ইরানের স্কুলে হামলায় শতাধিক শিশুসহ নিহত অন্তত ১৫৩ জন, খোঁড়া হয়েছে গণকবর
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার সকালটা ইরানের অন্য আট-দশটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে সবে ফিরতে শুরু করেছিলেন। ঠিক সে সময়ই পুরো দেশ ভয়াবহ বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে। ইরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলা।
দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এ হামলায় দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে অবস্থিত শাজারেহ তাইয়েবেহ বালিকা বিদ্যালয়টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলার সময় স্কুলে ১৭০ জন ছাত্রী ছিল। ইরানে সাধারণত শনি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কর্মসপ্তাহ চলে। এ জন্য সেদিন এত শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।
মিজান সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শুধু এই স্কুলেই অন্তত ১০০ জন শিশু নিহত হয়েছে এবং আরও অনেক শিশু নিখোঁজ রয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ হামলায় শিশুসহ অন্তত ১৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্কুলটি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি ব্যারাকের ৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত, যা আগেও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলটির পুড়ে যাওয়া দেয়াল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে আর চারপাশ ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে। সেখানে জমা হওয়া শত শত মানুষের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যদিও হতাহতের সঠিক সংখ্যা তৎক্ষণাৎ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে রয়টার্স ও ফার্সি ফ্যাক্টনেম স্কুলটির ছবি ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ইরানের তাসনিম ও ফার্স সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর এ ঘটনাকে চলমান সংঘাতের সবচেয়ে তিক্ত খবর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও কত শিশুর নিথর দেহ বের হবে, তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। ধারণা করা হচ্ছে, স্কুলটি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি ব্যারাকের ৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত, যা আগেও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যদি নিহত মানুষের এই সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে এটি হবে সাম্প্রতিক হামলার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
ইরান এই নজিরবিহীন হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে ওই এলাকায় তাদের কোনো অভিযান চালানোর বিষয়ে তারা অবগত নয়। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, গত শনিবার থেকে ইরানে চলমান বিমান হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা অন্তত ২০১–এ দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৭৪৭ জন।
যখন মানুষের কোনো আশ্রয় নেই, ইন্টারনেট ও ফোনসংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং শিশুদের নিরাপত্তার কোনো সতর্কতা জারি করা হয়নি, তখন এমন ট্র্যাজেডি এড়ানো অসম্ভব ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান এই হামলাকে একটি বর্বর কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আগ্রাসকদের অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি আরও একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স জানিয়েছেন, তাঁরা এসব প্রতিবেদনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা তাঁদের কাছে প্রধান অগ্রাধিকার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি এড়াতে তারা সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দেখা গেছে, গণকবর খোঁড়া হয়েছে। ছবিটি অনেকে শেয়ার দিয়ে লিখছেন, ইরানের স্কুল হামলায় নিহত শিশুদের এখানে গণকবর দেওয়া হবে। দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে এক শোকাবহ গণ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১৬৫ জন শিক্ষার্থী ও কর্মীকে বিদায় জানাতে এই জানাজার আয়োজন করা হয়।
মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা গেছে, মিনাব শহরের একটি পাবলিক স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন। সেখানে কালো চাদর পরিহিত নারী ও পুরুষেরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতাকা হাতে শোক পালন করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে ইরানিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। বিদেশে বসবাসরত এক ইরানি নাগরিক মন্তব্য করেছেন, ‘মিনাবের এই ৪০ জন নিষ্পাপ মেয়েই যুদ্ধের প্রথম শিকার। আপনারা কি এখনো যুদ্ধের জয়ধ্বনি করবেন?’
শনিবার দিনভর ইরানের বিভিন্ন শহরে একের পর এক বিমান হামলা চালানো হয়। রোববারও এ হামলা অব্যাহত ছিল, যার মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন সিনিয়র কমান্ডারের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।