পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া কিছু ভাষা
‘ভাষা হারিয়ে ফেলেছি’—কথাটা প্রায়ই আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে বলি। সত্যি সত্যি কি কোনো ভাষা হারিয়ে যেতে পারে? ভাষা তো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক। একটি ভাষা যদি হারিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতিও। পৃথিবীর এমন কিছু ভাষা আছে, যা নানা কারণে হারিয়ে গিয়েছে। তেমন কিছু ভাষার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আর বর্তমান অবস্থা নিয়েই এই লেখা।
১. কোরনিশ (Cornish)
এটি ব্রিটেনের কর্নওয়াল অঞ্চলের কেল্টিক ভাষা। রোমানরা যখন ব্রিটেন জয় করে, তখন এই অঞ্চলের মানুষ শুধু এই ভাষাতেই কথা বলত। ১৭৭৭ সালে ডলি পেনট্রেথ (Dolly Pentreath) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যুর পর ভাষাটি বিলুপ্ত হিসেবে ধরা হয়েছিল। তবে কোরনিশ ভাষা এখন আর বিলুপ্ত নয়। বিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় ভাষাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। ২০১০ সালে ইউনেসকো একে ‘বিলুপ্ত’ তালিকা থেকে সরিয়ে ‘সংকটাপন্ন’ তালিকায় এনেছে। এখন কর্নওয়ালের অনেক স্কুলে এটি পড়ানো হয়।
২. মানক্স (Manx)
গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের মাঝখানে অবস্থিত ‘আইল অব ম্যান’-এর স্থানীয় ভাষা এটি। ১৯৭৪ সালে নেড ম্যাড্রেলের মৃত্যুর পর ভাষাটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। নেড ছিলেন এই ভাষার শেষ বাহক। তবে মানক্স ভাষাকেও সফলভাবে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে দ্বীপটির অনেক শিশু মানক্স ভাষায় কথা বলতে পারে। মানক্স ভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে আইল অব ম্যান দ্বীপে।
৩. ইয়ানা (Yana)
উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ইয়াহি’ আদিবাসীদের ভাষা ইয়ানা। ১৯১৬ সালে এই ভাষার শেষ বক্তা ‘ইশি’ (Ishi) মারা যান। ইশি কেবল ভাষাটির শেষ বক্তাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর পুরো গোত্রের শেষ প্রতিনিধি। ১৯১১ সালে ইশি প্রথম লোকালয়ে আসেন। তখন নৃতাত্ত্বিকেরা তাঁর নাম জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের নাম বলতে অস্বীকার করে ইশি নামটি ব্যবহার করেছিলেন। ইয়ানা ভাষায় ‘ইশি’ শব্দের অর্থ ‘মানুষ’। ইয়াহিদের সংস্কৃতিতে নিজের আসল নাম বলা নিষেধ ছিল, তাই তিনি এই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। ইয়ানা ভাষা বর্তমানে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। তবে ভাষাবিদ এডওয়ার্ড সাপির এই ভাষার প্রচুর ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার নথিভুক্ত করে গেছেন।
৪. ওয়ারানঙ্গু (Warrungu)
উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের একটি আদিবাসী ভাষা ওয়ারানঙ্গু। ১৯৮১ সালে উলফ পালমারের মৃত্যুর পর এটি বিলুপ্ত হয়। এই ভাষার ব্যাকরণ ও গঠন পৃথিবীর অন্য যেকোনো ভাষা থেকে বেশ আলাদা। বর্তমানে জাপানি ও অস্ট্রেলীয় ভাষাবিদদের সহায়তায় এ ভাষাটির কিছু অংশ সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে।
৫. ডালমাটিয়ান (Dalmatian)
ডালমাটিয়ান ভাষাটি বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার ডালমাটিয়া অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। ১৮৯৮ সালে টুওনে উদাইনা নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর মাধ্যমে এটি বিলুপ্ত হয়। উদাইনা এক খনি বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন। ইতালীয় ভাষাবিদ মাত্তেও বার্তোলি মৃত্যুর আগে উদাইনার কাছ থেকে প্রায় ২,৮০০ শব্দ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এই ভাষাটিকে বিলুপ্ত বা মৃত ভাষা হিসেবে ধরা হয়।
৬. গাগুরজু (Gaagudju)
উত্তর অস্ট্রেলিয়ার কাকাডু ন্যাশনাল পার্ক সংলগ্ন এলাকায় গাগুরজু ভাষা প্রচলিত ছিল। ২০০২ সালে বিগ বিল নেইডিজির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভাষাটি হারিয়ে যায়। বিল তাঁর পূর্বপুরুষদের নিষেধ ভেঙে গবেষকদের কাছে নিজের ভাষার রহস্য উন্মোচন করেছিলেন, যেন পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে। যদিও ভাষাটি বিলুপ্ত, তবে এর ওপর ভিত্তি করে কিছু নৃতাত্ত্বিক গবেষণা সংরক্ষিত আছে।
৭. বিউথুক (Beothuk)
কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের আদিবাসীদের ভাষা বিউথুক। ১৮২৯ সালে ‘শানাডিডিট’ নামের এক নারীর মৃত্যুর পর এই ভাষাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইউরোপীয়দের আনা রোগ (যক্ষ্মা) এবং সংঘাতের কারণে তাদের পুরো জাতিটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। শানাডিডিট দারুণ ছবি আঁকতেন, যা থেকে তাঁদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানা যায়।
৮. শুয়াদিত (Shuadit)
শুয়াদিত দক্ষিণ ফ্রান্সের ইহুদিদের একটি ভাষা। ১৯৭৭ সালে বিখ্যাত লেখক আরমান্ড লুনেলের মৃত্যুর মাধ্যমে এ ভাষাটি হারিয়ে যায়। এটি মূলত হিব্রু ও পুরোনো ফরাসি ভাষার মিশ্রণ ছিল। বর্তমানে এটি একটি মৃত ভাষা হিসেবে গণ্য।
৯. দুরা (Dura)
নেপালের পশ্চিম অঞ্চলের ‘দুরা’ সম্প্রদায়ের ভাষা দুরা। ২০০৮ সালে সোমা দেবী দুরা নামক ৮২ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যুর পর ভাষাটি হারিয়ে যায়। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো আর কেউ বেঁচে নেই। নেপালে বর্তমানে ‘দুরা’ জাতিগোষ্ঠী থাকলেও তারা এখন নেপালি ভাষায় কথা বলে। তাদের আদি ভাষাটি বিলুপ্ত।