ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিন কি ঘনিয়ে আসছে

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক বিশাল আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে আকাশ ছাই ও উত্তপ্ত গ্যাসে ঢেকে গেল। বিমান চলাচল বন্ধ। আশপাশের শহর ধ্বংস হলো। ফসল নষ্ট হয়ে গেল। সালফার ডাই-অক্সাইডের কুয়াশা পুরো পৃথিবীতে সূর্যের আলো আটকে দেওয়ায় তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে গেল। ফলে আমেরিকা থেকে এশিয়া পর্যন্ত চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। বিশ্বজুড়ে অনাহারে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হলো।

এমন মহাবিপর্যয় যেকোনো সময় ঘটতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ খাদ্যসংকট তৈরি করবে। তাই প্রতিটি দেশের সরকারের উচিত জাতীয় নিরাপত্তার তালিকায় পারমাণবিক যুদ্ধ, আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ বা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মতো ঘটনাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া।

এই সংকট সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য বাণিজ্যের নিয়ম আগে থেকেই ঠিক করে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সূর্যালোক বা সার ছাড়াই বিপুল খাবার উৎপাদনের নতুন গবেষণায় এখনই অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত।

কয়েক বছর ধরে কোভিড মহামারি, ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ ও ইরানের সংঘাতের মতো নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে সামনে আমাদের জন্য আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছে।

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে খাবার উৎপাদনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে। কারণ, সার কেনাবেচার একটা বড় অংশ এই পথ দিয়েই হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করেছে, এই পথ বন্ধের ঘাটতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।

এ থেকে বোঝা যায়, আজকের যুক্ত থাকা পৃথিবীতে এক জায়গার সংকট দূরের দেশের ওপরও প্রভাব ফেলে। বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে তার ধাক্কা বিশ্বজুড়ে অনেক দ্রুত ও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারো, খুব কম ঘটে এমন ভয়াবহ বিপদের প্রস্তুতি আমাদের কেন নিতে হবে? কিন্তু এসব মহাবিপর্যয় যতটা অসম্ভব মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। বরফের পুরোনো স্তর পরীক্ষা করে অতীতে ঘটে যাওয়া বিশাল আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের হিসাব পাওয়া যায়।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফাইল ছবি
রয়টার্স

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীতেই ইন্দোনেশিয়ার তাম্বোরা আগ্নেয়গিরির মতো ভয়াবহ বিস্ফোরণের সম্ভাবনা ছয় ভাগের এক ভাগ। ১৮১৫ সালের সেই বিস্ফোরণের কারণে পৃথিবীতে এক বছরের জন্য গ্রীষ্মকালই আসেনি। আবার ১৮৫৯ সালের মতো ভয়াবহ সৌরঝড়ের আশঙ্কা প্রতি দশকে ১ থেকে ১২ শতাংশ।

এমন সৌরঝড় হলে মহাদেশের পর মহাদেশজুড়ে বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা অচল হয়ে যাবে। আবার পারমাণবিক অস্ত্র থাকা দেশগুলোও সব সময় কোনো না কোনো যুদ্ধে জড়াচ্ছে। এটা পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এসব বিপদের প্রতিটি আলাদাভাবে হয়তো অসম্ভব মনে হতে পারে। তবে সব হিসাব মেলালে দেখা যায়, এই শতাব্দীতে এর যেকোনো একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশ প্রবল।

এসব বিপদের সবচেয়ে বড় সাধারণ দিক হলো, প্রতিটির প্রভাব সরাসরি এসে পড়বে আমাদের খাবারের ওপর। বড় আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, পারমাণবিক যুদ্ধ বা গ্রহাণুর আঘাতের কারণে বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়বে, যা সূর্যের আলো আটকে দেবে। এতে আবহাওয়া খুব ঠান্ডা ও শুষ্ক হয়ে যাবে এবং ফসল ফলানো বন্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

পারমাণবিক যুদ্ধ হলে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ খাবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার সৌরঝড় হলে সার, কীটনাশক ও জ্বালানির অভাব দেখা দেবে। ফলে যেসব এলাকায় এখন সবচেয়ে বেশি খাদ্য তৈরি হয়, সেখানে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

খুব কম দেশই এসব বড় ঝুঁকি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। যারা একটু কাজ করছে, তাদের প্রস্তুতিও আসলে যথেষ্ট নয়। যুক্তরাজ্যের ঝুঁকির তালিকায় ৮৯টি বিপদের কথা বলা আছে। এর মধ্যে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, মহাকাশের খারাপ আবহাওয়া বা মহামারির কথা বলা আছে। কিন্তু সেখানে খুব বড়জোর ১ হাজার মানুষের মৃত্যু বা কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে এমন বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষ বা পারমাণবিক যুদ্ধের মতো বড় বিপদের কথা তারা তালিকায় রাখেইনি।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার পর
ছবি : লস আলমোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সৌজন্যে

সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ ঝুঁকির তালিকায় নানা বিপদের কথা বললেও সেগুলোর মাত্রা খুব ছোট করে ধরে। অথচ পৃথিবীর বহু দেশ এসব বিপদ নিয়ে চিন্তাই করে না।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ভালো ভৌগোলিক অবস্থান ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থার কারণে বিপর্যয় সামলাতে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান সবচেয়ে ভালো। তবে জ্বালানি, ওষুধ ও সার আমদানির ওপর নির্ভর করায় তারাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাই একা কোনো দেশের পক্ষে মহাবিপর্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

বিপদের সময় খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হতে পারে। তাই মহাবিপর্যয় আসার আগেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম ও চুক্তি ঠিক করে রাখা জরুরি।

পারমাণবিক যুদ্ধ, সৌরঝড়, উল্কাপাত ও আগ্নেয়গিরির মতো সব বিপদ একসঙ্গে হিসাব করলে যেকোনো একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশ প্রবল। তবে প্রস্তুতির জন্য বিপুল খরচের প্রয়োজন নেই। কম খরচে চাষাবাদ, বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খাবার জমিয়ে রাখার কাজগুলো সহজলভ্য।

বিপর্যয় ঘটে গেলে প্রস্তুত হওয়ার বা নতুন চুক্তি করার আর সময় পাওয়া যাবে না। প্রস্তুতি নেওয়া ও না–নেওয়া দেশের পার্থক্য স্পষ্ট হবে মানুষের জীবন বাঁচানোর সংখ্যার মধ্য দিয়ে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স
আরও পড়ুন