আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ২

এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল রেখো, এই দ্বিতীয় সূত্রটির মানে কিন্তু এই নয় যে চলন্ত পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে আলোর বেগ স্থির। এটা হলো মূল সূত্র থেকে পাওয়া একটা ফলাফল। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমরা এখানে শুধু শূন্যস্থানে আলোর বেগ নিয়ে কথা বলছি। বাতাস বা কাচের মতো কোনো স্বচ্ছ মাধ্যমের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর বেগ কমে যায়। তা না হলে তো কোনো লেন্সই আলোকে বাঁকাতে পারত না!

অবশ্য অন্য বিজ্ঞানীরাও এই দুটি সূত্র নিয়ে ভেবেছিলেন। বিজ্ঞানী লরেন্টজ তাঁর তত্ত্বে এই দুটির মধ্যে একটা মিল করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইথার বায়ুর চাপের কারণে বস্তুর আসল দৈর্ঘ্য ও সময় বদলে যায়। কিন্তু বেশির ভাগ বিজ্ঞানীর কাছে এই ব্যাখ্যাটি হজম করা খুব কঠিন ছিল। তাঁরা বরং এটা বিশ্বাস করতে চাইতেন যে সূত্র দুটি একে অপরের সঙ্গে মেলে না। তাই এর মধ্যে অন্তত একটা ভুল হতেই হবে!

কিন্তু আইনস্টাইন সমস্যাটি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভেবেছিলেন। তিনি বললেন, এই দুটি সূত্র শুধু তখনই বেমানান মনে হবে, যদি আমরা পুরোনো সেই ধারণা আঁকড়ে ধরে বসে থাকি। ধারণাটা হলো, দৈর্ঘ্য ও সময় পরম। আইনস্টাইন যখন তাঁর তত্ত্ব প্রকাশ করেন, তখন তিনি জানতেন না যে লরেন্টজও এমন কিছুই ভাবছিলেন। তবে লরেন্টজের মতোই তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন, দৈর্ঘ্য ও সময়ের মাপজোখ বস্তু এবং পর্যবেক্ষকের আপেক্ষিক গতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু লরেন্টজ থেমে গিয়েছিলেন মাঝপথে। তিনি স্থির বস্তুর ক্ষেত্রে পরম দৈর্ঘ্য এবং পরম সময়ের ধারণাটা ধরে রেখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, ইথার বায়ু হয়তো আসল দৈর্ঘ্য এবং সময়কে বাঁকিয়ে দেয়। কিন্তু আইনস্টাইন একদম শেষ পর্যন্ত গেলেন। তিনি সাফ বলে দিলেন, ইথার বায়ু বলে কিচ্ছু নেই। পরম দৈর্ঘ্য বা পরম সময় বলতেও কোনো কথা নেই! এটাই হলো আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের চাবিকাঠি। এই চাবি ঘোরাতেই বিজ্ঞানের বন্ধ থাকা অনেকগুলো তালা আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করল।

তত্ত্বটিকে খুব সহজভাবে বোঝানোর জন্য আইনস্টাইন একবার দারুণ একটি থট এক্সপেরিমেন্টের কথা বলেছিলেন। ধরো, রেললাইনের পাশে মধু নামের একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। লাইন ধরে বেশ কিছুটা দূরে একটা জায়গা আছে, যার নাম দিলাম কাদেরাবাদ। আর ঠিক উল্টো দিকে সমান দূরত্বে আরেকটা জায়গা আছে, যার নাম খাদেরাবাদ। হঠাৎ কাদেরাবাদ ও খাদেরাবাদ—দুই জায়গাতেই ঠিক একই সময়ে বজ্রপাত হলো। লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি জানে যে ঘটনা দুটি একই সঙ্গে ঘটেছে; কারণ, সে বজ্রপাতের দুটি ঝলক ঠিক একই মুহূর্তে দেখতে পেয়েছে। যেহেতু সে ওই দুই জায়গা থেকে একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং আলোর বেগও সব সময় একই থাকে, তাই সে হিসাব করে বুঝল যে বজ্রপাত দুটি একদম একই সময়ে ঘটেছে।

এবার ধরো, ঠিক যখন বজ্রপাত হলো, তখন একটি ট্রেন প্রচণ্ড বেগে কাদেরাবাদ থেকে খাদেরাবাদের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ট্রেনটির ভেতরেও একজন পর্যবেক্ষক আছে, ধরি তার নাম সাধু। যখন বজ্রপাতের ঝলক দুটি তৈরি হলো, তখন ট্রেনের ভেতরের লোকটি ঠিক বাইরের লোকটির সোজাসুজি অবস্থায় ছিল। এখন দেখো মজা! যেহেতু ট্রেনের ভেতরের লোকটি একটি আলোর ঝলকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তাই সে কাদেরাবাদের আলো দেখার আগেই খাদেরাবাদের আলো দেখতে পাবে। কিন্তু সে যেহেতু জানে যে সে চলন্ত ট্রেনের ভেতর আছে, তাই সে আলোর বেগের ব্যাপারটা হিসাবের মধ্যে ধরে নেবে। সে-ও হিসাব কষে বলবে, হ্যাঁ, বজ্রপাত দুটি একই সঙ্গে ঘটেছে।

এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মূল সূত্র অনুযায়ী, এবং মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার পর, আমরা চাইলে খুব সহজেই ধরে নিতে পারি যে, ট্রেনটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে এবং ট্রেনের চাকার নিচ দিয়ে পুরো মাটিটাই প্রচণ্ড বেগে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে! এই হিসেবে, ট্রেনের ভেতরের লোকটি এবার বলবে, ‘যেহেতু আমি স্থির আছি এবং খাদেরাবাদের বজ্রপাতটি আমি আগে দেখেছি, তার মানে খাদেরাবাদের বজ্রপাতটি কাদেরাবাদের বজ্রপাতের আগেই ঘটেছে!’ কারণ, সে জানে, সে জায়গা দুটির ঠিক মাঝখানে আছে।

আরও পড়ুন

আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, লাইনের পাশে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকেও এই কথায় রাজি হতে হবে! সত্যি যে সে বজ্রপাত দুটি একই সঙ্গে ঘটতে দেখেছে, কিন্তু এখন তো তাকে ধরে নিতে হচ্ছে যে সে নিজেই গতিশীল। যখন সে আলোর বেগ এবং তার নিজের গতির ব্যাপারটা হিসাব করবে—যে সে কাদেরাবাদের দিকে যাচ্ছে এবং খাদেরাবাদের থেকে দূরে সরছে—তখন সে-ও হিসাব কষে দেখবে যে খাদেরাবাদের বজ্রপাতটি নিশ্চয়ই আগে ঘটেছে!

তার মানে কী দাঁড়াল? দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে কি না, এই প্রশ্নের কোনো পরম বা চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়! এর উত্তর নির্ভর করে আমরা কোন প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে মাপছি তার ওপর। অবশ্য, দুটি ঘটনা যদি ঠিক একই জায়গায়, একই সময়ে ঘটে, তবে সেটাকে পরমভাবে একই সময়ে বলা যায়। যেমন, মাঝ–আকাশে দুটি বিমানের ধাক্কা লাগলে এমন কোনো প্রসঙ্গ কাঠামো নেই, যেখান থেকে মনে হবে বিমান দুটো আলাদা সময়ে ভেঙেছে। কিন্তু দুটি ঘটনার মধ্যে দূরত্ব যত বাড়বে, ঘটনা দুটি একই সময়ে ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলাও তত কঠিন হয়ে পড়বে। এটা বোঝা খুব জরুরি, বিষয়টি এমন নয় যে আমরা আসল সত্যিটা জানতে পারছি না। বরং বিষয়টি হলো, এখানে কোনো আসল সত্যি বলে কিছু নেই! পুরো মহাবিশ্বজুড়ে এমন কোনো পরম সময় নেই, যা দিয়ে দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে কি না, তা মাপা যায়। দূরের দুটি ঘটনা পরমভাবে একই সময়ে ঘটার ধারণাটাই আসলে একদম অর্থহীন।

