বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল ১৩টি ট্রেন
ট্রেনে চড়লেই কি শুধু জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে গন্তব্যে পৌঁছানো? মোটেও না! পৃথিবীর কিছু ট্রেনে ভ্রমণ করাটাই হয়ে উঠতে পারে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। আরামদায়ক কেবিন, রাজকীয় খাবার আর চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য, কখনো কখনো মনে হবে, ট্রেনে নয়, যেন বিলাসবহুল কোনো হোটেলে আছ। চলো, ঘুরে আসি বিশ্বের ১৩টি বিলাসবহুল ট্রেনের গল্পে।
১. ব্লু ট্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকা
১৯২৩ সালে যাত্রা শুরু করে ব্লু ট্রেন। একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সদস্যরাও এই ট্রেনে ভ্রমণ করতেন।
নামের মতোই ট্রেনটির বাইরের অংশ নীল। ভেতরে রয়েছে আরামদায়ক কেবিন, কাঠের কারুকাজ, ঝাড়বাতি ও বিলাসবহুল আসবাব। যাত্রীদের সেবায় থাকেন ব্যক্তিগত বাটলার। সঙ্গে পাওয়া যায় নানা সুস্বাদু খাবার। যাত্রাপথে জানালা দিয়ে দেখা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর, আঙুরের বাগান আর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য।
২. ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, ইউরোপ
ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৮৩ সালে প্যারিস থেকে প্রথম যাত্রা শুরু করে এই ট্রেন। এর ঐতিহাসিক রুটে ইউরোপের বিভিন্ন শহর পেরিয়ে পৌঁছানো যেত তৎকালীন কনস্টান্টিনোপলে, যার বর্তমান নাম ইস্তাম্বুল।
১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস হয়ে ওঠে বিলাসিতার প্রতীক। রাজা-রানি থেকে শুরু করে ধনী ও বিখ্যাত অনেক মানুষ এই ট্রেনে ভ্রমণ করতেন। সুন্দর সাজসজ্জা, সুস্বাদু খাবার আর উন্নত সেবার জন্যও ট্রেনটি ছিল বিখ্যাত।
ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের ঐতিহ্য এখনো নানা বিলাসবহুল রেলভ্রমণে বেঁচে আছে। এর মধ্যে ভেনিস সিম্পলন-ওরিয়েন্ট-এক্সপ্রেস অন্যতম। ঐতিহাসিক বগি, মার্জিত সাজসজ্জা আর বিশেষ খাবারের অভিজ্ঞতা এই যাত্রাকে করে তোলে স্মরণীয়। তবে ঐতিহাসিক ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের পুরোনো প্যারিস-ইস্তাম্বুল রুট নিয়মিত চলাচলকারী একই ট্রেনের বর্তমান রুট নয়।
৩. গোল্ডেন ইগল ড্যানিউব এক্সপ্রেস, ইউরোপ
এক ট্রেনে চড়ে ইউরোপের একাধিক দেশ ঘুরে দেখতে চাইলে গোল্ডেন ইগল ড্যানিউব এক্সপ্রেস হতে পারে দারুণ একটি পছন্দ। এই বিলাসবহুল ট্রেনের বিভিন্ন ভ্রমণসূচিতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের নানা দেশ ঘুরে দেখার সুযোগ থাকে।
পথে ঐতিহাসিক শহর, প্রাচীন দুর্গ, রাজপ্রাসাদ আর মনোরম গ্রামাঞ্চল দেখা যায়। কোথাও স্থাপত্যের বিস্ময়, কোথাও স্থানীয় খাবারের স্বাদ—সব মিলিয়ে ট্রেনভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানার এক দারুণ সুযোগ। তবে কোন কোন শহর দেখা যাবে, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ভ্রমণসূচির ওপর।
৪. দ্য রকি মাউন্টেনিয়ার, কানাডা
রকি মাউন্টেনিয়ার শুধু আরাম করে ভ্রমণের জন্য নয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্যও বেশ জনপ্রিয়। ট্রেনটির বিশেষ আকর্ষণ বড় জানালাওয়ালা বগি। কিছু বগিতে কাচের তৈরি উঁচু ছাদও রয়েছে। ফলে ট্রেনের ভেতরে বসেই চারপাশের দৃশ্য ভালোভাবে দেখা যায়।
