চ্যাটজিপিটিতে সেলফি আপলোড করা কতটা নিরাপদ

এআই দিয়ে নিজের আশির দশকের ছবি তৈরি করে প্রকাশ করছেন অনেকেকোলাজ ছবি: প্রথম আলো

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশির দশকের ছবি বানানো এখন ট্রেন্ড। চোখের পলকে নিজের আশির দশকীয় স্টাইলিশ ছবি বানিয়ে নেওয়া বেশ মজার। তবে এই আনন্দের আড়ালে বড় এক ঝুঁকিও আছে। প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ‘ওয়্যারড’-এর মতে, চ্যাটবটে হুটহাট নিজের সেলফি বা ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করা মোটেও নিরাপদ নয়। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআইয়ের সঙ্গে মানুষের মতো কথা বলা যায় বলেই আমরা ধরে নিই, এগুলো সম্পূর্ণ গোপন। কিন্তু সত্যি বলতে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর গোপনীয়তা শতভাগ সুরক্ষিত থাকে না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইকে কোনো ছবি বা লেখা দিলে মূলত চার ধরনের তথ্য তাদের কাছে চলে যায়। লেখা কথা, লেখা থেকে এআইয়ের বিশ্লেষণ করা তথ্য, নিজের ব্যবহারের নানা পরিসংখ্যান এবং সিস্টেমে জমা হওয়া ছবি ও ফাইল।

তাই যেকোনো গোপন কথা, ফোন নম্বর বা স্পর্শকাতর ছবি এআইকে দেওয়ার আগে ভাবা জরুরি। চ্যাটজিপিটির নিয়মেও স্পষ্ট বলা আছে, যে তথ্য গোপন রাখতে চান, তা কোনোভাবেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন

এআই চ্যাটবট আসলে কী কী তথ্য সংগ্রহ করে

যখন এআই চ্যাটবটে কোনো লেখা টাইপ করা হয়, তখন এটি শব্দগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলে। কোটি কোটি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শেখানো একটি ডিজিটাল মডেলের সাহায্যে আমাদের কথা, বিষয় ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে এটি সম্পূর্ণ নতুন উত্তর তৈরি করে।

ছবির ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও এক ধাপ বেশি। মুখমণ্ডলের ছবি একটি অতিসংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য, কারণ এর মাধ্যমে তোমাকে সরাসরি চিনে নেওয়া সম্ভব। তা ছাড়া ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকে মেটাডেটা। যেমন ছবি তোলার নির্দিষ্ট সময়, ডিভাইস এবং ভৌগোলিক অবস্থান। সেলফি আপলোড করলেই তা সঙ্গে সঙ্গে চুরি হয়ে যাবে কিংবা ডিপফেক তৈরিতে ব্যবহৃত হবে, বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তবে সেই ছবির একটি ডিজিটাল কপি সরাসরি অন্য একটি বিদেশি কোম্পানির সার্ভারে জমা হয়ে যায়। সেটা তাদের নিজস্ব নীতিমালার অধীন হয়ে পড়ে।

নিয়মিত এআই ব্যবহার করলে প্রশ্ন ও লেখার ধরন বিশ্লেষণ করেই যে কারোর পেশা, পছন্দ এবং নানা ব্যক্তিগত অভ্যাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যায় এআই। অন্যান্য সব অনলাইন সেবার মতোই এআই চ্যাটবট আইপি অ্যাড্রেস, ফোন বা কম্পিউটারের ধরন এবং অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে। এমনকি তোমার দেওয়া উত্তর, আপলোড করা ছবি ও ফাইলগুলোও তারা জমা রাখে। যাতে সিস্টেমকে আরও দক্ষ করে তোলা যায়।

তবে তথ্য কত দিন সংরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট টুলের প্রাইভেসি পলিসির ওপর। ওপেনএআই (চ্যাটজিপিটি) এবং গুগলের (জেমিনাই) গোপনীয়তা নীতি একদম আলাদা। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, উভয় প্রতিষ্ঠানেই ডেটা সেভ করা বন্ধ করা কিংবা ট্রেনিং বন্ধ রাখার সেটিংস অপশন রয়েছে।

আরও পড়ুন
চ্যাটজিপিটি
ফাইল ছবি: রয়টার্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার তথ্য কত দিন জমা রাখে

চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)

চ্যাট হিস্ট্রি যতক্ষণ নিজে না মোছা হচ্ছে, ততক্ষণ তা অ্যাকাউন্টে জমা থাকে। মুছে দিলেও ওপেনএআইয়ের মূল সিস্টেমে তা ৩০ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। আর তথ্য থেকে যদি ব্যবহারকারীর পরিচয় আলাদা করে ফেলা হয়, তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তা আরও দীর্ঘ সময় তাদের কাছে থেকে যেতে পারে।

জেমিনাই
ফাইল ছবি: রয়টার্স

জেমিনাই (Gemini)

ডিফল্ট সেটিংসে জেমিনাই ১৮ মাস পর্যন্ত কথোপকথন জমা রাখে। জেমিনাই যেহেতু গুগলের ড্রাইভ বা ফটোজের মতো অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাই এটি অনেক বেশি ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ করতে পারে। গুগল স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছে, অন্যকে দেখাতে চান না এমন কোনো গোপন তথ্য এআইকে দেওয়া যাবে না।

ক্লড (Claude)

ক্লডে চ্যাট মুছে ফেলার ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাক এন্ড থেকে তা গায়েব হয়ে যায়। তবে কেউ যদি সিস্টেমকে তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দেন, তবে তারা পরিচয় বিচ্ছিন্ন করে সেই তথ্য ৫ বছর পর্যন্ত ট্রেনিংয়ের জন্য রেখে দিতে পারে। নীতি লঙ্ঘনের মতো বিষয়ে চ্যাট ২ বছর এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত হিসাব ৭ বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীদের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এআই মডেল বানানোর জন্য প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত সার্ভার

নতুন প্রযুক্তির নতুন ঝুঁকি

অ্যাপ থেকে কোনো চ্যাট ডিলিট করা মানেই কিন্তু কোম্পানির মূল সার্ভার থেকে সঙ্গে সঙ্গে তা মুছে যাওয়া নয়। দিন যত যাচ্ছে, সাইবার আক্রমণের ধরনও তত বদলাচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মডেল ইনভারশনের মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যেখানে সাইবার অপরাধীরা নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এআই মডেলের ভেতর থেকে ব্যবহারকারীর গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা করে। চ্যাটবটগুলোর হাতে যখন ই–মেইল, শপিং ও গুগল ড্রাইভের অ্যাকসেস চলে আসছে, তখন এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

নিরাপদ থাকার সহজ উপায়

প্রথমে সংবেদনশীল বা খুব ব্যক্তিগত তথ্য এআইকে বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। চ্যাটবটের সেটিংসে গিয়ে মডেল ট্রেনিং অপশনটি বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। সাময়িক চ্যাটের জন্য প্রাইভেট বা টেম্পোরারি মোড ব্যবহার। চ্যাট শেষ হলে অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন ও আপলোড করা ফাইল ডিলিট করা। এআই অ্যাসিস্ট্যান্টকে ই–মেইল বা ড্রাইভে প্রবেশাধিকার দেওয়া আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই চ্যাটবট নিয়মিত ব্যবহার করেন অনেকেই
ছবি: রয়টার্স

ছবি আপলোডের ক্ষেত্রে সতর্কতা

সামাজিক মাধ্যমে নতুন কোনো ট্রেন্ড এলেই অন্যের ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া এআইতে আপলোড করা ঠিক না। বিশেষ করে শিশুদের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা সংবেদনশীল নথি এআই চ্যাটবটে দেওয়া একদমই উচিত নয়।

ভাইরাল হওয়া সেই ৮০-র দশকের স্টাইলের ছবি হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দুই দিনে গায়েব হয়ে যাবে, কিন্তু সেটি বানানোর জন্য দেওয়া আসল ছবিটি এআই কোম্পানির সার্ভারে দীর্ঘদিন থেকে যাবে। তাই মূল বিষয় চ্যাটবট ব্যবহার বন্ধ করা নয়; বরং ব্যবহার করার সময় কী দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা।

সূত্র: লাইভ মিন্ট ও ওয়্যার্ড ডটকম
আরও পড়ুন