হারিয়ে যাওয়া যে ছয়টি শহর এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মাটির নিচ থেকে পুরোনো সভ্যতা খুঁজে বের করতে ওস্তাদ। কিন্তু তাঁরা কি সব খুঁজে পেয়েছেন? মোটেই না। ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু বিশাল শহরের নাম আছে, যেগুলো আজও কেউ খুঁজে পায়নি। মাটির নিচে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। সেগুলোর মধ্যে আছে বড় বড় সাম্রাজ্যের রাজধানীও।
এই শহরগুলো যে সত্যি সত্যিই ছিল, তা আমরা নিশ্চিত। কারণ, প্রাচীন পুঁথি ও শিলালিপিতে এদের বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেগুলোর ঠিকানা হারিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিকদের আগেই চোর বা ডাকাতেরা এসব শহর খুঁজে পেয়েছে! তারা সেখান থেকে প্রাচীন সব জিনিসপত্র চুরি করে বাজারে বিক্রিও করেছে। কিন্তু শহরটা আসলে কোথায়, সেই গোপন খবর তারা কাউকে বলেনি। এমন ছয়টি শহর নিয়েই আজকের আলোচনা।
১. আইরিসাগরিগ
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকে আক্রমণ করে, তার ঠিক পরপরই চোরাবাজারে অদ্ভুত কিছু মাটির ফলক আসতে শুরু করে। এগুলো ছিল আইরিসাগরিগ নামের এক শহরের। গবেষকেরা বুঝতে পারলেন, প্রায় চার হাজার বছর আগে ইরাকের বুকেই এ শহর ছিল বেশ সমৃদ্ধ।
ফলকগুলো থেকে জানা যায়, এ শহরের রাজারা কুকুর খুব ভালোবাসতেন! তাঁদের প্রাসাদে প্রচুর কুকুর থাকত। এমনকি তাঁরা সিংহও পুষতেন এবং সিংহদের খেতে দেওয়া হতো গবাদিপশু। যাঁরা এই সিংহদের দেখাশোনা করতেন, তাঁদের বলা হতো লায়ন শেফার্ড বা সিংহপালক। বেতন হিসেবে তাঁরা পেতেন বিয়ার আর রুটি! দুষ্টুমি আর জ্ঞানের দেবতা এনকির একটা মন্দিরও ছিল সেখানে।
গবেষকদের ধারণা, ২০০৩ সালের ডামাডোলের সময় লুটারেরা এ শহর খুঁজে পায় এবং লুটপাট চালায়। কিন্তু তারা জায়গাটা চিনিয়ে দেয়নি এবং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা আজও শহরটা খুঁজে পাননি।
২. ইজতাউই
মিসরের ফারাও প্রথম আমেনেমহাট ঠিক করেছিলেন, তিনি নতুন একটি রাজধানী বানাবেন। নাম দিলেন ইজতাউই। এ শব্দের মানে দুই ভূমির দখলকারী। নাম শুনেই বোঝা যায়, তাঁর সময়টা খুব শান্ত ছিল না। শেষমেশ তাঁকে হত্যাই করা হয়েছিল।
ফারাও মারা গেলেও তাঁর শহর কিন্তু টিকে ছিল। ১৬৪০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এটিই ছিল মিসরের রাজধানী। এরপর হাইকসোস নামের এক গোষ্ঠী এসে মিসর দখল করে। ফলে ভেঙে পড়ে রাজ্য।
ইজতাউই আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন, মধ্যমিসরের লিসট এলাকার আশেপাশেই এটি কোথাও বালুর নিচে চাপা পড়ে আছে। কারণ, লিসটেই প্রথম আমেনেমহাটের পিরামিড আর অনেক অভিজাত কবর পাওয়া গেছে।
৩. আক্কাদ
নামটা হয়তো আগে কখনো শুনেছ। আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এই আক্কাদ। ২৩৫০ থেকে ২১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে এই সাম্রাজ্য ছিল তুঙ্গে। পারস্য উপসাগর থেকে আনাতোলিয়া পর্যন্ত ছিল এর বিস্তার। রাজা সারগন অব আক্কাদের সময়েই এটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছিল।
শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল ইউলম্যাশ। এটি যুদ্ধ, সৌন্দর্য ও উর্বরতার দেবী ইশতারের মন্দির। ২১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ইরাকের কোথাও এটি লুকিয়ে আছে। কিন্তু ঠিক কোথায় আছে, তা আজও এক রহস্য।
৪. আল-ইয়াহুদু
এই নামের অর্থ জুড়াহর শহর। ৫৮৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনের রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার যখন জুড়াহ রাজ্য জয় করেন, তখন সেখান থেকে ইহুদিদের ধরে এনে নির্বাসনে পাঠান। ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের ভেতরেই এই নির্বাসিত মানুষেরা আল-ইয়াহুদু নামে বসতি গড়ে তোলে।
এই শহরের প্রায় ২০০টি ফলক পাওয়া গেছে। সেখান থেকে জানা যায়, নির্বাসনে থেকেও মানুষেরা তাদের ধর্ম পালন করত। তাদের নামের সঙ্গে ঈশ্বরের নাম ইয়াহওয়ে যুক্ত থাকত।
আক্কাদ বা আইরিসাগরিগের মতো এটিও সম্ভবত ইরাকেই অবস্থিত। যেহেতু এর ফলকগুলো চোরাবাজারে পাওয়া গেছে, কিন্তু কোনো সরকারি খননে মেলেনি, তাই ধারণা করা হয়—চোর বা ডাকাতেরা এটি আগে খুঁজে পেয়েছে এবং যথারীতি জায়গাটা গোপন রেখেছে।
৫. ওয়াশুকান্নি
১৫৫০ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে মিতান্নি সাম্রাজ্য ছিল বেশ শক্তিশালী। সিরিয়া, তুরস্ক ও ইরাকের কিছু অংশজুড়ে ছিল তাদের রাজত্ব। উত্তরে হিট্টাইট এবং দক্ষিণে অ্যাসিরীয়দের সঙ্গে তাদের সমানে টক্কর চলত। এই মিতান্নি সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল ওয়াশুকান্নি।
এ শহরের মানুষেরা হুরিয়ান নামে পরিচিত ছিল। তাদের ছিল নিজস্ব ভাষা। কিন্তু তাদের সেই গর্বের রাজধানী ওয়াশুকান্নি আজ নিখোঁজ। গবেষকদের ধারণা, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কোথাও এটি মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
৬. থিনিস
মিসরীয় সভ্যতার একদম শুরুর দিকের শহর থিনিস। প্রাচীন লেখক মানেথোর মতে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে যখন মিসর সবে একীভূত হচ্ছিল, তখন শুরুর দিকের রাজারা এখান থেকেই শাসন করতেন। পরে রাজধানী মেমফিসে সরিয়ে নেওয়া হলেও থিনিস তার গুরুত্ব হারায়নি। ওল্ড কিংডম আমলেও এটি একটি প্রদেশের রাজধানী ছিল।
দক্ষিণ মিসরের অ্যাবিডোসের কাছেই থিনিস অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়। কারণ, পাঁচ হাজার বছর আগের অনেক রাজা-বাদশাহ আর অভিজাতদের কবর এ এলাকায় পাওয়া গেছে। কিন্তু মূল শহরটা? সেটা আজও মিসরের বালুর নিচে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স