কানাডার পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলার সময় দেখা মেলে রকি পর্বতমালা, নদী, বন আর গভীর উপত্যকার। ভাগ্য ভালো হলে জানালার বাইরে ভাল্লুক, এল্ক কিংবা ইগলের দেখাও মিলতে পারে। দিনের আলোয় প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্যই এই ট্রেনের যাত্রাসূচি বিশেষভাবে সাজানো হয়।
৫. রয়্যাল কানাডিয়ান প্যাসিফিক, কানাডা
কানাডার আরেকটি বিলাসবহুল রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতা হলো রয়েল কানাডিয়ান প্যাসিফিক। ঐতিহাসিক বগি ও ব্যক্তিগত সেবার জন্য পরিচিত এই ট্রেনটি কানাডিয়ান রকিজ অঞ্চলের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ দেয়। জানালার বাইরে দেখা যায় তুষারঢাকা পাহাড়, সবুজ বন আর স্বচ্ছ হ্রদ। কখনো কখনো বন্য প্রাণীরও দেখা মেলে। তবে এটি নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো প্রতিদিন নির্দিষ্ট রুটে চলে না; বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে এর ভ্রমণ অনুষ্ঠিত হয়।
৬. রোভোস রেল, দক্ষিণ আফ্রিকা
রোভোস রেলকে চাইলে চাকার ওপর একটি বিলাসবহুল হোটেলও বলা যায়। যাত্রীদের পছন্দ অনুযায়ী এই ট্রেনের রয়েছে বিভিন্ন রুট। ঐতিহ্যবাহী বগি, আরামদায়ক কেবিন, সুন্দর খাবারঘর আর ব্যক্তিগত সেবার ব্যবস্থা যাত্রাকে করে তোলে বিশেষ।
কেপ টাউন থেকে প্রিটোরিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়িয়ে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের দিকে যাত্রা। প্রতিটি পথেই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। কোথাও পাহাড় ও সবুজ প্রকৃতি, কোথাও বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, আবার কোথাও বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত জলপ্রপাত। ট্রেনের জানালা দিয়ে আফ্রিকার প্রকৃতি দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যাবে, বুঝতেই পারবে না।
৭. ক্যালিফোর্নিয়া জেফির, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রেলভ্রমণের সুযোগ দেয় ক্যালিফোর্নিয়া জেফির। ট্রেনটি শিকাগো থেকে যাত্রা শুরু করে ডেনভার ও সল্ট লেক সিটির মতো শহর পেরিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এমেরিভিলে পৌঁছায়। এমেরিভিল সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার কাছাকাছি একটি শহর।
পথে দেখা যায় পাহাড়, নদী, হ্রদ, বন আর মরুভূমি। বিশেষ করে কলোরাডোর রকি পর্বতমালা ও সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার দৃশ্য মন কেড়ে নেয়। আবার কোথাও চোখে পড়ে নেভাদার শুষ্ক প্রান্তর। জানালার পাশে বসে এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, যেন কোনো সিনেমার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছ।
ক্যালিফোর্নিয়া জেফির মূলত দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে রকি মাউন্টেনিয়ারের মতো বিশেষ পর্যটকসেবার সব আয়োজন না থাকলেও দীর্ঘ পথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার দারুণ সুযোগ রয়েছে।
৮. গ্লেসিয়ার এক্সপ্রেস, সুইজারল্যান্ড
সুইস আল্পসের মধ্য দিয়ে ছুটে চলে গ্লেসিয়ার এক্সপ্রেস। জেরমাট থেকে সেন্ট মরিৎজ পর্যন্ত প্রায় আট ঘণ্টার এই যাত্রায় ট্রেনটি অসংখ্য সুড়ঙ্গ ও সেতু পার হয়। পথের অন্যতম আকর্ষণ ল্যান্ডওয়াসার ভায়াডাক্ট। পাহাড়ের গায়ে তৈরি একটি বিখ্যাত রেলসেতু।
