নতুন ভাষা শিখতে কতগুলো শব্দ জানতে হয়
পছন্দের কোনো ভিনদেশি মুভি বা সিরিজের টানটান উত্তেজনার দৃশ্য চলছে। চোখের পলক ফেলার উপায় নেই। কিন্তু তোমার চোখ আটকে আছে স্ক্রিনের নিচের ছোট্ট সাদা সাবটাইটেলে! সাবটাইটেল পড়তে গিয়ে হয়তো সেই চমৎকার দৃশ্য মিস করে গেলে। কিন্তু কেমন হতো যদি ওই ভাষা নিজে বুঝতে!
ইংরেজি, স্প্যানিশ, জাপানিজ কিংবা কোরিয়ানের মতো যেকোনো ভাষা শেখার ভূত যখন মাথায় চাপে, তখন সবার প্রথমেই যে বিশাল প্রশ্নটা সামনে আসে, তা হলো কতগুলো শব্দ শিখতে হবে। ডিকশনারির হাজার হাজার পাতা দেখে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হয়। মনে প্রশ্ন জাগে, একটা ভাষা ঠিকঠাক বোঝার জন্য ঠিক কতগুলো শব্দ মুখস্থ করতে হবে? এক লাখ? পঞ্চাশ হাজার? নাকি আরও বেশি?
চলো, আজ বিজ্ঞান ও ভাষাবিদদের গবেষণার খাতা ঘেঁটে এই রহস্যের সমাধান করা যাক।
সংখ্যা গোনার আগে একটা বিশাল স্বস্তির খবর দিয়ে রাখি। ভাষাবিজ্ঞানীরা যখন শব্দ গোনেন, তখন তারা ডিকশনারির প্রতিটি শব্দ আলাদা করে গোনেন না। তাঁরা গোনেন ওয়ার্ড ফ্যামিলি বা শব্দের পরিবার হিসেবে। ব্যাপারটা খুব সহজ। ধরো, একটা শব্দ হলো Play। এখন এই play থেকে আরও অনেক শব্দ তৈরি হয়—Plays, Played, Playing, Player। ডিকশনারিতে এগুলো ৫টি আলাদা শব্দ হলেও তোমার মস্তিষ্ক কিন্তু জানে যে এগুলো আসলে একটাই মূল শব্দ থেকে এসেছে। তাই বিজ্ঞানীরা এই পুরো দলটিকে মাত্র ১টি ওয়ার্ড ফ্যামিলি হিসেবে ধরেন। এতে শব্দভান্ডারের আকার ছোট হয়ে আসে।
৮০০ থেকে ১,০০০ শব্দ
যেকোনো নতুন ভাষায় প্রথম এক হাজার শব্দ শেখা হলো সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং সবচেয়ে কঠিন ধাপ। এই এক হাজার শব্দ হলো একটা ভাষার কঙ্কাল বা মূল ভিত্তি।
আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশজুড়ে থাকে ভাষার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাত্র এক হাজার শব্দ! এর মধ্যে থাকে সাধারণ সর্বনাম আমি, তুমি, সে। সবচেয়ে দরকারি কিছু ক্রিয়াপদ যেমন খাওয়া, যাওয়া, করা, ঘুমানো এবং ছোট ছোট সংযোগকারী শব্দও থাকে এই তালিকায়।
এই এক হাজার শব্দ জানা থাকলে তুমি কী করতে পারবে? তুমি সেই দেশে গিয়ে হারিয়ে যাবে না। দোকানে গিয়ে খাবার অর্ডার করতে পারবে, রাস্তা চিনতে পারবে, নিজের নাম-পরিচয় দিতে পারবে এবং অন্য মানুষের খুব ধীরগতির ও সাধারণ কথাবার্তার মূল ভাবটা ধরতে পারবে। তুমি হয়তো প্রতিটি শব্দের অর্থ বুঝবে না, কিন্তু কথার আসল উদ্দেশ্যটা ঠিকই তোমার মাথায় ঢুকে যাবে।
২ হাজার থেকে ৩ হাজার শব্দ
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো ভাষার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ৩ হাজার শব্দ জানা থাকলে একটা জাদুকরি ঘটনা ঘটে। এই ৩ হাজার শব্দ দিয়ে প্রতিদিনের সাধারণ কথাবার্তার প্রায় ৯০ শতাংশ কভার করা যায়!
