মানুষের কারণে বিলুপ্ত হয়েছে যেসব প্রাণী
মরিশাসের এক নির্জন জঙ্গল। বাতাসে শুকনা পাতার মর্মর শব্দ ভেসে আসছে। শান্ত জঙ্গলে খাবারের খোঁজ করছে একটি ডোডো পাখি। হঠাৎ আশপাশে যেন কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল। তবু ডোডো পাখিটি ভয় পেল না। শিকারিদের উপস্থিতি ডোডোদের চেনা পৃথিবীতে ছিল না বললেই চলে। তাই এসব পাখির সহজাত প্রবৃত্তিতে ভয় পাওয়া কিংবা পালানোর প্রবণতাও ছিল না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল পরিস্থিতি, যখন একদল ইউরোপীয় নাবিক সেই জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। ডোডো পাখিটিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ওদের একজন খেলাচ্ছলে গুলি করল। বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই ছোটখাটো, থলথলে শরীর নিয়ে ডোডো পাখিটি পড়ে গেল মাটিতে। পাখিটি হয়তো বুঝতেই পারল না, কী ঘটে গেল!
এভাবেই ইউরোপীয় নাবিকদের হাতে নির্বিচারে শিকার হতে থাকে শতাব্দীর সাক্ষী, নিরীহ ডোডো পাখিরা। দুঃখের বিষয় হলো, এসব পাখিকে খাবারের জন্য শিকার করা হতো না। নিছক খেলার ছলে হত্যা করে তাদের দেহ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ১৫৯৮ সালে মানুষ প্রথম আবিষ্কার করে এই পাখিদের, আর তারপরই শুরু হয় নির্মম শিকারের খেলা। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে ১৬৬২ সালের মধ্যেই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় ডোডো পাখি। তবে মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীদের তালিকায় ডোডো পাখিরাই প্রথম বা শেষ নয়। এখানেই হয়তো তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—ডোডো পাখিদের মতো আর কোন কোন প্রাণী মানুষের এমন বর্বরতার শিকার হয়েছে?
দ্য গ্রেট অউক, যে পাখিকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এনে মানুষের টনক নড়েছিল
তোমরা অনেকেই হয়তো পেঙ্গুইনের ছবি দেখেছ। একসময় পেঙ্গুইনের মতো দেখতে একধরনের পাখি দেখা যেত আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপগুলোতে। দ্য গ্রেট অউক নামে পরিচিত এই পাখিরা দেখতে পেঙ্গুইনের মতো হলেও ওদের কোনো আত্মীয় নয়। মানে, দ্য গ্রেট অউক সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির একটি পাখি ছিল। এরা বড়সড় আকৃতির হতো এবং উড়তেও পারত না। দ্য গ্রেট অউক নিজের বেশির ভাগ সময় কাটাত সমুদ্রে সাঁতার কেটে। একসময় মানুষের কাছে এই পাখিদের মূল্য বেড়ে যায়। কারণ, এদের নরম পালক দিয়ে ভালো বিছানার তোষক আর বালিশ বানানো যেত। সেই সঙ্গে দ্য গ্রেট অউকের মাংসও খাওয়া হতো। এর ফলে মানুষ অতিমাত্রায় এসব পাখি শিকার করা শুরু করে। ১৮০০ শতাব্দীর মধ্যে দ্য গ্রেট অউকের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়। তখন বিভিন্ন জাদুঘরের সংগ্রাহকেরা এসব পাখির নমুনা সংগ্রহে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, দ্য গ্রেট অউক আর বেশিদিন পৃথিবীতে টিকবে না। এরপর তাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। ৭০ বছর বাণিজ্যিকভাবে শোষিত হওয়ার পর দ্য গ্রেট অউক পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।
দ্য তাসমেনিয়ান টাইগার, যে ‘বাঘ’ মানুষের আক্রমণে মারা পড়ত
