বিড়ালের মতো মিউ মিউ করল গাঙচিল, কেন এই অদ্ভুত আচরণ
চারপাশের পশুপাখিরা যে কত বুদ্ধিমান, তার অনেক প্রমাণ মাঝেমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। তবে মাঝেমধ্যে এদের এই চতুর কর্মকাণ্ডগুলো দেখতে বেশ মজার ও অদ্ভুত লাগে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনই একটি ঘটনা ভাইরাল হয়েছে।
যদি কাউকে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর নাম বলতে বলা হয়, তবে সেই তালিকায় গাঙচিল বা সিগালের নাম আসবেই না। এই সাহসী পাখিরা কোনো জটিল ধাঁধা সমাধানের চেয়ে মানুষের কাছ থেকে খাবার ছিনিয়ে নেওয়া ও উপকূলীয় এলাকায় ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর জন্যই বেশি পরিচিত। তবে তুরস্কের একদল গাঙচিল সম্পূর্ণ নতুন একটি চতুর দক্ষতা দিয়ে মানুষকে অবাক করে দিয়েছে।
তুরস্কের সেসব গাঙচিল বিড়ালের ডাক হুবহু নকল করতে পারে। অবাক করা বিষয় হলো, এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এই ডাক দেয় না। সেখানকার রাস্তায় অসহায় প্রাণীদের জন্য কিছু ভেন্ডিং মেশিন বা স্বয়ংক্রিয় খাবার বিতরণ যন্ত্র বসানো আছে। চালাক গাঙচিলগুলো মূলত ওই ভেন্ডিং মেশিন থেকে বিনা মূল্যে বিড়ালের খাবার পাওয়ার জন্যই বিড়ালের মতো মিউ মিউ শব্দ করে।
কিন্তু বিড়ালের খাবার দেওয়ার এই মেশিনগুলো আসলে কীভাবে কাজ করে? যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোয় এগুলো সচরাচর দেখা যায় না। তবে তুরস্কে এই যন্ত্রগুলো ক্ষুধার্ত পথবিড়াল ও বুনো বিড়ালের জন্য রাখা থাকে। অবশ্য এখন চালাক গাঙচিলেরাও এর সুবিধা নিচ্ছে। এই যন্ত্রগুলোর মধ্যে কিছু কিছু যন্ত্র টাকা দিলে খাবার বের করে দেয়। আবার কিছু যন্ত্র আছে যেগুলোয় প্লাস্টিকের বোতলের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য জিনিস ফেললে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিড়ালের খাবার বেরিয়ে আসে। সব মিলিয়ে পথচারীদের জন্য এই অসহায় প্রাণীগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে।
এমন ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও বেশ ভাইরাল। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সেখানে বিড়ালের খাবার দেওয়ার যন্ত্রের কাছে চারটি গাঙচিল ঘুরছে। এদের মধ্যে একটি গাঙচিল বিড়ালের ডাক হুবহু নকল করে ডাকছে। ভিডিওটি কিছুদিনের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করেন, এই সুযোগসন্ধানী পাখিরা অনেক চালাক। গাঙচিলগুলো খুব ভালোভাবেই জানে, বিড়ালের মতো ডাকলে কোনো দয়ালু পথচারী ভাববেন আশপাশে হয়তো কোনো ক্ষুধার্ত বিড়াল আছে। আর এই ভেবে সেই পথচারী মেশিনটি চালু করে খাবার বের করে দেন।
খাবারের জন্য নতুন নতুন বুদ্ধি বের করায় গাঙচিলেরা বেশ পারদর্শী। এই পাখিরা সব সময়ই সুযোগ বুঝে খাবার জোগাড় করে। এরা সাধারণত মানুষের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খায় অথবা সুযোগ পেলে মানুষের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু বিড়ালের ডাক দিয়ে খাবার জোগাড় করার এই বুদ্ধি এদের আগের সব চালাকিকে ছাড়িয়ে গেছে।
এ ভিডিওটি দেখার পর একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী কমেন্ট করেছেন, গাঙচিলদের এই কাজ আসলেই অনেক বুদ্ধিমানের মতো। বিশেষ করে এরা যদি বিড়ালের খাবার পছন্দ করে ও তা খেয়ে ফেলে, তবে এই বুদ্ধি কাজে দেবে। আরেকজন মজা করে লিখেছেন, এই গাঙচিলগুলো নদী বা সমুদ্র থেকে মাছ ধরা ছাড়া দুনিয়ার বাকি সব কাজই করতে পারবে।
কোনো পাখির বিড়ালের মতো মিউ শব্দ করাকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা মনে হতে পারে। তবে এটি বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারে নতুন বা অচেনা কোনো বিষয় নয়। ভেনিস ও অসলোর মতো বড় শহরগুলো থেকেও গাঙচিলের এমন আচরণের খবর পাওয়া গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট পাখির বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়।
গাঙচিলের আসলে বিভিন্ন রকম ডাক রয়েছে। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গাঙচিলেরা এদের ছানাদের ডাকতে কিংবা শত্রুদের সতর্ক করতে একধরনের মিউ শব্দ ব্যবহার করে। সাধারণত ঘাড় বাঁকিয়ে সামনের দিকে হাঁটার সময় এরা এই ডাক দেয়। তবে তুরস্কের ভিডিওতে দেখতে পাওয়া গাঙচিলটির আচরণ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে পাখিটি ঘাড় সোজা রেখে স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। এমনকি শব্দ করার সময় এটি কাছাকাছি থাকা বিড়ালদের দিকে মাথা ঘোরাচ্ছিল। এ আচরণটি এদের স্বাভাবিক ডাক বা স্বভাবের সঙ্গে মোটেও মেলে না।
গাঙচিলের এই নতুন আচরণ থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। তা হলো, সাধারণ মানুষ গাঙচিলকে যতটা বুদ্ধিমান মনে করে, এরা আসলে তার চেয়ে বেশি চতুর। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই পাখিরা শুধু নানা রকম সমস্যার সমাধানই করতে পারে, এমন নয়; বরং খাবার জোগাড় করার জন্য এরা আগে থেকে বেশ নিখুঁত পরিকল্পনা করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, খাবার পাওয়ার জন্য এরা চারপাশের পরিবেশ ও অন্য প্রাণীদের আচরণকে ব্যবহার করার মতো কৌশলেও বেশ পারদর্শী।