মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণী কেন কাঁদে না, মানুষের কান্নার পেছনের বিজ্ঞান

মিডজার্নি

মানুষের চোখ একটু অদ্ভুতই বটে! চোখ দুটি জেলি দিয়ে তৈরি একটা বড় গোলকের মতো। এর মাঝখানে রঙিন একটা রিং আর তার ঠিক কেন্দ্রে একটা কালো বিন্দু! এই চোখ দিয়েই আমরা চারপাশের সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখি।

চোখের আবার একটু বাতিকও আছে! বাইরের ধুলাবালু আর জীবাণু থেকে বাঁচতে একে সব সময় ভিজে থাকতে হয়। গাড়ির কাচে যেমন ওয়াইপার আর পানি দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করা হয়, আমাদের চোখেরও তেমনি নিজস্ব পরিষ্কার করার ব্যবস্থা আছে। আর সেটাই হলো আমাদের চোখের পানি বা অশ্রু!

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, শুধু চোখে ধুলা গেলেই যে আমরা কান্না করি, তা কিন্তু নয়। খুব আবেগের কোনো সিনেমা বা কার্টুন দেখলে কিংবা খুব মন খারাপ হলেও আমাদের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে শুরু করে!

আবেগের কারণে এই যে কান্না, এটা কিন্তু পৃথিবীতে কেবল মানুষেরই আছে! তোমার পোষা কুকুর বা বিড়াল হয়তো তোমাকে না দেখলে মন খারাপ করে গোঙাতে পারে, কিন্তু চোখ দিয়ে এভাবে পানি ঝরিয়ে কান্নার ক্ষমতা ওর নেই। এটা শুধু আমাদেরই আছে।

আরও পড়ুন

কিন্তু কেন আমরা আবেগে কান্না করি? আর বড় হওয়ার পরও কেন এই অভ্যাস আমাদের থেকে যায়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, আবেগের কারণে কাঁদার বেশ কিছু দারুণ উপকারিতা আছে। আর আছে কিছু অদ্ভুত কারণও! চলো, জেনে নিই।

অন্য প্রাণীদের বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করলে মানবশিশুরা কিন্তু জন্মের সময় ভীষণ অসহায় থাকে। ধরো, সামুদ্রিক কচ্ছপের ছানারা ডিম থেকে ফুটেই নিজেদের লড়াই নিজেরা শুরু করতে পারে। কিন্তু আমরা জন্মাই একদম নরম তুলতুলে আর অসহায় হয়ে! আমরা তখন নিজেরা নড়তে পারি না, খেতে পারি না, এমনকি নিজের ঘাড়টাও সোজা রাখতে পারি না।

কিন্তু ভাগ্যিস, আমাদের মা–বাবারা আমাদের দারুণ যত্ন নেন! আমাদের জীবনের প্রথম একটা বড় সময় কাটে শুধু বেঁচে থাকার সাধারণ জিনিসগুলো শিখতে। আর এই দীর্ঘ অসহায় সময়টার কারণেই আমাদের ভেতরে আবেগের কান্নার জন্ম হয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

নেদারল্যান্ডসের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অ্যাড ভিংগারহোটস পুরো জীবন পার করেছেন মানুষের আবেগ ও মানসিক চাপ নিয়ে গবেষণা করে। তিনি বলেন, শিশুদের যেহেতু চলাফেরার ক্ষমতা থাকে না, তাই তারা শব্দ করে কাঁদে। এই কান্না একধরনের সংকেত। অন্ধকারে বা ঘন জঙ্গলেও এই কান্নার শব্দ শুনে মা তার সন্তানকে খুঁজে পেতেন।

তবে এই কান্নায় একটা বিপদও ছিল। কান্নার শব্দে শুধু মা–ই নয়, হিংস্র প্রাণীরাও আকৃষ্ট হতে পারত! তাই আদিম যুগে কেবল বিপদে পড়লেই শিশুরা শব্দ করে কাঁদত।

আরও পড়ুন

আমরা কীভাবে কান্না করি

ছোট শিশুদের জন্য কান্না অনেকটা অ্যালার্মের মতো। তুমি যদি দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে টেবিলের কোনায় ব্যথা পাও, তখন তুমি চিৎকার করে কাঁদবে। তারপরই বড়রা ছুটে এসে তোমার চিকিৎসা করবেন। কিন্তু মানুষ এই অ্যালার্ম সিস্টেমটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।

