মস্তিষ্ককে তুখোড় করতে ধাঁধার চেয়ে বেশি কার্যকর বোর্ড গেম
আচ্ছা, বুদ্ধি বাড়াতে তুমি কি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা একা সুডোকু মেলাও কিংবা শব্দজব্দ নিয়ে পড়ে থাকো? ভুল কিছু করছ না ঠিকই। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, একঘেয়ে ধাঁধার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে বোর্ড গেম খেলা তোমার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে অনেক বেশি কার্যকর।
আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, বুদ্ধি বাড়াতে হলে শব্দছক বা কঠিন সুডোকু মিলাতে হবে। মস্তিষ্কের ব্যায়াম মানেই বুঝি কোনো জটিল সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, একা একা ধাঁধা মেলানোর চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গোল হয়ে বসে বোর্ড গেম খেলা আমাদের মস্তিষ্ককে অনেক বেশি সচল করে তোলে। কিন্তু আড্ডার ছলে এই খেলাগুলো ঠিক কীভাবে আমাদের চিন্তাভাবনার ধরন বদলে দিচ্ছে?
বুদ্ধি বাড়াতে চাইলে দাবার চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। দাবার প্রতিটি চাল দেওয়ার সময় পরের চালের কথা চিন্তা করতে হয়। অন্যদিকে মনোপলি খেলাটি শিখিয়ে দেয় কীভাবে বুদ্ধির সঙ্গে টাকা খরচ ও বিনিয়োগ করতে হয়। নতুন নতুন শব্দ শেখার জন্য ভালো হলো স্ক্র্যাবল। আর বন্ধুদের সঙ্গে মিলে রহস্য সমাধান করতে চাইলে ক্লুডোর মতো গেমগুলো খেলা যেতে পারে। এসব বোর্ড গেম যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়।
২০১৩ সালে ফ্রান্সে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী যাঁরা নিয়মিত বোর্ড গেম খেলেন, তাঁদের স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায়।
আবার একা একা নিজের মনোযোগ বাড়াতে চাইলে সুডোকু বা শব্দছক সমাধান করা যেতে পারে। এসব ধাঁধা মেলালে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও ধৈর্য বাড়ে। এর বাইরে রুবিকস কিউব মেলানো বা বড় কোনো জিগস পাজল সমাধান করাও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞান বলছে, এই খেলাগুলো কেবল মজার জন্য নয়। এগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে এক জটিল ব্যায়ামের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু বিচার করা, অর্থাৎ ক্রিটিক্যাল থিংকিং, দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মনোযোগ বা স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে এই খেলার মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা যায়। এতে একে অপরের সঙ্গে আড্ডা যেমন জমে, তেমনি সামাজিক সম্পর্কগুলোও বেশ মজবুত হয়।
২০১৩ সালে ফ্রান্সে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী যাঁরা নিয়মিত বোর্ড গেম খেলেন, তাঁদের স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায়। আবার ২০২৫ সালের একটি স্প্যানিশ গবেষণায় দেখা গেছে, নার্সিং হোমে থাকা বয়স্করা যখন সপ্তাহে অন্তত দুবার বোর্ড গেম খেলেন, তখন তাঁদের মস্তিষ্ক আগের চেয়ে বেশি সচল হয় এবং মানসিকভাবে তাঁরা বেশ ভালো থাকেন।
২০২৫ সালের একটি বড় গবেষণায় দাবা খেলোয়াড় এবং নতুন শিখছেন এমন খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের স্ক্যান তুলনা করা হয়।
তবে বোর্ড গেমের এই গুণ কি কেবল বড়দের জন্যই? একদম নয়। শিশুদের বুদ্ধির বিকাশেও এর দারুণ ভূমিকা আছে। যেমন স্কুলে যাওয়ার আগের বয়সেই যেসব শিশু বোর্ড গেম খেলে, তাদের সংখ্যার হিসাব বোঝা বা গণিতের প্রাথমিক দক্ষতা অন্যদের চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ে।
তবে মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়াতে কোন খেলা সবচেয়ে কার্যকর? এ প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা বারবার দাবার কথাই বলেছেন। ২০২৫ সালের একটি বড় গবেষণায় দাবা খেলোয়াড় এবং নতুন শিখছেন এমন খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের স্ক্যান তুলনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত দাবা খেলেন, তাঁদের মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ অংশ সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে চোখের দেখা তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা, চারপাশের জায়গার দূরত্ব বা অবস্থান বোঝা এবং ঝটপট সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ দাবাড়ুদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করে।
যাঁরা ডাঞ্জিয়ন্স অ্যান্ড ড্রাগনস, ক্লুইডো, মনোপলির মতো টেবিলটপ রোল প্লেয়িং গেম খেলেন, তাঁদের জন্য রয়েছে এক দারুণ সুখবর। আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই খেলাগুলো কেবল নিছক কল্পনা নয়। আমাদের মনের সুস্থতার জন্য বেশ উপকারী। খেলার ছলে অন্য এক কাল্পনিক জগতে হারিয়ে যাওয়া, নিজের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করা এবং বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে সমস্যা সমাধান করার এই প্রক্রিয়া মানসিক প্রশান্তি জোগাতে দারুণ কাজ করে।
সূত্র: সায়েন্স ফোকাস, সাইকোলজি টুডে