এক বছর না খেয়েও কিছু সাপ কীভাবে বেঁচে থাকে, নতুন গবেষণায় উত্তর জানা গেল
সাপ নিয়ে আমরা যতটুকু জানি, সম্ভবত তার চেয়ে বেশি আমাদের না জানা। আমাদের চোখের সামনে সচরাচর এরা থাকে না। এদের দেখে মনে হয়, এরা যেন ভিন্ন কোনো জগতের বাসিন্দা। এদের সবকিছুই আলাদা। শিকার গিলে খেতে পারে এরা। চুপচাপ এক জায়গায় বসে শিকারের অপেক্ষা করে। এরাই আবার মাসের পর মাস না খেয়ে থাকে। কখনো এক বছরের বেশি সময় ধরে এরা একেবারেই কিছু খায় না। বিষয়টি খুবই অবিশ্বাস্য। বহু বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা এর সঠিক ব্যাখ্যা করতে পারেননি। কিন্তু এবার গবেষকেরা মনে করছেন, এ রহস্যের দরজা অবশেষে খুলছে।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, আরলিংটনের জিনতত্ত্ববিদ টড কাস্টো সায়েন্স সাময়িকীকে বলেছেন, ‘তথ্যগুলো আমাদের চোখের সামনেই ছিল।’ তিনি এ গবেষণায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তবে গবেষকদলটি বিষয়টিকে গভীরভাবে দেখেছে। তো কী এমন পাওয়া গেল, যা এত দিন চোখের আড়ালে ছিল?
এই গল্পের পেছনে আছে একটি হরমোন, নাম ঘ্রেলিন। মানুষের শরীরে এটি মূলত পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হয় এবং মস্তিষ্ককে জানিয়ে দেয়, ‘এখন খাওয়ার সময়।’ একে অনেক সময় ‘ক্ষুধা হরমোন’ বলা হয়। একসময় বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, এই হরমোনই হয়তো ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা খাই খাই ইচ্ছার মতো সমস্যার মূলে আছে। কিন্তু পরে দেখা যায়, বিষয়টি এত জটিল যে শুধু ঘ্রেলিন বন্ধ করলেই ক্ষুধা বা ওজন কমে না। ফলে এর কাজকর্ম সম্পর্কে গবেষকদের জানাশোনা অসম্পূর্ণ ছিল।
এই নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নেন, স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাইরে অনুসন্ধান করবেন। তাঁরা ১১২টি সরীসৃপ প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে আছে সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ, টিকটিকিসহ আরও অনেক প্রাণী। এই অনুসন্ধানে সামনে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যায়, ৩২ ধরনের সাপ, ৪ ধরনের গিরগিটি এবং দুই ধরনের টোডহেড আগামা ঘ্রেলিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জিন প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে।
পর্তুগালের পোর্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবিদ ও গবেষণার সহলেখক রুই রেসেন্দে পিন্টো জানিয়েছেন, কিছু সাপের জিনোমে ঘ্রেলিন জিনের শুধু ছোট ছোট ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে। কোথাও আবার জিনটি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আবার কোথাও এত বিকৃত যে তা দিয়ে কার্যকর হরমোন তৈরি হওয়া অসম্ভব। এই ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, একাধিক সরীসৃপ গোষ্ঠীতে আলাদা আলাদা সময়ে এই জিন হারিয়ে গেছে। এমনকি সাপদের মধ্যেই হয়তো একাধিকবার এ ঘটনা ঘটেছে।
ঘ্রেলিনই একমাত্র অনুপস্থিত উপাদান, এমনটা নয়। এর কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম এমবিওএটি৪। এটিও এই চরম খাদ্যসহিষ্ণু প্রাণীদের মধ্যে নেই। গবেষকদের মতে, এই দুটি জিনের অনুপস্থিতি কাকতালীয় নয়। বরং এটি সেই সব শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত অভিযোজনের ফল, যার মাধ্যমে সাপের মতো প্রাণীরা টিকে থাকতে শিখেছে। যেহেতু এদের শিকার পাওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
মানুষ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে উপোস থাকলে ঘ্রেলিন শরীরকে বলে দেয়, চর্বি পোড়াও, শক্তি তৈরি করো, খাবার খুঁজে বের করো। কিন্তু সাপ, কিছু গিরগিটি ও আগামা টিকটিকির কৌশল আলাদা। এরা অনুসরণ করে ‘সিট-অ্যান্ড-ওয়েট’ বা বসে অপেক্ষা করার শিকারকৌশল। মানে এরা এক জায়গায় চুপচাপ বসে থাকে, যতক্ষণ না শিকার নিজেই এদের নাগালে আসে।
এ ধরনের শিকারপদ্ধতিতে খাবার পাওয়া অনিশ্চিত। তাই এসব প্রাণী এমন কৌশল গড়ে তুলেছে, যাতে বিশ্রামের সময় এদের শক্তি খরচ সবচেয়ে কম থাকে। ঘ্রেলিন হরমোনের জিন হারিয়ে গেছে ঠিক এ কারণেই। গবেষকদের মতে, এর ফলে না খেয়ে থাকা ও হজমের সময় শরীরের বিপাকীয় হার স্তন্যপায়ীদের তুলনায় বিপরীতভাবে কাজ করে। এখান থেকেই এসেছে সেই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। মাসের পর মাস, এমনকি এক বছরের বেশি সময় না খেয়েও বেঁচে থাকার শক্তি পায় এরা।
গবেষকেরা এই আবিষ্কারকে ভীষণ রকমের বিস্ময়কর মনে করছেন। শুধু সাপ নয়, অন্য প্রাণীর শরীরেও ঘ্রেলিন কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার পথে এটি হতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স