বিজ্ঞানী ভিংগারহোটস বলেন, ‘মানবশিশুরা যখন শব্দ করে কাঁদে, তখন তারা তাদের চোখের পেশিগুলোকে খুব শক্ত করে কুঁচকে ফেলে। ফলে চোখের স্নায়ুগুলোয় প্রচণ্ড চাপ পড়ে। চোখে ধুলাবালু গেলে যেমন নার্ভে চাপ পড়ে, ঠিক তেমনি! আর এই চাপের কারণেই আমাদের অশ্রুগ্রন্থি থেকে পানি বের হতে শুরু করে।’ এভাবেই শব্দ করে কান্নার সঙ্গে চোখের পানির একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।

আমরা কেন কান্না করি

চোখের পানি কিন্তু কয়েক রকমের হয়। প্রথমত, রিফ্লেক্স টিয়ার। এই অশ্রু চোখে ধুলা বা পেঁয়াজের ঝাঁজ গেলে বের হয়। দ্বিতীয়ত, কন্টিনিউয়াস টিয়ার। অর্থাৎ সারাক্ষণ চোখকে ভিজে রেখে বর্মের মতো রক্ষা করে এই অশ্রু। আর তৃতীয়ত, ইমোশনাল বা আবেগের কান্না।

আমরা সাধারণত খুব অসহায় বা হতাশ বোধ করলে কান্না করি। কান্না হলো অন্যের কাছ থেকে সহানুভূতি পাওয়ার একটা উপায়। আমরা যখন কান্না করি, তখন চারপাশের মানুষকে বোঝাতে চাই, আমার এখন তোমার সাহায্য ও সমর্থন দরকার। প্রিয়জন মারা গেলে, দূরে চলে গেলে বা প্রচণ্ড হোমসিকনেসে ভুগলেই এই অসহায় বোধ সবচেয়ে বেশি হয়। আর তখন আমরা সবচেয়ে বেশি কান্না করি।

আরও পড়ুন
মিডজার্নি

কান্না করা কি ভালো

অনেকেই হয়তো কান্না করতে পছন্দ করো না। কিন্তু সত্যি বলতে, কান্নার মতো ভালো থেরাপি খুব কমই আছে! অনেক দিন না কাঁদলে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা চাপ বা কষ্ট জমা হয়ে থাকে। তখন মন খুলে একটু কাঁদতে পারলে যেন শান্তি লাগে!

তুমি যখন কান্না করো, তখন তোমার শ্বাস আটকে আসে, কাঁধ কাঁপে ও গলা ব্যথা করে। কিন্তু কান্নার পর মস্তিষ্ক একদম হালকা হয়ে যায়! হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের মতে, আমরা যখন আবেগে কান্না করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিন নামের একটা হরমোন বের হয়। একে বলা হয় ভালোবাসার হরমোন! এটি আমাদের মন ভালো করে দেয় এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে সাহায্য করে।

কান্নার সময় এন্ডোরফিন নামের আরেকটা হরমোনও বের হয়। এটি প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে! এটি আমাদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট কমিয়ে দেয় এবং চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়।

২০০৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার আগে মানুষের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। কিন্তু একবার কান্না শুরু হলে হৃৎস্পন্দন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর ও শান্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ কান্না আমাদের শরীর ও মনকে শান্ত করতে জাদুর মতো কাজ করে!

শিশুরা কান্নার সময় প্রচুর চিৎকার করে, কিন্তু বড়দের আবেগের কান্নায় হয়তো আরও একটি গোপন ব্যাপার লুকিয়ে আছে! বিজ্ঞানী ভিংগারহোটস বলছেন, ‘মানুষের চোখের পানিতে হয়তো ফেরোমন নামে একধরনের অদৃশ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকে।

আরও পড়ুন

কান্না চেপে রেখো না

কেউ কেউ কথায় কথায় খুব সহজেই কেঁদে ফেলে। আবার অনেকের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি বের করাও খুব কঠিন। এর মধ্যে কোনোটাই কিন্তু ভুল নয়। জিনগত কারণেই একেকজনের কান্নার প্রবণতা একেক রকম হয়।

কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন আমরা ইচ্ছা করে কান্না চেপে রাখি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে রিপ্রেসিভ কোপিং বা কষ্ট আটকে রাখা। ২০১২ সালের এক বিশাল গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এভাবে মনের কষ্ট বা কান্না চেপে রাখে, তাদের ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়!

কান্না শুধু বাচ্চাদের জন্য নয়, এটি বড়দের জন্যও সমান জরুরি। আমাদের এত বড় একটা মস্তিষ্ক ও এত সব জটিল আবেগ সামলাতে গিয়ে যদি একটু–আধটু মন খুলে কাঁদতে হয়, তবে ক্ষতি কী? তাই যখনই কষ্ট হবে, একটুও লজ্জা না পেয়ে মন খুলে একটু কেঁদে নিতে পারো! দেখবে, মনটা কেমন পরিষ্কার আকাশের মতো ফুরফুরে হয়ে গেছে!

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন