পর্যটন পার্কে ২ সপ্তাহে ৭২ বাঘের প্রাণ গেল কীভাবে

৮ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে টাইগার কিংডম মে টায়ংয়ে ৫১টি ও টাইগার কিংডম মে রিমে ২১টি বাঘ মারা যায়।লাইভ সায়েন্স থেকে

থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় চিয়াং মাই প্রদেশের দুটি বন্য প্রাণী পার্কে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ৭২টি বাঘ মারা গেছে। অস্বাভাবিক এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ঠিক কোন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এতগুলো বাঘের একসঙ্গে মৃত্যু হলো, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

পার্কটি পর্যটকদের কাছে ছিল বেশ জনপ্রিয়। কারণ, এখানে দর্শনার্থীরা খুব কাছ থেকে বাঘ দেখার পাশাপাশি সরাসরি এদের ছোঁয়ার ও সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেতেন। মূলত হিংস্র এই প্রাণীদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা নিতেই প্রতিদিন সেখানে শত শত মানুষের ভিড় জমত। তবে মানুষের এই অবাধ যাতায়াত কিংবা স্পর্শের মাধ্যমেই কোনো প্রাণঘাতী জীবাণু বাঘদের মধ্যে ছড়িয়েছিল কি না, তা এখন ভাবাচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

৮ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে টাইগার কিংডম মে টায়ংয়ে ৫১টি ও টাইগার কিংডম মে রিমে ২১টি বাঘ মারা যায়। এ ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে টাইগার কিংডম মে রিম পার্কটি ১৪ দিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসকেরা মৃত বাঘের শরীর ও এদের দেওয়া খাবার পরীক্ষা করেছেন। প্রাথমিক পরীক্ষায় বাঘগুলোর শরীরে ‘ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাস’ নামের একধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ভাইরাস যখন বাঘের শরীরে আক্রমণ করে, তখন সংক্রমণ অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

বাঘগুলোর শরীরে জীবাণু পাওয়া গেলেও সেই জীবাণুর উৎস আসলে কী, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে বিজ্ঞানীদের সন্দেহ বাঘের খাবার নিয়ে। পার্কের ওই দুটি কেন্দ্রে একটি বেসরকারি খামার থেকে কাঁচা মুরগির মাংস সরবরাহ করা হতো। ধারণা করা হচ্ছে, এই কাঁচা মাংসের মাধ্যমেই হয়তো প্রাণঘাতী ভাইরাসটি বাঘের শরীরে প্রবেশ করেছে।

কাঁচা মুরগির মাংস থেকে বাঘের মৃত্যুর ঘটনা থাইল্যান্ডে এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৪ সালে চোনবুরি প্রদেশের একটি চিড়িয়াখানায় বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছিল। এর কারণ হিসেবেও কাঁচা মুরগিকেই দায়ী করা হয়েছিল। সে সময় রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রায় ১৫০টি বাঘকে মেরে ফেলা হয়েছিল।

সংরক্ষণ এলাকা ব্যবস্থাপনা অঞ্চলের পরিচালক জানিয়েছেন, মৃত বাঘগুলোকে সমাহিত করা হয়েছে। তবে প্রতিটি বাঘের মরদেহ শনাক্ত করার জন্য বিশেষ নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আবারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়।

আরও পড়ুন

টাইগার কিংডমের এই কেন্দ্রগুলোতে মোট ২৪৬টি বাঘ ছিল। কিন্তু এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের ফলে একসঙ্গে এতগুলো বাঘের মৃত্যু থাইল্যান্ডের ইতিহাসে এক শোকাবহ ঘটনা হয়ে থাকবে। বন্য প্রাণী পার্কের কর্মকর্তাদের মতে, সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মারা যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত বাঘগুলোর শরীরে অসুস্থতার কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। হঠাৎই এরা মারা যায়।

ভয়ংকর এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে এখন বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের মহাপরিচালক নির্দেশ দিয়েছেন, বাঘের থাকার ঘরগুলো ও চলাফেরার স্থানগুলো খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এ ছাড়া বাকি বাঘগুলো এখনো বেঁচে আছে, এদের টিকা না দেওয়া পর্যন্ত অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে বলা হয়েছে।

কিন্তু কেন এই বাঘগুলোকে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলো না? কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অসুস্থ বাঘের চিকিৎসা আর পোষা কুকুর-বিড়ালের চিকিৎসা মোটেও এক নয়। কুকুর বা বিড়াল মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে, তাই এদের সামান্য সর্দি-কাশি বা আচরণে বদল এলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি।

আরও পড়ুন

কিন্তু বাঘ তো আর মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বাস করে না। তাই এদের শরীরে জীবাণু বাসা বাঁধলেও বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। যখন এদের আচরণ দেখে বোঝা যায় যে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে, ততক্ষণে রোগটি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক এ কারণেই বাঘগুলোকে বাঁচানোর সুযোগ পাওয়া যায়নি।

গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, ভাইরাসের সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নতুন করে আর কোনো বাঘ মারা যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে চিয়াং মাই বাঘের খামারে কর্মরত কোনো পশুচিকিৎসক বা কর্মী ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। তবু নিরাপত্তার খাতিরে রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগ তাদের ২১ দিনের জন্য পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

তবে এ ঘটনা বন্য প্রাণী ও প্রাণী অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রাণী অধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বাঘের এই করুণ মৃত্যু থাইল্যান্ডের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বন্দী বাঘের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশন থাইল্যান্ড’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এমন বন্দী অবস্থায় বন্য প্রাণী পালনের ফলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পর্যটকেরা যদি বিনোদনের জন্য এসব জায়গায় যাওয়া বন্ধ করেন, তবেই এমন ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব।

সূত্র: লস অ্যাঞ্জেলেস টাইম, পিপল ম্যাগাজিন, এবিসি নিউজ, ফার্স্টপোস্ট

আরও পড়ুন