাবি, চরিত্ররা ঘরে ঢুকে কী করছে, কী ভাবছে, সবকিছু স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে। ভিডিওটি প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ভিউ পেয়েছে। ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’–এর রেডিট কমিউনিটিতেও এমন পোস্ট দেখা গেছে। একজন লিখেছেন, ‘এই এক্সপোজিশন ডাম্পগুলো বন্ধ হোক’। এটি রেডিটে হাজার হাজার আপভোট ও শত শত মন্তব্য পেয়েছে। কেউ লিখেছেন, ‘আমরা ছয় বছরের শিশু নই যে সবকিছু বানান করে বুঝিয়ে দিতে হবে। আমি এর জন্য নেটফ্লিক্সকে দায়ী করি।’ আরেকজন বলেছেন, ‘নেটফ্লিক্সের সেকেন্ড স্ক্রিন নীতির ফল এটা। মানুষ টিকটক স্ক্রল করতে করতে শো দেখে। তাই নির্মাতারা গল্প সহজ করছেন।’

আরও পড়ুন

এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছেন হলিউড তারকারাও। নেটফ্লিক্সের সিনেমা ‘দ্য রিপ’ প্রচারের সময় অভিনেতা ও প্রযোজক ম্যাট ডেমন দাবি করেছেন, নেটফ্লিক্স নাকি লেখকদের বলে, দর্শক ফোনে ব্যস্ত থাকে, তাই সংলাপে তিন-চারবার প্লট পুনরাবৃত্তি করা খারাপ হবে না। যদিও তিনি ছবিটির লেখক ছিলেন না, তবে ১৯৯৮ সালে ‘গুড উইল হান্টিং’-এর চিত্রনাট্যের সহলেখক হিসেবে তিনি অস্কার জিতেছিলেন।

অভিনেত্রী জামিলা জামিলও এক পডকাস্টে বলেছেন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো নাকি অভিনেতাদের বলে দিতে চায়, দর্শক সারাক্ষণ ফোনে থাকে। তাই গল্প এমনভাবে সহজ করতে হয়, যাতে ফোন স্ক্রল করলেও দর্শক গল্পের সঙ্গে তাল রাখতে পারেন।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু গল্প নয়, দর্শক কীভাবে নতুন কনটেন্ট খুঁজে পাবেন, সেটিও সহজ করা হয়েছে। মার্কিন সাহিত্য সাময়িকী এন+১-এর একটি প্রবন্ধে দাবি করা হয়েছে, নেটফ্লিক্স দর্শকের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের আগ্রহের সঙ্গে মিল থাকা শব্দ বা ছবির মাধ্যমে অ্যাপের ভেতরের বিজ্ঞাপন সাজায়। সিনেমা বা সিরিজের নাম ও পোস্টার এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন দর্শক শুরুতেই বুঝে যান যে কনটেন্টটি কী নিয়ে। তাদের মতে, এভাবে সহজ করলে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট অনেক রকম দর্শকের কাছে সহজে উপস্থাপন করা যায়।

তবে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেকেন্ড স্ক্রিন ভিউইং বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ম্যাট ডেমনের মতো শিল্পীদের বক্তব্য থাকলেও নির্দিষ্ট প্রমাণ বা অফিশিয়াল ঘোষণা নেই। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন