শেষমেশ চর্বি গিয়ে কেন পেটেই জমা হয়
বর্তমানে পেট বেড়ে যাওয়া বা ভুঁড়ি হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেকের জন্যই বেশ অস্বস্তিকর। প্রায় দেখা যায়, সারা শরীর হয়তো বেশ রোগাপাতলা, কিন্তু পেটটা ঠিকই ফুটবলের মতো গোল। দেখে মনে হয়, চর্বিগুলো শরীরের অন্য কোথাও না গিয়ে সব যেন পেটেই জমা হচ্ছে। আচ্ছা, কখনো কি ভেবে দেখেছ, শরীরের এত জায়গা থাকতে সব মেদ কেন শেষমেশ পেটে গিয়েই জমা হয়?
আমাদের শরীর চলে ক্যালরি বা শক্তির সাহায্যে। আর এই শক্তি আমরা পাই খাবার থেকে। যখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খাই, তখন শরীরে বাড়তি শক্তি জমা হয়। কিন্তু আমরা যদি পরিশ্রম বা ব্যায়াম করে সেই শক্তি খরচ না করি, তবেই বিপদ। শরীর তখন এই বাড়তি শক্তিকে চর্বি বা ফ্যাট হিসেবে জমিয়ে রাখে।
আসলে চর্বিযুক্ত খাবারে অন্য যেকোনো খাবারের চেয়ে অনেক বেশি ক্যালরি থাকে। তাই অল্প একটু চর্বিযুক্ত খাবার খেলেও আমাদের শরীরে প্রচুর ক্যালরি ঢুকে পড়ে। আর এর পরিমাণ আরও বেড়ে যায় যখন প্রচুর চিনিযুক্ত বা প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার খাওয়া হয়। এর ফলে আমাদের শরীরের বিপাক বা খাবার হজম করে শক্তি বানানোর ক্ষমতা ধীর হয়ে যায়। তখন চাইলেও সহজে ওজন কমানো যায় না। এই পুষ্টিহীন ক্যালরিগুলোই সবার আগে আমাদের পেটে গিয়ে জমা হয়। আর এভাবেই খুব দ্রুত পেটের মেদ বেড়ে গিয়ে আমাদের ভুঁড়ি তৈরি হয়।
আসলে পেটের এই মেদ বৃদ্ধির পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করে। আমাদের অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার অভাব আর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেস—সবকিছু মিলেই পেটে মেদ জমতে সাহায্য করে। তবে এই ভুঁড়ি কমানোর উপায় কিন্তু আমাদের কাছেই আছে। প্রতিদিনের অভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন আর পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করলেই এই বাড়তি মেদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
তবে পেটের এই মেদ কিন্তু সব একরকম নয়। বিজ্ঞানীরা একে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হলো ভিসারাল মেদ। এই চর্বিটুকু বেশ বিপজ্জনক। কারণ, এটি আমাদের পেটের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লিভার বা পাকস্থলীকে জালের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রাখে। আর দ্বিতীয়টি হলো সাবকিউটেনিয়াস মেদ। এটি থাকে সরাসরি আমাদের ত্বকের নিচে। বাইরে থেকে আমরা পেটের যে চর্বিটুকু হাত দিয়ে ধরতে পারি, সেটিই এই মেদ।
আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বাইরের চর্বির চেয়ে ভেতরের ভিসারাল মেদ অনেক বেশি ক্ষতিকর। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একটু সচেতন হয়ে নিয়মিত শরীরচর্চা আর জীবনযাত্রায় কিছুটা বদল আনলেই খুব সহজে এই দুই ধরনের মেদ কমিয়ে নিজেকে সুস্থ রাখা সম্ভব।
ভিসারাল মেদ পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জমা হওয়ার পেছনে রয়েছে কিছু জৈবিক কারণ। আমাদের পেটের এলাকায় রক্ত চলাচল শরীরের অন্যান্য অংশের চেয়ে অনেক বেশি। তাই শরীর যখন দ্রুত শক্তির প্রয়োজনবোধ করে, তখন সে পেটের কাছে জমা রাখা চর্বি সহজেই ব্যবহার করতে পারে। একে অনেকটা আমাদের শরীরের এমার্জেন্সি পাওয়ার ব্যাংক বলা যেতে পারে।
পেটের মেদ জমার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কর্টিসল নামের একটি হরমোন। একে বলা হয় স্ট্রেস হরমোন। আমরা যখন খুব দুশ্চিন্তায় থাকি বা মানসিক চাপে ভুগি, তখন আমাদের শরীর প্রচুর কর্টিসল তৈরি করে। এই হরমোন শরীরের অন্য সব জায়গা থেকে চর্বি সরিয়ে এনে সরাসরি পেটের কাছে জমা করতে নির্দেশ দেয়। তাই দুশ্চিন্তা করলে কিন্তু ভুঁড়ি বাড়ার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
তবে অনেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি জন্মগত। যদি রোগা হওয়ার পরেও ভুঁড়ি থাকে, তবে বুঝতে হবে পরিবারের বড়দেরও হয়তো একই রকম শারীরিক গঠন ছিল। বিজ্ঞান বলে, আমাদের ডিএনএতেই অনেক সময় লেখা থাকে শরীর চর্বি কোথায় জমিয়ে রাখবে। কারও ক্ষেত্রে সেটা পেটে হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে উরু বা হিপে।
শরীরের শক্তির ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য কেবল পুষ্টিকর খাবার খেলেই হবে না, সেই শক্তি খরচ করাও সমান জরুরি। আমাদের শরীর অনেকটা ইঞ্জিনের মতো। আমরা সারা দিনে খাবার থেকে যে পরিমাণ ক্যালরি বা শক্তি পাই, ব্যায়াম বা হাঁটাচলার মাধ্যমে সেই পরিমাণ শক্তি খরচ করতে হয়।
কিন্তু আমরা যদি অলস বসে থাকি বা শারীরিক পরিশ্রম একদম না করি, তবেই শরীরে চর্বি জমতে শুরু করে। আর একবার যখন ওজন অনেকটা বেড়ে যায়। তখন শরীর ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে নতুন করে ব্যায়াম শুরু করাও বেশ কঠিন ও ক্লান্তিকর মনে হয়।
আসল কথা খাবার থেকে যে পরিমাণ শক্তি পাই, তার চেয়ে যদি কম খরচ করি, তবে সেই বাড়তি ক্যালরিগুলো শরীর কখনোই ফেলে দেয় না। আমাদের শরীর ভবিষ্যৎ বিপদের কথা ভেবে সেই বাড়তি শক্তিকে চর্বি হিসেবে জমিয়ে রাখে। আর এই জমে থাকা চর্বিই শেষমেশ আমাদের ওজন বাড়িয়ে দেয় এবং পেটের কাছে এসেই জমা হয়।
সূত্র: হেলথ লাইন, মেডিকেল নিউজ টুডে