খাবারের ছত্রাক পড়া অংশ ফেলে বাকিটা খাওয়া কি নিরাপদ
ফ্রিজে বেশ কিছুদিন পাউরুটি রেখে দিলে দেখবে ওটার ওপর সাদা রঙের ছোপ পড়ে গেছে। তখন অনেকে দ্বিধায় পড়ে যে এই খাবার খাওয়া ঠিক হবে, নাকি ফেলে দেওয়া উচিত। শুধু যুক্তরাজ্যেই প্রতিবছর সাধারণ পরিবারগুলো এভাবে প্রায় ৬৬ লাখ টন খাবার নষ্ট করে ফেলে দেয়। তাই খাবারের অপচয় কমাতে ও নিজেদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে একটা জিনিস ভালোভাবে জানা দরকার। ছত্রাক বা ফাঙ্গাস পড়া খাবারের এসব ক্ষতিকর অংশ কেটে ফেললে কী খাওয়া যায়। আর কোন খাবারগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া উচিত।
খাবারের ছত্রাক আসলে কী
খাবারের ছত্রাক বা ফাঙ্গাস হলো আসলে একধরনের আণুবীক্ষণিক বা অতি ক্ষুদ্র জীব, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো ‘মাইসেলিয়াম’ নামের সুতার মতো একধরনের জালিকা তৈরি করে বড় হয়। এই সুতাগুলো গাছের শিকড়ের মতো খাবারের একদম ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আর এই ছত্রাকের রেণু বা স্পোরগুলো যখন খাবারের ওপর বেরিয়ে আসে, তখনই খাবারের রং বদলে যায়। আর তখন ওপরটা দেখতে সাদা, সবুজ কিংবা কালচে রঙের তুলার মতো অংশ দেখা যায়।
সব ছত্রাকই কি বিপজ্জনক
আমাদের পছন্দের বেশ কিছু খাবার কিন্তু নিরাপদ ছত্রাক ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়। আমরা যে নরম ও তুলতুলে পাউরুটি খাই, তা তৈরি করতে ‘ইস্ট’ নামের একধরনের উপকারী ছত্রাক ব্যবহার করা হয়। এই ছত্রাক ময়দার ভেতরের শর্করা ভেঙে কার্বন ডাই–অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে, যার কারণে পাউরুটি ফুলে ওঠে ও ভেতরে সুন্দর ছোট ছোট বাতাস ভরা অংশ তৈরি হয়। আবার ‘পেনিসিলিয়াম রোকফোর্টি’ নামের ছত্রাকের কারণে ব্লু চিজের গায়ে নীল রঙের ছোপ ও তীব্র স্বাদ তৈরি হয়।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে খাবারে যেকোনো ধরনের ছত্রাক পড়লেই তা চোখ বন্ধ করে খেয়ে ফেলা যাবে। একেক ছত্রাক মানুষের শরীরে একেক রকম প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যাদের ছত্রাকজনিত অ্যালার্জি আছে, তাদের কিন্তু এ বিষয়ে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
যুক্তরাজ্যের ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি (এফএসএ) ছত্রাক পড়া যেকোনো খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের জন্য এই খাবারগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি।
ছত্রাক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্যাট্রিক হিকি জানান, কিছু কিছু খাবার ছত্রাক পড়ার পরও খাওয়া যেতে পারে। তবে তা করতে হবে সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে। ছত্রাক সাধারণত হঠাৎ তীব্র ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটায় না। তবে কিছু কিছু ছত্রাক ‘মাইকোটক্সিন’ নামের মারাত্মক বিষাক্ত উপাদান তৈরি করে। এই উপাদান যদি শরীরে বেশি পরিমাণে প্রবেশ করে, তবে তা পরিপাকতন্ত্রের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এমনকি এর ফলে লিভার ও কিডনি বিকল হওয়া বা মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটতে পারে।
স্যাঁতসেঁতে শস্যদানা কিংবা বাদামে ‘অ্যাসপারজিলাস’ নামের একধরনের ছত্রাক জন্মায়। এই ছত্রাক থেকে ‘অ্যাফ্লাটক্সিন’ নামের বিষ তৈরি হয়, যা লিভার ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ।
ছত্রাকের কারণে মানুষের হঠাৎ তীব্র বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিং হওয়ার ঘটনা কম ঘটে। তবে অল্প পরিমাণে ছত্রাকের বিষ দীর্ঘদিন ধরে শরীরে ঢুকলে কী ক্ষতি হতে পারে? তা নিয়ে এখনো খুব বেশি গবেষণা হয়নি। তবে একটা ভয় কিন্তু থেকেই যায়। বারবার এই ক্ষতিকর বিষ বা মাইকোটক্সিন শরীরে জমতে থাকলে তা একসময় বড় কোনো রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ছত্রাক পড়া রুটি কি খাওয়া যায়
ছত্রাক পড়া পাউরুটি একদমই খাওয়া উচিত নয়। পাউরুটি নরম ও ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় ছত্রাক সহজেই ওপর থেকে একদম গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে রুটি যদি শুধু বাসি বা শক্ত হয় ছত্রাক না পড়ে, তবে তা ফেলে না দিয়ে ব্রেডক্রাম্ব বা ক্রাউটন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফল ও সবজি থেকে কি ছত্রাক কেটে ফেলা যায়
গাজর বা বাঁধাকপির মতো শক্ত সবজিতে পানি কম থাকায় ছত্রাক গভীরে যেতে পারে না। তাই ছত্রাক ধরা অংশের চারপাশ থেকে অন্তত ১ সেন্টিমিটার কেটে ফেলে বাকিটা খাওয়া যায়। তবে আপেলে ‘প্যাটুলিন’ নামের বিষ তৈরি হয় বলে ছত্রাক পড়া আপেলের জুস খাওয়া যাবে না। অন্যদিকে শসা বা টমেটোর মতো নরম ফল ও সবজিতে পানি বেশি থাকায় ছত্রাক ধরলে তা সরাসরি ফেলে দিতে হবে।
ছত্রাকযুক্ত জ্যাম ও আচার কি নিরাপদ
জ্যাম বা আচারের ওপর জমে থাকা ছত্রাক ফেলে দিলেও ভেতরের অদৃশ্য বিষাক্ত উপাদান পুরোপুরি দূর হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে ওপরে যদি একদম সামান্য ছত্রাক দেখা যায়, তবে ওপরের স্তর এবং তার কয়েক সেন্টিমিটার নিচ পর্যন্ত জ্যাম বা আচার চামচ দিয়ে তুলে ফেলে দিয়ে বাকি অংশটুকু দ্রুত খেয়ে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু জ্যাম ও আচারের বয়ামে যদি ছত্রাকের মোটা স্তর জমে যায়, তবে কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে সেটি সরাসরি ফেলে দেওয়াই ভালো।