এই ধারণা কতটা বৈপ্লবিক, তা বিশাল দূরত্ব ও প্রচণ্ড গতির আরেকটা থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে খুব সহজেই বোঝা যায়। ধরো, আমাদের গ্যালাক্সির অন্য কোনো প্রান্তে X নামে একটা গ্রহ থেকে কেউ একজন পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। সে রেডিওর মাধ্যমে একটা বার্তা পাঠাল। রেডিওর সংকেত তো একধরনের তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গ, যা মহাকাশে আলোর বেগে ছুটে চলে। এখন ধরে নাও, পৃথিবী থেকে সেই গ্রহটির দূরত্ব ১০ আলোকবর্ষ। তার মানে, সেই বার্তাটি পৃথিবীতে পৌঁছাতে ঠিক ১০ বছর সময় লাগবে। বার্তাটি পৃথিবীতে পৌঁছানোর ১২ বছর আগে পৃথিবীর কোনো এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আমাদের এটা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ দেয় যে, ওই গ্রহ থেকে বার্তা পাঠানোর আগেই বিজ্ঞানী নোবেল পেয়েছিলেন। বার্তাটি পাওয়ার ঠিক ১০ মিনিট পর জ্যোতির্বিজ্ঞানী একটি হাঁচি দিলেন। এই তত্ত্ব আমাদের এটাও নিশ্চিত করে বলতে দেয় যে, বার্তাটি পাঠানোর পরেই বিজ্ঞানী হাঁচি দিয়েছেন এবং মহাবিশ্বের যেকোনো কাঠামোর যেকোনো পর্যবেক্ষকই এর সঙ্গে একমত হবেন।

কিন্তু এবার ধরো, রেডিও বার্তাটি পৃথিবীর দিকে আসার ওই ১০ বছর সময়ের কোনো এক ফাঁকে—ধরো, বার্তাটি পৌঁছানোর ঠিক ৩ বছর আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানী তাঁর রেডিও টেলিস্কোপ থেকে পড়ে গিয়ে পা ভাঙলেন! আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব তখন আর আমাদের এটা নিশ্চিত করে বলতে দেয় না যে গ্রহটি থেকে বার্তা পাঠানোর আগে নাকি পরে তাঁর পা ভেঙেছিল!

এর কারণ কী জানো? ধরো, বার্তা পাঠানোর ঠিক মুহূর্তে একজন পর্যবেক্ষক সেই গ্রহ থেকে পৃথিবীর দিকে রওনা হলো। পৃথিবী থেকে মাপলে তার গতি বেশ ধীর। সে যখন পৃথিবীতে পৌঁছাবে, তখন সে নিজের ঘড়ির সময় মিলিয়ে হিসাব করে দেখবে, বার্তাটি পাঠানোর পরেই বিজ্ঞানীর পা ভেঙেছিল। অন্যদিকে, আরেকজন পর্যবেক্ষক যদি বার্তা পাঠানোর একই সময়ে আলোর প্রায় সমান বেগে পৃথিবীর দিকে রওনা দেয়, সে কিন্তু উল্টোটা দেখবে! সে কয়েক শতাব্দীর বদলে পৃথিবীর হিসাবে মাত্র ১০ বছরের একটু বেশি সময়ে পৃথিবীতে পৌঁছে যাবে। কিন্তু মহাকাশযানটি প্রচণ্ড বেগে চলায় তার ভেতরে সময় খুব ধীরে কাটবে। ফলে নভোচারীর কাছে মনে হবে তার যাত্রা শেষ করতে মাত্র কয়েক মাস সময় লেগেছে। পৃথিবীতে এসে সে শুনবে জ্যোতির্বিজ্ঞানী পা ভেঙেছেন তিন বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে। কিন্তু নভোচারীর ঘড়ি বলছে বার্তা পাঠানো হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে! তখন সে হিসাব করে নির্দ্বিধায় বলে দেবে, ওই গ্রহ থেকে বার্তা পাঠানোর কয়েক বছর আগেই বিজ্ঞানীর পা ভেঙেছিল!

আরও পড়ুন

সেই নভোচারী যদি ঠিক আলোর বেগে ছুটতে পারত (অবশ্য এটা শুধুই কল্পনা, বাস্তবে এটা একেবারেই অসম্ভব), তাহলে কী হতো জানো? তার ঘড়ি পুরোপুরি থেমে যেত! তার কাছে মনে হতো, যাত্রা শেষ করতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগেনি। অর্থাৎ শূন্য সময় লেগেছে। তার হিসাব অনুযায়ী, বার্তা পাঠানো আর পৃথিবীতে সেই বার্তা পৌঁছানো—দুটো ঘটনাই একদম একই সময়ে বা একই সঙ্গে ঘটেছে। ওই ১০ বছরে পৃথিবীতে যা যা ঘটেছে, তার কাছে মনে হতো সেসব বার্তা পাঠানোর আগেই ঘটে গেছে!

বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, এখানে কোনো বিশেষ বা সেরা প্রসঙ্গ কাঠামো বলে কিছু নেই। একজন পর্যবেক্ষকের হিসাব অন্যজনের চেয়ে ভালো বা বেশি সঠিক, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলা ওই নভোচারীর হিসাবটা যেমন একদম নিখুঁত এবং সত্যি, ঠিক তেমনি ধীর গতির নভোচারীর হিসাবটাও পুরোপুরি সত্যি। তাদের দুজনের এই হিসাবের পার্থক্য মেটানোর জন্য পুরো মহাবিশ্বজুড়ে কোনো পরম সময় নেই। এখন বা এই মুহূর্ত কথাটার মানে হলো, তুমি ঠিক যে জায়গায় আছ, সেখানকার সময়। পুরো মহাবিশ্বের সব জায়গায় একই সঙ্গে ‘এখন’ চলছে, এমনটা ভাবা একেবারেই ভুল!

পরমভাবে একই সময়ে ঘটার এই পুরোনো ধারণার এমন জবরদস্ত পতন আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সবচেয়ে চমকপ্রদ সুন্দর একটি দিক। এখানে জানিয়ে রাখি, এই চমকপ্রদ সুন্দর বা বিউটিফুলি আনএক্সপেক্টেড কথাটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন বিখ্যাত নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেলার।

যা–ই হোক, বিজ্ঞানী নিউটন ধরেই নিয়েছিলেন, পুরো মহাবিশ্বজুড়ে একটাই পরম সময় বয়ে চলেছে। লরেন্টজ এবং পঁয়কারেও ঠিক এমনটাই ভাবতেন। ঠিক এই কারণেই তাঁরা আইনস্টাইনের আগে এই বিশেষ তত্ত্বটি আবিষ্কার করতে পারেননি! আইনস্টাইনের সেই অসাধারণ প্রতিভা ছিল, যা দিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পুরো মহাবিশ্বের জন্য একটি মাত্র পরম সময়ের ধারণা পুরোপুরি বাদ না দিলে কোনোভাবেই এই তত্ত্বকে দাঁড় করানো যাবে না।

আইনস্টাইন বললেন, মহাবিশ্বে কেবল স্থানীয় সময় আছে। যেমন ধরো, পৃথিবীর সবাই মহাকাশের ভেতর দিয়ে একই বেগে ছুটে চলেছে। তাই আমাদের সবার ঘড়ি একই পৃথিবীর সময় অনুযায়ী চলে। পৃথিবীর মতো কোনো চলন্ত বস্তুর এই নিজস্ব সময়কে বলা হয় প্রপার টাইম বা নিজস্ব সময়।

হ্যাঁ, পরমভাবে আগে এবং পরে ঘটার ব্যাপারটা এখনো আছে। যেমন, জন্ম নেওয়ার আগে তো আর কোনো নভোচারী মারা যেতে পারে না! কিন্তু দুটি ঘটনা যখন একে অপরের থেকে বিশাল দূরে ঘটে, তখন তাদের মাঝখানে এত লম্বা একটা সময়ের ব্যবধান থাকে যে কোনটা আগে আর কোনটা পরে ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয় না। এর উত্তর নির্ভর করে ওই ঘটনা দুটির সাপেক্ষে যে মাপছে তার গতির ওপর। একজন পর্যবেক্ষক হিসাব কষে যা বলবে, অন্য একজন পর্যবেক্ষকের ভিন্ন হিসাবও ঠিক ততটাই সত্যি। আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের সেই মূল দুটি সূত্র থেকেই লোহার মতো শক্ত ও নিখুঁত যুক্তির মাধ্যমে এই উপসংহার বেরিয়ে আসে।

দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটার ধারণাটা যখন বাতিল হয়ে গেল, তখন তার সঙ্গে আরও অনেক ধারণাই পাল্টে গেল। সময় হয়ে গেল আপেক্ষিক। কারণ, দুটি ঘটনার মাঝখানের সময় মাপতে গিয়ে আলাদা আলাদা পর্যবেক্ষক আলাদা আলাদা হিসাব পাচ্ছিলেন। শুধু সময় নয়, দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হয়ে গেল!

ধরো, একটা চলন্ত ট্রেনের দৈর্ঘ্য মাপতে হবে। কিন্তু ট্রেনের একদম সামনের অংশ আর পেছনের অংশ ঠিক একই মুহূর্তে কোথায় আছে, তা না জানলে কি তুমি এর সঠিক দৈর্ঘ্য মাপতে পারবে? কেউ যদি বলে, ‘বেলা ঠিক ১টার সময় ট্রেনের ইঞ্জিন আমার সামনে ছিল, আর ১২টা ৫৯ থেকে ১টা ১ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় ট্রেনের পেছনের বগিটা এক মাইল দূরে ছিল’—তাহলে কি ট্রেনের আসল দৈর্ঘ্য মাপা সম্ভব? মোটেও না! সহজ কথায়, দূরত্ব এবং চলন্ত বস্তুর দৈর্ঘ্য মাপার জন্য একই সময়ে ঘটার ব্যাপারটা নিশ্চিত করা ভীষণ জরুরি। আর যেহেতু একই সময়ে ঘটার কোনো পরম মাপকাঠি নেই, তাই চলন্ত বস্তুর দৈর্ঘ্য পুরোপুরি নির্ভর করে তুমি কোন প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে মাপছ, তার ওপর।

আরও পড়ুন

উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরো, দুটি মহাকাশযান একে অপরের সাপেক্ষে ছুটে যাচ্ছে। প্রত্যেক যানের নভোচারী যখন অন্য যানটির দৈর্ঘ্য মাপবেন, তখন তাঁর কাছে মনে হবে অন্য যানটি যেদিকে ছুটছে, সেদিকে একটুখানি ছোট হয়ে গেছে! সাধারণ গতির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন এতই সামান্য যে বোঝাই যায় না। যেমন ধরো, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। সূর্যের সাপেক্ষে স্থির থাকা কোনো পর্যবেক্ষক যদি পৃথিবীর ব্যাস মাপেন, তবে তাঁর কাছে পৃথিবীকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি ছোট মনে হবে! কিন্তু আপেক্ষিক গতি যখন অনেক বেশি হয়, তখন এই ছোট হওয়ার পরিমাণটা বেশ চোখে পড়ার মতো হয়।

মজার ব্যাপার হলো, মাইকেলসন-মোর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফিটজেরাল্ড ও লরেন্টজ বস্তু ছোট হয়ে যাওয়ার যে সমীকরণ দিয়েছিলেন, এখানেও ঠিক সেই একই সমীকরণ দারুণভাবে কাজে লেগে গেল! আপেক্ষিকতা তত্ত্বে একে এখনো লরেন্টজ-ফিটজেরাল্ড সংকোচন বলা হয়। তবে এর অন্য কোনো নাম থাকলে হয়তো বুঝতে সুবিধা হতো; কারণ, আইনস্টাইন এই সমীকরণের একদম অন্য রকম একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