এই লেভেলে এসে ভাষা আর তোমার কাছে ভিনগ্রহের কোনো কোড মনে হবে না। তুমি অনায়াসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারবে। ইউটিউবে ভিডিও দেখে হাসতে পারবে। পরিচিত কোনো বিষয় নিয়ে কেউ কথা বললে তুমি সাবলীলভাবে নিজের মতামতও দিতে পারবে।
এমনকি এই ৩ হাজার শব্দ জানা থাকলে তুমি মুভি বা টিভি সিরিজের কাহিনীর খেই হারাবে না। হয়তো মাঝেমধ্যে দুই-একটা কঠিন শব্দে হোঁচট খাবে, কিন্তু পুরো দৃশ্য আর আগের কথার সূত্র ধরে তোমার মস্তিষ্ক নিজে থেকেই সেই অজানা শব্দের অর্থ মিলিয়ে নেবে।
৫ হাজার থেকে ৬ হাজার শব্দ
৩ হাজার শব্দ নিয়ে যখন তুমি কোনো উপন্যাস বা খবরের কাগজ পড়তে যাবে, তখন পদে পদে আটকে যাবে। কারণ, আমরা মুখে কথা বলার সময় খুব সাধারণ শব্দ ব্যবহার করলেও, লেখার সময় লেখকেরা একটু কঠিন, বৈচিত্র্যময় এবং সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যবহার করেন।
তাই তুমি যদি কোনো বিদেশি ভাষার বই, কমিকস বা নিউজ আর্টিকেল পড়ে মজা পেতে চাও, তবে তোমার শব্দভান্ডার বাড়াতে হবে। গবেষকেরা বলেন, ৫-৬ শব্দ জানা থাকলে একটা ভাষার লিখিত রূপের প্রায় ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ কভার করা যায়।
এই লেভেলে পৌঁছালে তুমি সাবটাইটেল ছাড়াই তোমার প্রিয় মুভি বা সিরিজ উপভোগ করতে পারবে। বই পড়ার সময় তোমাকে প্রতি দুই মিনিট পরপর ডিকশনারি হাতড়াতে হবে না। অজানা শব্দ এলেও গল্পের প্রবাহ নষ্ট হবে না। তুমি তখন ভাষাটাকে আর শিখবে না, বরং ওই ভাষার মাধ্যমে নতুন কিছু জানতে শুরু করবে।
৮ হাজার থেকে ১০ হাজারের বেশি শব্দ
এটি হলো একদম উচ্চতর ধাপ। ৮ হাজার থেকে ১০ হাজারের বেশি শব্দ জানা থাকলে তুমি যেকোনো বিষয়ে গভীর আলোচনা করতে পারবে। খবরের কাগজের জটিল সম্পাদকীয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার বুঝতে তোমার কোনো সমস্যাই হবে না।
ভাষার সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ, রূপক অর্থ বা জোকস শুনে তুমি ঠিক নেটিভ স্পিকারদের মতোই রিঅ্যাক্ট করতে পারবে।
নেটিভ স্পিকাররা কত শব্দ জানে
এখন তোমার মনে হতে পারে, আচ্ছা, যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি বা স্প্যানিশ, তারা নিজেরা কত শব্দ জানে?
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ৮ বছর বয়সী নেটিভ স্পিকার প্রায় ১০ হাজার শব্দ জানে। তোমার মতো একজন ১৫ বা ১৬ বছর বয়সী কিশোর নেটিভ স্পিকারের শব্দভান্ডার হয় প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার শব্দের। আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চশিক্ষিত নেটিভ স্পিকার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার শব্দ জানেন!
