ক্লদ মোনের আঁকা আইরিস কত কোটি টাকায় বিক্রি হলো

ক্লদ মোনের আঁকা ছবি আইরিসআর্ট নিউজ ডোটকম

নিলাম ঘরে তখন টান টান উত্তেজনা। একের পর এক দাম হাঁকছেন ক্রেতারা। একজন দাম বাড়ান, অন্যজন তাঁর চেয়েও আরও বেশি বলেন। এভাবে চলল প্রায় ৪৫ মিনিট। শেষ পর্যন্ত ছবিটি কিনে নিলেন এশিয়ার এক সংগ্রাহক। দাম? ৫০ মিলিয়ন ইউরোরও বেশি! বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে অঙ্কটা প্রায় ৬৯৫ কোটি।

ছবিটির নাম আইরিস। শিল্পী ফরাসি চিত্রকর ক্লদ মোনে। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর প্যারিসে নিলামকারী প্রতিষ্ঠান সোথেবির আয়োজিত নিলামে ছবিটি বিক্রি হয়েছে ৫০ দশমিক শূন্য ৪৫ মিলিয়ন ইউরোতে, যা প্রায় ৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফ্রান্সে কোনো নিলামে বিক্রি হওয়া শিল্পকর্মের মধ্যে এটি নতুন রেকর্ড গড়েছে। এর আগে ফ্রান্সে আর কোনো ছবি এত বেশি দামে বিক্রি হয়নি।

কিন্তু একটা ছবির দাম এত বেশি হবে কেন? রং আর ক্যানভাসে আঁকা একটি ছবি কীভাবে কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ হয়ে ওঠে?

আরও পড়ুন

ছবিতে কী আছে

আইরিস ছবিতে ফুটে উঠেছে মোনের বাগানের ফুল। ছবিটি প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু, আর চওড়ায় প্রায় ছয় ফুট। সেখানে আইরিস ফুলগুলো যেন দুলছে। পেছনে দেখা যায় আকাশের প্রতিচ্ছবি। সেই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোনের বিখ্যাত জলবাগানের স্মৃতি, যেখানে পানির ওপর শাপলা-জাতীয় জলজ উদ্ভিদের পাতা ও ফুল ভেসে থাকত।

মোনে ছিলেন ইমপ্রেশনিজম নামে একটি শিল্পধারার অন্যতম প্রধান শিল্পী। এই ধারার শিল্পীরা কোনো দৃশ্যের প্রতিটি খুঁটিনাটি হুবহু আঁকার চেয়ে আলো, রং ও মুহূর্তের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগ দিতেন। ধরো, বিকেলের রোদে গাছের পাতার রং বদলে গেল। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী সেই আলো-ছায়ার পরিবর্তনকে ছবিতে ধরতে চাইতেন।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মোনে ১৯২৪ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছবিটি এঁকেছিলেন। তখন তাঁর জীবনের শেষ সময় চলছে। ১৯২৬ সালে মারা যান এই শিল্পী। অর্থাৎ ছবিটি আঁকা হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর অল্প কয়েক বছর আগে।

তবে আইরিস শুধু একটি সুন্দর ছবিই নয়। এর আরেকটি বিশেষত্ব আছে। নিলামে ওঠার আগে ছবিটি কখনো জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এটি ছিল ব্যক্তিগত সংগ্রহে, সাধারণ দর্শকদের চোখের আড়ালে।

আরও পড়ুন
ক্লদ মোনে (১৮৪০–১৯২৬)
ব্রিটানিকা থেকে নেওয়া

৪৫ মিনিটের দর-কষাকষি

ছবিটি বিক্রির সময় অন্তত ছয়জন সম্ভাব্য ক্রেতা টেলিফোনের মাধ্যমে দর হাঁকাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে দাম বাড়ানোর এই লড়াই প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চলে। শেষ পর্যন্ত এশিয়ার এক ব্যক্তিগত সংগ্রাহক ছবিটি কেনেন। তিনি সোথেবির এশিয়া বিভাগের উপপ্রধান জেন হুয়ার মাধ্যমে ফোনে দর দিচ্ছিলেন।

আধুনিক শিল্পকর্মের কেনাবেচায় বিশেষজ্ঞ লন্ডনের শিল্পব্যবসায়ী হেলি নাহমাদ এত দীর্ঘ দর-কষাকষি আগে দেখেননি বলে জানান। তাঁর মতে, এমন ছবি খুবই বিরল। ছবিটির দাম নিয়ে আগেই ধারণা করা হয়েছিল। নিলামের আগে বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন, এটি ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ইউরোতে বিক্রি হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাম সেই অনুমানকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যায়।

এটা অবশ্য মোনের সবচেয়ে দামি ছবি নয়। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের সোথেবিতে তাঁর ম্যুল (শস্যের স্তূপ) নামে একটি ছবি বিক্রি হয়েছিল ১১০.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। তবে ফ্রান্সের নিলামে এত দামে কোনো শিল্পকর্ম বিক্রির ঘটনা আগে ঘটেনি।

আরও পড়ুন

ছবিটি এত দিন কোথায় ছিল

আইরিস চিত্রকর্মের গল্পে দুই নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাঁদের একজন ক্যাতিয়া গ্রানোফ, প্যারিসের এক অগ্রগামী শিল্পব্যবসায়ী। অন্যজন জ্যানে শ্লুমবারজে, যিনি শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতেন।

মোনে মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে মিশেল উত্তরাধিকারসূত্রে বাবার আঁকা বেশ কিছু ছবি পান। ১৯৫৬ সালে গ্রানোফ তাঁর কাছ থেকে মোনের প্রায় ৫০টি ছবি কেনেন। পরের বছর, ১৯৫৭ সালে, শ্লুমবারজে আইরিস ছবিটি নিজের সংগ্রহে নেন।

তখন মোনের শেষ জীবনের আঁকা ছবিগুলোর কদর আজকের মতো ছিল না। কোনো কোনো সমালোচক মনে করতেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আঁকার মান কমে গিয়েছিল। কিন্তু গ্রানোফ ও শ্লুমবারজে ছবিগুলোর মধ্যে অন্য রকম সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এই ছবিগুলোতে রং ও তুলির ব্যবহারে এমন কিছু আছে, যা পরবর্তী সময়ের আধুনিক শিল্পের সঙ্গে মিলে যায়।

শ্লুমবারজে ছবিটি নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তা প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল জনসাধারণের চোখের আড়ালে। ১৯৮৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর ছবিটি পরিবারের কাছেই ছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক কেউ ছবিটি প্রদর্শনীতে দেখতে পায়নি।

২০২৬ সালে মোনের মৃত্যুর ১০০ বছর পূর্তির সময়ে তাঁর উত্তরসূরিরা ছবিটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। আইরিস ছবিটির পাশাপাশি শ্লুমবারজের সংগ্রহে থাকা আরও ২৬টি শিল্পকর্মও নিলামে ওঠে। সব মিলিয়ে তাঁর সংগ্রহ থেকে বিক্রি হওয়া শিল্পকর্মের দাম দাঁড়ায় ৭৪.৪ মিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ১০৩১ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন

কীভাবে একটা ছবির দাম এত হয়

একটি ছবি কত দামে বিক্রি হবে, তা শুধু তার আকার বা রঙের ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে কাজ করে বেশ কয়েকটি বিষয়।

প্রথমত, শিল্পীর পরিচিতি। মোনে শিল্পের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন শিল্পী। তাঁর সেরা ছবিগুলোর চাহিদা আছে ধনী সংগ্রাহক থেকে শুরু করে বড় বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কাছেও। পৃথিবীতে তাঁর আঁকা ছবি অসংখ্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্লভ ছবির সংখ্যা সীমিত। তাই এমন একটি ছবি কেনার সুযোগ এলে অনেকেই আগ্রহী হন।

দ্বিতীয়ত, ছবিটির ইতিহাস। কোনো শিল্পকর্ম কে এঁকেছেন, এত দিন কার কাছে ছিল, কীভাবে এক সংগ্রহ থেকে অন্য সংগ্রহে গেছে; এসব তথ্য ছবিটির মূল্য বাড়াতে পারে। আইরিস কয়েক দশক ধরে শ্লুমবারজের সংগ্রহে ছিল। এই ইতিহাস ছবিটির পরিচয় ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও দৃঢ় করেছে।

তৃতীয়ত, বিরলতা। ছবিটি নিলামের আগে কখনো জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয়নি। ফলে নিলামের সময় অনেকেই ছবিটিকে প্রথম কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়। এমন দুর্লভ ছবিকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

আরেকটি বিষয় হলো ছবিটির শিল্পমূল্য। মোনের শেষ জীবনের ছবিগুলো একসময় খুব বেশি প্রশংসা পায়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদসহ আধুনিক শিল্পের নানা ধারার সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। শিল্পবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোনের এই সময়ের ছবিগুলো আধুনিক শিল্পের বিকাশ বুঝতে সাহায্য করে। ফলে সংগ্রাহকদের কাছে সেগুলোর গুরুত্বও বেড়েছে।

নিলামে আবার একাধিক ক্রেতা একই ছবি পেতে চাইলে দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। আইরিসের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। ছবিটির দুর্লভতা, শিল্পীর খ্যাতি, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ক্রেতাদের আগ্রহে এই ছবির দাম পৌঁছেছে ৫০ মিলিয়ন ইউরো বা ৬৯৫ কোটির বেশি।

আরও পড়ুন

পুরোনো ছবিতে আধুনিকতার ছাপ

মোনের ছবির গুরুত্ব শুধু বেশি দামের কারণে নয়। তাঁর কাজ পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদেরও প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে জীবনের শেষ দিকে আঁকা ছবিগুলোতে তিনি রং ও তুলির ব্যবহার নিয়ে নানা পরীক্ষা করেছিলেন। ছবির দৃশ্যগুলো এতটাই রঙিন ও স্বাধীন তুলির আঁচড়ে তৈরি যে সেগুলোর মধ্যে পরবর্তী সময়ের আধুনিক শিল্পের আভাস পাওয়া যায়।

প্যারিসে সোথেবির ইমপ্রেশনিস্ট ও আধুনিক শিল্প বিভাগের বিশ্বব্যাপী প্রধান হেলেনা নিউম্যানের মতে, আইরিস প্যারিসের জাদুঘরগুলোতে থাকা মোনের বিখ্যাত ছবিগুলোর পাশে রাখার মতো মানের একটি শিল্পকর্ম।

একটি ছবি কত দামে বিক্রি হলো, তা দিয়ে অবশ্য তার শিল্পমূল্য পুরোপুরি মাপা যায় না। তবু আইরিসের দাম থেকে বোঝা যায়, শিল্পের মূল্য শুধু ক্যানভাস, রং আর ফ্রেমে আটকে থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন শিল্পীর জীবন, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া মানুষের রুচি, ছবিটির ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখে তার নতুন করে ধরা পড়া গুরুত্ব।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস ও লাক্সাস ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন