তবু তুমি বই পড়ো
শেষ কখন টানা আধঘণ্টা মোবাইল না ছুঁয়ে কোনো কাজ করেছি, এখন আর মনে নেই। কিছু করতে বসলে একটু পরপর ফোনটা হাতে নিই। একটু নোটিফিকেশন চেক করি। একটু রিলস দেখি। ঘেঁটে দেখলাম, এরও একটা নাম আছে। সেটা হলো ‘ডিজিটাল জম্বি’। এই জম্বি তৈরির উদ্যোক্তা আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি। এমন একটা জায়গা, যেখানে সায়েন্স ফিকশনের মতো কিছু প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা কোম্পানি বসে আছে। যেমন ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মাদার কোম্পানি মেটা। যারা আমাদের একটা ডিজিটাল জগতে বন্দী করে ফেলেছে।
তোমার হাতে যে স্মার্টফোনটি আছে, সেটির স্ক্রিনে তুমি যখন বুড়ো আঙুল দিয়ে নিচের দিকে টানো, মানে যখন স্ক্রল করো, সেটা দেখতে অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের ক্যাসিনোতে থাকা ‘স্লট মেশিন’ চালানোর মতো। স্ক্রল করার সময় আমরা জানি না, পরের ভিডিওটা কী আসবে। স্লট মেশিনে যেমন কয়েন ঢুকিয়ে আরও টাকা পাওয়া যাবে, এই আশায় বারবার কয়েন ফেলতে থাকে মানুষ। রিলসেও তেমনি। দেখি আরও কী আসে। দেখা শেষ হয় না। হয়তো একটা বিড়ালের নাচ আসবে। কিংবা আসবে কারও পিছলে পড়ার ভিডিও। কেউবা কোনো একটা পরামর্শ দেবে। মানে, তোমার অ্যালগরিদম অনুযায়ী কিছু একটা আসবেই। যেমন তুমি যদি খেলা পছন্দ করো, কোনো খেলার একটা দারুণ মুহূর্ত আসবে রিলসে। এই যে ‘পরেরটা কী’, এই রহস্য তোমার মস্তিষ্ককে দেয় ছোট ছোট ‘ডোপামিন শট’। মস্তিষ্কের জন্য পুরস্কার এই ডোপামিন। ডোপামিন পেলে মস্তিষ্ক একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। দিন শেষে মনে হয় অনেক কিছু দেখেছি। কিন্তু হিসাব করতে বসলে দেখবে, দিন শেষে তোমার দেখার ঝুলিটা আসলে শূন্য। কিছুই দেখা হয়নি। কোনোটাই মনে নেই।
রিলস তোমার মাথাকে ‘চিনি’ খাওয়াচ্ছে
পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলেন, রিফাইনড চিনি শরীরের জন্য বিষ। আর ডিজিটাল সাইকোলজিস্টরা বলেন, রিলস বা শর্ট ভিডিও হলো মস্তিষ্কের জন্য ‘ডিজিটাল সুগার’। খুব মিষ্টি, খুব সহজে পাওয়া যায়। চিনি যেমন শরীরকে স্থূল করে ফেলে, তেমনি চিন্তার শক্তিকে স্থূল করে ফেলে রিলস।
চিনি খেতে খুব ভালো লাগে। তেমনি ভালো লাগে রিলস দেখতে। কত রকম কত কিছু থাকে একেকটা রিলসে। তুমি যদি রিলসে আসক্ত হও, তবে এ থেকে সচেতনভাবে বের না হলে মুক্তি পাওয়া কঠিন। রিলস আসক্তি যদি মস্তিষ্কের জন্য চিনি হয়, বই পড়া হবে অনেকটা শাকসবজি বা পুষ্টিকর ডায়েটের মতো। শুরুতে তেতো লাগতে পারে। চিবাতে কষ্ট হতে পারে, কিন্তু এটা তোমার বুদ্ধিকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করবে। তুমি যখন রিলস দেখো, তখন তোমাকে ভাবতে হয় না। চোখে দেখছ, কানে শুনছ, কিন্তু তোমাকে আসলে কিছু করতে হচ্ছে না। তোমার হয়ে চিন্তার কাজটা করছে আরেকজন। কিন্তু যখন বই পড়বে, তখন তোমার নিজের মস্তিষ্ক পাখা মেলতে শুরু করবে।
নিজের সিনেমায় নিজেই হিরো
ধরো তুমি একটা সিনেমা দেখছ, যেখানে নায়ক হলো টম ক্রুজ। সিনেমায় তুমি দেখছ টম ক্রুজ কেমন করে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু তুমি যখন একটা ভালো থ্রিলার উপন্যাস পড়ো, তখন সেই হিরো দেখতে কেমন হবে, তার গলার স্বর কেমন হবে, ছুটে বেড়ানো সেই অন্ধকার গলিটার গন্ধ কেমন হবে, কল্পনায় তা ঠিক করো তুমি নিজে। ভিডিও আর টেক্সটের পার্থক্যটা বুঝতে পারলে? ভিডিওতে তোমাকে কিছু ভাবতে হয় না। কল্পনার সুযোগ নেই। মস্তিষ্কের কিছু করার নেই। কিন্তু পড়তে গেলে পুরো মাথাটা কাজ করে। কোনো বাজেট ছাড়া সুন্দর একটা মুভি তৈরি করে ফেলে তোমার মস্তিষ্ক। বই পড়লে তুমি নিজেই হবে নিজের সিনেমার ডিরেক্টর। রিলস দেখলে কেবল অন্যের ডিরেকশন দেখে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কথাসাহিত্য বা ফিকশন পড়ে, তাদের মধ্যে ‘থিওরি অব মাইন্ড’ বা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা অনেক বেশি। আজকাল চারপাশের মানুষ কিন্তু অনেক অসহিষ্ণু। চারপাশের অনেক কিছু ঘৃণা করি! কারণ, আমরা অন্যের গল্প শোনার বা পড়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছি। এমপ্যাথি বা সহমর্মিতা আমাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আমরা সেই সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলছি।
মনোযোগ কোথায় গেল
খেয়াল করে দেখেছ, আমরা এখন দুই মিনিটের বেশি একটা গানও ঠিক মন দিয়ে শুনতে পারি না। একটু পরেই মনে হয় ‘এরপর কী’? একে বলে ‘নেক্সট’ কালচার। আমাদের জীবনটাকে সত্যিকার অর্থে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে।
গবেষণা বলছে, যারা বই পড়ে, তাদের ফোকাস করার ক্ষমতা যারা পড়ে না তাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বই পড়া মানে হলো লম্বা সময় ধরে কোনো একটা বিষয়ের গভীরে ডুব দেওয়া। পড়াটা তোমার মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়, যেন তুমি বাস্তব জীবনেও যেকোনো জটিল সমস্যা অনেক শান্তভাবে সমাধান করতে পারো। যখন তোমার সব বন্ধুরা একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাবে, তখন বই পড়া মানুষ হিসেবে তুমি হবে সেই স্থির পাহাড়ের মতো। যে জানে কীভাবে স্থিরভাবে বসে থাকতে হবে। তোমার বন্ধুদের কথাই কেন বলছি। আমাজনের গহিন বনে কোনো পিছিয়ে পড়া ট্রাইবের খোঁজ করো, যারা শিকার করে জীবন ধারণ করে, তাদের কাছে এখন ইন্টারনেট আছে। তারাও রিলসে আসক্ত।
১৫ সেকেন্ডের আসক্তি যদি হয় রিলস, বই পড়া ঠিক এর উল্টো। বই পড়া হলো ‘ডিলেড গ্রেটিফিকেশন’ বা পরে পাওয়া তৃপ্তি। বই পড়তে হলে তোমাকে স্থির হয়ে বসতে হবে, অক্ষরের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিতে হয়। এই যে পরিশ্রম, এটাই তোমার ব্রেনের মাসল তৈরি করে। রিলস দেখা যদি হয় সোফায় বসে আলসেমি করে চিনি খাওয়া, বই পড়া হবে জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানো। চিনি সাময়িক শক্তি দেয়, শরীর গঠন করে জিম।
হাজার বছরের পুরোনো ‘চিট-কোড’
গেম খেলার সময় আমরা যেমন ‘চিট-কোড’ খুঁজি, যেন দ্রুত লেভেল পার করা যায়, বই পড়া হলো জীবনের ঠিক সে রকম চিট-কোড। ধরো, কোনো একটা কাজে তুমি ব্যর্থ হয়েছ, চেয়েছিলে কিছু একটা করতে। কিন্তু সফল হওনি, সেটা নিয়ে খুব চাপেও আছ। কিন্তু ভেবে দেখো, তোমার এই সমস্যাটা কিন্তু পৃথিবীতে প্রথম নয়। আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস বা হাজার বছর আগে জালালউদ্দিন রুমি ঠিক একই রকম যন্ত্রণা, একই রকম ঝামেলার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁরা লিখে গেছেন, কীভাবে তাঁরা সেই পরিস্থিতি সামলেছেন। রিলসে কিন্তু হাজার বছরের জ্ঞানটা নেই। আছে শুধু রিলসে কয়েক সেকেন্ড তোমাকে আটকে রাখা। যার চ্যানেল, তার ভিউ কত হলো, ভিউ দিয়ে আয় করতে পারা তার লক্ষ্য। তুমি শুধু তার পণ্য। সে তোমাকে একরকম ‘বিক্রি’ করে দিচ্ছে। তুমি কি সারা জীবন নিজের ভুল থেকে ঠেকে ঠেকে শিখবে নাকি মানুষের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের জীবন বদলে দেবে? তোমার কিন্তু বেছে নেওয়ার সুযোগটা আছে।
রিলস স্মার্ট দেখাবে, বই স্মার্ট বানাবে
সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমি অনেক স্মার্ট হয়ে উঠতে পারবে যদি তুমি স্মার্ট রিলস শেয়ার করতে পারো। ট্রেন্ডি কিছু শেয়ার করলে বন্ধুদের রিঅ্যাকশন পাবে। ফলোয়ার পাবে। আড্ডায় বলতে পারবে, ‘তুই এই রিলসটা দেখেছিস? সো ফানি।’ তর্কে বা আড্ডায় বেশ হাসাহাসি করতে পারবে। কিন্তু এ বিষয়টা তাৎক্ষণিক। এই আলোচনার মধ্যে কোনো বিশ্লেষণ নেই। ব্যাখ্যা করার বিষয় নেই। পানির মতো স্বচ্ছ একটা বিষয়। যে রিলসের কথা তুমি বন্ধুকে বলছ বা কারও সঙ্গে রিলস শেয়ার করছ, সে সম্ভবত আগেই রিলসটা দেখেছে। কারণ, সিলিকন ভ্যালির উদ্যোক্তারা, ইঞ্জিনিয়াররা এ বিষয়টি ভেবেছেন। একই চিন্তার মানুষ, একই গ্রুপের মানুষের সামনে অ্যালগরিদম একই রিলস নিয়ে আসে। তোমার বন্ধু হয়তো রিলসটা দেখেছে, তবু তোমার মেসেজে হাহা দিচ্ছে বা লাভ দিচ্ছে, কিন্তু বিষয়টা কী হলো? তোমাকে সে শুধু আপসেট করতে চাচ্ছে না। ভেবে দেখো, ক্ষণিকের ডোপামিন কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তোমাকে। বন্ধু রিলসে রিঅ্যাকশন না দিলে আমরা আপসেট হচ্ছি।
এই পরিস্থিতিতে তোমার সমাধান রিলস থেকে আসবে না। বই পড়ে বিষয়টা বদলে ফেলা যাবে। বই তোমার বিশ্লেষণের ক্ষমতা গড়ে দেবে। তোমার মুখে ভাষা জোগাবে। ভাবনার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আনবে। সবাই যখন সস্তা ট্রেন্ড নিয়ে দৌড়াচ্ছে, তখন তোমাকে আলাদা করার উপায় হচ্ছে বই। আড্ডার সবচেয়ে দামি মানুষ হয়ে উঠবে শুধু পড়লে।
ফোনটা নামিয়ে রাখো
আমাদের জীবনটা তো একটা রিলস নয় যে ১৫ সেকেন্ডেই শেষ হয়ে যাবে। জীবন একটা মহাকাব্যিক উপন্যাসের মতো হওয়া উচিত। ফোনটা এখন পাশে নামিয়ে রাখো। তোমার আশপাশে নিশ্চয়ই কোনো একটা বই পড়ে আছে, যেটা পড়বে বলে অনেক দিন আগে কেনা হয়েছিল। এখন ধুলা জমে আছে এ বইয়ের প্রচ্ছদে। সে বইটাই খুলে বসো। শুরুতে বিরক্তিকর লাগতে পারে। কারণ, এরই মধ্যে আমাদের মস্তিষ্ক একটা ফাঁদে পড়ে আছে। এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার উপায় বইকে সঙ্গী বানানো। একটা প্যারা পড়ো, চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো। কী পড়লে, কী হলো?
এক মাস পর পরিস্থিতি এমন থাকবে না। রিলস দেখার অভ্যাসের মতো বই পড়ার অভ্যাসও করা সম্ভব। শুধু একটু পরিশ্রম করতে হবে। একটু মনোযোগ দিতে হবে। মস্তিষ্ক বদলাতে শুরু করবে বই পড়া শুরু করলে। মনোযোগের সময় বাড়বে। দুশ্চিন্তা কমবে। বুঝতে পারবে, কেন হাজারো রিলসের চেয়ে বইয়ের কাগজের ওপরে ছাপা কালো অক্ষরগুলো বেশি উজ্জ্বল।
জানি সস্তা ডোপামিন তোমাকে বেশ আনন্দে রেখেছে, কিন্তু ক্ষতির কথাটা উপেক্ষা করার মতো নয়। রিলস একদম ছাড়তে পারবে না হয়তো, কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?