এই বিশাল সংখ্যা দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। নেটিভ স্পিকাররা এই শব্দগুলো মুখস্থ করেনি। তারা জন্ম থেকে ওই পরিবেশের মধ্যে থেকে, বছরের পর বছর শুনে শুনে প্রাকৃতিকভাবেই এগুলো শিখেছে। তোমার তো আর শেক্সপিয়ার হওয়ার দরকার নেই! শেক্সপিয়ার তাঁর জীবনে প্রায় ৬৫ হাজার শব্দ জানতেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু তোমার দৈনন্দিন জীবন, ইন্টারনেট ব্রাউজিং আর বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ৩ থেকে ৫ হাজার শব্দই যথেষ্ট!
কীভাবে বাড়াবে তোমার শব্দভান্ডার
ডিকশনারির এ থেকে জেড পর্যন্ত মুখস্থ করার মতো বোরিং এবং ভুল পদ্ধতি পৃথিবীতে আর নেই। তাহলে শব্দ শিখবে কীভাবে? চলো কিছু পরামর্শ দিই।
১. ফ্রিকোয়েন্সি লিস্ট ধরে এগোও
ইন্টারনেটে খুঁজলেই যেকোনো ভাষার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১ হাজার শব্দের তালিকা পাওয়া যায়। সবার আগে এই শব্দগুলো টার্গেট করো। কারণ, ভাষার আসল জাদু এই শব্দগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
২. পড়ো এবং দেখো
তোমার যেটা পছন্দ, সেটাই পড়ো। তুমি যদি মার্ভেলের ফ্যান হও, তবে ইংরেজিতে মার্ভেলের কমিকস পড়ো। যদি ফুটবল ভালো লাগে, তবে স্প্যানিশ লিগের খবরগুলো ইংরেজিতে পড়ার চেষ্টা করো। পড়ার সময় যে শব্দগুলো বারবার চোখে পড়বে, সেগুলো এমনিতেই তোমার মাথায় গেঁথে যাবে।
৩. শব্দ নিয়ে মজা করো
তুমি যতগুলো শব্দ দেখে বা শুনে চিনতে পারো, কথা বলার সময় তার অর্ধেকও মনে পড়ে না। তাই নতুন শব্দ শিখলে সেটা দিয়ে বন্ধু বা ভাইবোনকে নিয়ে মজার কোনো বাক্য বানিয়ে ফেলো। শব্দ যত মজাদার পরিস্থিতিতে ব্যবহার করবে, মস্তিষ্ক সেটা তত দ্রুত মনে রাখবে।
৪. ফ্ল্যাশকার্ডের জাদু
আংকি বা কুইজলেটের মতো অ্যাপ ব্যবহার করতে পারো। এগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে ঠিক তখনই তোমাকে একটা শব্দ মনে করিয়ে দেবে, যখন তুমি সেটা ভুলে যেতে বসবে।
নতুন একটা ভাষা শেখা মানে আসলে নতুন একটা পৃথিবী আবিষ্কার করা। একটা ভাষায় তুমি যতগুলো শব্দ জানো, ওই পৃথিবীর তত বড় একটা অংশ তুমি দেখতে পাও। ৩ হাজার শব্দের জাদুকরি গণ্ডি পার হওয়ার পর তুমি যখন প্রথমবার কোনো বিদেশি মুভি সাবটাইটেল ছাড়াই পুরোপুরি বুঝে হেসে উঠবে, সেই অনুভূতিটা হবে মাইন্ড-ব্লোয়িং!
তাই আজ থেকেই শুরু হোক তোমার নতুন শব্দ শিকারের রোমাঞ্চকর অভিযান।
সূত্র: হাউ লার্জ আ ভোকাবুলারি ইজ নিডেড ফর রিডিং অ্যান্ড লিসেনিং/পল ন্যাশন, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটন