পর্দার আড়ালে জাপানি সুপারহিরোদের আসল জাদু
জাপানি সুপারহিরোর কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ওয়ান পাঞ্চ ম্যান, গোকু, সেইলোর মুন কিংবা একাডেমিয়া সিটির ডেকু আর অল মাইটের ছবি। কিন্তু অ্যানিমের এই রঙিন জগতের বাইরেও জাপানে রয়েছে সুপারহিরোদের এক বিশাল ও রোমাঞ্চকর জগৎ, যার নাম—‘টোকুসাতসু’।
আমরা সবাই গডজিলাকে চিনি। বিশাল এক দানব শহর ধ্বংস করছে—সিনেমার পর্দায় এমন রোমহর্ষক দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন সবকিছু আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। কিন্তু এই গডজিলার হাত ধরেই ১৯৫৪ সালে পরিচালক এইজি সুবুরাইয়া শুরু করেছিলেন টোকুসাতসু নামের এক নতুন বিপ্লব।
‘টোকুসাতসু’ (Tokusatsu) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘Special Effects’। এটি মূলত এমন এক লাইভ-অ্যাকশন ঘরানা, যেখানে সুপারহিরো, মেকা (বিশাল রোবট) এবং কাইজু (দানব) দেখা যায়। এ ঘরানার বিশেষত্ব হলো এখানে কম্পিউটার গ্রাফিকসের (সিজিআই) চেয়ে বাস্তব কৌশল বা প্র্যাকটিক্যাল ইফেক্টের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। অভিনেতা যখন কাইজু বা সুপারহিরোর পোশাক পরে একটি ছোট শহরের মডেলে লড়াই করেন, তখন তাকে বলা হয় ‘স্যুটমেশন’। এই পদ্ধতি আর মিনিয়েচার সেটের কারসাজিই টোকুসাতসুকে করে তোলে অনন্য।
কিংবদন্তি সব নায়ক
গডজিলার সাফল্যের পর শুরু হয় জাপানি সুপারহিরোদের স্বর্ণযুগ। ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু হওয়া আলট্রাম্যান, ১৯৭১-এর কামেন রাইডার এবং ১৯৭৫ থেকে চলে আসা সুপার সেন্তাই আজও দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছে। এ ছাড়া মেটাল হিরো, গারো, কিকাইডার কিংবা মাদান সেনকি রিউকেন্ডোর মতো সিরিজগুলো জাপানের ঘরে ঘরে সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিটি সিরিজে থাকে দানব আর মানুষের মধ্যে ন্যায়ের লড়াই।
বিশ্বজুড়ে টোকুসাতসুর জয়জয়কার
যদিও এসব সিরিজ মূলত শিশুদের কথা মাথায় রেখে বানানো, কিন্তু এর গল্প আর টান টান উত্তেজনা সব বয়সের দর্শককে মুগ্ধ করছে। চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে এসব সিরিজের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। বর্তমানে আলট্রাম্যান ও কামেন রাইডার আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে বাড়ছে এর ফ্যানবেজ।
হলিউড যখন অ্যানিমে থেকে অনুপ্রাণিত
টোকুসাতসুর ছোঁয়া লেগেছে বিশ্বখ্যাত সব অ্যানিমে ও পশ্চিমা সুপারহিরোদের গায়েও। জনপ্রিয় সিরিজ পোকেমন মূলত অনুপ্রাণিত হয়েছে আলট্রাসেভেন সিরিজের ‘ক্যাপসুল কাইজু’ থেকে। এমনকি হলিউডের মার্ভেল মহাবিশ্বের অ্যান্ট-ম্যানের স্যুটে আলট্রাম্যানের প্রভাব লক্ষ করা যায়, তেমনি বেন টেন-এর ‘ওয়ে বিগ’ চরিত্রটি সরাসরি আলট্রাম্যান থেকেই অনুপ্রাণিত। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের ছোটবেলার জনপ্রিয় সিরিজ পাওয়ার রেঞ্জার্স আসলে জাপানিজ সুপার সেন্তাই-এর মার্কিন সংস্করণ। টোকুসাতসু কেবল দানব বা রোবটের ধুমধাড়াক্কা লড়াই নয়। এর পরতে পরতে মিশে থাকে সাহস, ন্যায়বোধ, বন্ধুত্ব আর সামষ্টিক লড়াইয়ের শিক্ষা। বর্তমানে আধুনিক সিজিআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও টোকুসাতসুর প্রাণ লুকিয়ে আছে সেই বাস্তব স্যুটমেশন আর যান্ত্রিক কৌশলের মধ্যেই। জাপানি সংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদ ভবিষ্যতেও নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে নিজের জায়গা ধরে রাখবে—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: শিক্ষার্থী, আজিজা রোজ বার্ড কলেজিয়েট স্কুল, জামালপুর