লরেন্টজ ও ফিটজেরাল্ড ভেবেছিলেন, বস্তুর এই ছোট হয়ে যাওয়াটা একটা বাস্তব ভৌত পরিবর্তন, যা ইথার বায়ুর চাপের কারণে ঘটে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, এর সঙ্গে শুধু মাপজোখের ফলাফলের সম্পর্ক আছে। একজন নভোচারী যখন অন্য যানটির দৈর্ঘ্য মাপেন, তখন তিনি সেটাকে ছোট দেখেন। নভোচারীরা কিন্তু নিজেদের যানের বা নিজেদের ভেতরের কোনো জিনিসের দৈর্ঘ্যের কোনো পরিবর্তন দেখেন না। লরেন্টজ এবং ফিটজেরাল্ড ভাবতেন, বস্তুর একটা পরম স্থির দৈর্ঘ্য আছে, আর সেটা ছোট হয়ে গেলে তা আর আসল থাকে না। কিন্তু আইনস্টাইন তো ইথারের ধারণাই বাতিল করে দিয়েছেন! তাই তাঁর কাছে পরম দৈর্ঘ্যের ধারণারও কোনো অর্থ ছিল না, যা রইল তা হলো শুধু মাপা দৈর্ঘ্য। আর সেটা বস্তু ও পর্যবেক্ষকের আপেক্ষিক গতির ওপর ভিত্তি করে বদলাতে পারে।

এখন তুমি হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, ‘এটা কীভাবে সম্ভব? দুটি যানই একে অপরের চেয়ে ছোট হয় কীভাবে?’

আমি বলব, তোমার প্রশ্নটাই আসলে একটু ভুল। তত্ত্বটি কিন্তু বলছে না যে প্রতিটি যান অন্যটির চেয়ে ছোট। তত্ত্বটি বলছে, প্রতিটি যানের নভোচারী মেপে দেখবেন, অন্য যানটি ছোট। এই দুটি কথার মধ্যে অনেক তফাত। ধরো, দুজন মানুষ একটা বিশাল অবতল লেন্সের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অবতল লেন্সের ভেতর দিয়ে দেখলে জিনিস ছোট দেখায়। এখন লেন্সের এপাশ থেকে প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে ছোট দেখবে, আবার ওপাশ থেকে দ্বিতীয়জনও প্রথমজনকে ছোট দেখবে। তার মানে কি এই যে দুজনেই দুজনের চেয়ে ছোট? মোটেও নয়!

দৈর্ঘ্যের এই পরিবর্তনের মতো সময়েরও এমন পরিবর্তন দেখা যায়। প্রতিটি যানের নভোচারী মেপে দেখবেন, অন্য যানের ঘড়িগুলো ধীরগতিতে চলছে। একটি সহজ থট এক্সপেরিমেন্ট করলেই বুঝতে পারবে যে এমনটাই ঘটার কথা।

এখানে একটা ছোট্ট কথা বলে রাখি। ওপরের প্যারায় ঘড়িগুলো বলতে বোঝানো হয়েছে, এখানে ঘড়ি বলতে এমন যেকোনো কিছুকে বোঝানো হচ্ছে, যা একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর কাঁপে বা নড়ে, এবং যা মহাকর্ষ বলের ওপর নির্ভর করে না। যেমন হার্টবিট, কিংবা স্প্রিং দেওয়া ব্যালান্স-হুইল ঘড়ি। কিন্তু পেন্ডুলাম দেওয়া দেয়ালঘড়ি বা বালুঘড়ি এখানে কাজ করবে না; কারণ, সেগুলো মহাকর্ষ বল বা গ্র্যাভিটির ওপর নির্ভরশীল।

এবার কল্পনায় ফিরে যাই। ধরো, তুমি তোমার মহাকাশযানের গোল জানালা দিয়ে অন্য একটি মহাকাশযানের জানালার দিকে তাকিয়ে আছো। যান দুটি আলোর গতির কাছাকাছি প্রচণ্ড বেগে একে অপরকে পার হয়ে যাচ্ছে। পার হওয়ার সময় তুমি দেখলে, অন্য যানটিতে একটি আলোর রশ্মি ছাদ থেকে মেঝের দিকে পাঠানো হলো। মেঝেতে থাকা একটি আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলোটি আবার ছাদে ফিরে গেল।

যেহেতু যানটি তোমার সামনে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, তাই তুমি আলোর এই ওঠানামা করার পথটাকে ইংরেজি V অক্ষরের মতো বাঁকা দেখবে। এখন তোমার কাছে যদি প্রচণ্ড নিখুঁত কোনো মাপার যন্ত্র থাকে (অবশ্য বাস্তবে এমন যন্ত্র নেই), তবে তুমি মেপে দেখতে পারো এই V আকৃতির পথ পাড়ি দিতে আলোর ঠিক কতটুকু সময় লাগল। এই মোট দূরত্বকে সময় দিয়ে ভাগ করলেই তুমি আলোর বেগ পেয়ে যাবে।

এবার ধরো, তুমি যখন ওই আলোর V আকৃতির পথ মাপছ, ঠিক তখন ওই যানের ভেতরের নভোচারীও একই কাজ করছে। তার কাছে নিজের যানটি তো স্থির। তাই সে দেখবে আলোটি কেবল ছাদ থেকে সোজাসুজি মেঝেতে নামল এবং আবার সোজা ছাদে উঠে গেল। তুমি যে V আকৃতির বাঁকা পথ দেখেছিলে, তার চেয়ে এই সোজাসুজি পথটি নিশ্চয়ই দৈর্ঘ্যে ছোট, তাই না?

এখন ওই নভোচারী যখন তার মাপা এই ছোট দূরত্বকে সময় দিয়ে ভাগ করবে, সে-ও কিন্তু আলোর বেগই পাবে। আর আমরা তো আগেই জেনেছি, আলোর বেগ সবার জন্যই সমান! তাই তাকেও তোমার মতো ঠিক একই ফলাফল পেতে হবে। অর্থাৎ সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। কিন্তু তার মাপা আলোর পথ তো ছোট ছিল! তাহলে একই বেগ কীভাবে হলো?

এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে—তার ঘড়ি তোমার চেয়ে ধীরগতিতে চলছে!

অবশ্য পুরো ঘটনাটি একদম উল্টোভাবেও সত্যি। তুমি যদি তোমার যানের ভেতর একইভাবে আলো ফেলে পরীক্ষা করো, তবে সে তোমার জানালার দিকে তাকিয়ে আলোর পথটিকে V আকৃতির দেখবে। আর সে হিসাব কষে বলবে, তোমার ঘড়িই তার চেয়ে ধীরগতিতে চলছে!

দৈর্ঘ্য ও সময়ের এই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া পরিবর্তনগুলোকে আপাত পরিবর্তন বলা হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনো একটা আসল বা সত্যিকারের দৈর্ঘ্য ও সময় আছে, যা শুধু ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষকের কাছে ভিন্ন রকম মনে হচ্ছে। দৈর্ঘ্য এবং সময় হলো আপেক্ষিক ধারণা। কে মাপছে এবং কোন প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে মাপছে, এটা ছাড়া এগুলোর আর কোনো অর্থই নেই।

এখানে একজন মেপে আসল সত্যিটা পেয়েছে আর অন্যজনের মাপজোখ ভুল, এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। যে মাপছে, তার সাপেক্ষে তার মাপা হিসাবটাই একদম নিখুঁত এবং সত্যি। এর চেয়ে বেশি সত্যি হওয়ার আর কোনো উপায় নেই। এগুলো কোনো চোখের ভুল বা দৃষ্টিভ্রম নয় যে কোনো মনোবিজ্ঞানী এসে এর ব্যাখ্যা দেবেন! এগুলো চাইলে যন্ত্র দিয়ে নিখুঁতভাবে মাপা ও রেকর্ড করা যায়। এর জন্য কোনো জ্যান্ত মানুষ পর্যবেক্ষক থাকারও দরকার নেই।

দৈর্ঘ্য ও সময়ের মতো বস্তুর ভর বা ওজনও একটা আপেক্ষিক ধারণা। তবে সেই দারুণ গল্পটা আমরা বরং পরের অধ্যায়ের জন্যই তুলে রাখি!

আরও পড়ুন