অস্ট্রেলিয়ার তাসমেনিয়া দ্বীপে একসময় বাস করত তাসমেনিয়ান টাইগার। যদিও প্রাণীটির নামের শেষে ‘টাইগার’ ছিল, কিন্তু এটি আসলে বাঘ ছিল না। এটি ছিল একটি মাংসাশী প্রাণী, যা দেখতে কিছুটা শিয়ালের মতো। তবে তাসমেনিয়ান টাইগার মানুষের ওপর আক্রমণ করত না। ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী যখন তাসমেনিয়ায় বসতি স্থাপন শুরু করে, তখন তারা নিজেদের গবাদিপশুদের নিরাপত্তার অজুহাতে তাসমেনিয়ান টাইগারদের হত্যা করতে শুরু করে। তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ান সরকার এই প্রাণী হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করলে লোকজন আরও উৎসাহী হয়ে ওঠে। ১৯৩৬ সালের মধ্যে শেষ তাসমেনিয়ান টাইগার বন্দী অবস্থায় মারা যায়। এখনো ইউটিউবে শেষ বন্দী তাসমেনিয়ান টাইগারের ভিডিও চিত্র দেখা যায়, যেখানে একটি একাকী প্রাণী পায়চারি করছে। নিজের প্রজাতির এই শেষ সদস্যটি একদিন রাতের ঠান্ডায় মারা যায়। এভাবেই মানুষের অযথা ভয় একটি প্রজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
স্টেলারস সি কাউ, যে প্রাণীর বিলুপ্তি এক করুণ রেকর্ড গড়েছে
১৭৪১ সালে একদল রুশ নাবিকের চোখে পড়ে একটি বিশালদেহী সামুদ্রিক প্রাণী—স্টেলারস সি কাউ। দেখতে কিছুটা সিল মাছের মতো হলেও এটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রজাতি। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের বরফঠান্ডা পানিতে বসবাস করা এই প্রাণীরা ধীরস্থির প্রকৃতির তৃণভোজী ছিল। তবে স্টেলারস সি কাউদের মোটা চামড়া ও সুস্বাদু মাংস পাওয়ার আশায় মানুষ এদের শিকার করা শুরু করে। স্টেলারস সি কাউদের আত্মরক্ষার সামর্থ্য খুব কম ছিল। কারণ, সমুদ্রের তলদেশে পাওয়া উদ্ভিদ খেয়ে বেঁচে থাকত এসব প্রাণী। এদের কোনো স্বাভাবিক শিকারি ছিল না। কিন্তু এরা দ্রুতই মানুষের জন্য সহজ শিকার হয়ে ওঠে। মানুষের হাতে আবিষ্কারের মাত্র ২৭ বছরের মধ্যেই পুরোপুরি হারিয়ে যায় স্টেলারস সি কাউ, যা সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে হওয়া বিলুপ্তির করুণ রেকর্ড গড়েছে।
শেষ কথা
মরিশাসের বনে এখন আর ডোডো পাখিরা অবাধে বিচরণ করে না। তাসমেনিয়ার বনে পড়ে না তাসমেনিয়ান টাইগারের ছায়া। দ্য গ্রেট অউক আর আটলান্টিকের পানিতে সাঁতার কাটে না। প্রশান্ত মহাসাগরে আর স্টেলারস সি কাউদের মতো ‘জেন্টল জায়ান্ট’-এর দেখা মেলে না। অনেকেই এই প্রাণীদের বিলুপ্তিকে ভবিতব্য বলে ধরে নেয়। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, মানুষের লোভ আর নিষ্ঠুরতাই অনেক বিস্ময়কর প্রাণীদের পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছে।
অতীত বদলানো সম্ভব নয়। তবে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে আমাদের। এখনো বহু প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গায় একটি বিপন্ন প্রজাতির মেছো বিড়ালকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর না করে গ্রামের কেউ কেউ বাহাদুরি দেখিয়ে নিরীহ প্রাণীটিকে মেরে ফেলে। তবে আশার কথা হলো, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পরে প্রাণীটির হত্যাকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাই বন এবং বন্য প্রাণী রক্ষায় আমাদের আরও সচেতন হতে হবে।