ট্রেনের বড় জানালা দিয়ে দেখা যায় বরফঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, ছোট ছোট গ্রাম আর পাহাড়ি নদী। যাত্রাপথে সুইজারল্যান্ডের নানা খাবারও উপভোগ করা যায়। পনির ফন্ডু, রোস্টি কিংবা সুইস চকলেট—সব মিলিয়ে এই ভ্রমণে চোখ ও পেট দুটোই খুশি হওয়ার সুযোগ আছে।
৯. প্যালেস অন হুইলস, ভারত
নাম শুনেই বোঝা যায়, এ যেন চাকার ওপর একটি প্রাসাদ! ভারতের রাজস্থানের রাজপরিবারগুলোর ঐতিহাসিক রেলবগি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সাজানো হয়েছে প্যালেস অন হুইলস। এই বিলাসবহুল ট্রেনের যাত্রা শুরু হয় দিল্লি থেকে। এরপর রাজস্থানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক শহর ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
জয়পুর, উদয়পুর, যোধপুর ও জয়সালমিরের মতো শহরে রয়েছে রাজপ্রাসাদ, দুর্গ, মরুভূমি আর ঐতিহাসিক স্থাপনা। ট্রেনের বগিগুলোও সুন্দর নকশা ও কারুকাজে সাজানো। রয়েছে বিলাসবহুল কেবিন এবং ‘মহারাজা’ ও ‘মহারানি’ নামে দুটি রেস্তোরাঁ। রাজকীয় পরিবেশে ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানার জন্য এই ট্রেনের ভ্রমণ বেশ আকর্ষণীয়।
১০. রয়্যাল স্কটসম্যান, স্কটল্যান্ড
স্কটল্যান্ডের পাহাড়, দুর্গ, হ্রদ আর ছোট ছোট সুন্দর গ্রামের মধ্য দিয়ে চলে রয়্যাল স্কটসম্যান। এই বিলাসবহুল ট্রেনে সাধারণত কয়েক রাতের ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকে। তাই নিজের সময় ও পছন্দ অনুযায়ী ভ্রমণসূচি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
যাত্রার সময় জানালার বাইরে দেখা যায় স্কটিশ হাইল্যান্ডসের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, সবুজ পাহাড় আর নির্জন জলাশয়। গ্লেনফিনান ভায়াডাক্টও এ অঞ্চলের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। হ্যারি পটার সিনেমায় এই রেলসেতু দেখা যাওয়ায় জায়গাটি অনেকের কাছেই পরিচিত। তবে রয়্যাল স্কটসম্যানের প্রতিটি ভ্রমণসূচিতে সেখানে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
১১. শঙ্গোলোলো এক্সপ্রেস, আফ্রিকা
শঙ্গোলোলো এক্সপ্রেসও একসময় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য পরিচিত বিলাসবহুল পর্যটক ট্রেন ছিল। ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই ট্রেনে আরামদায়ক কেবিনে থাকার পাশাপাশি রেলপথের দুই পাশের প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক স্থান দেখার সুযোগ পাওয়া যেত।
এর বিভিন্ন ভ্রমণসূচিতে দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিকসহ আফ্রিকার নানা অঞ্চলের দর্শনীয় স্থান অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোথাও বিস্তীর্ণ মরুভূমি, কোথাও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল, আবার কোথাও ঐতিহাসিক শহর—সব মিলিয়ে এই ট্রেনের ভ্রমণ ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। তবে শঙ্গোলোলো এক্সপ্রেসের কার্যক্রম ও বর্তমান পরিষেবার অবস্থা যাচাই না করে একে এখনো নিয়মিত চলাচলকারী ট্রেন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
১২. বেলমন্ড ব্রিটিশ পুলম্যান, ইংল্যান্ড
বেলমন্ড ব্রিটিশ পুলম্যানের বগিগুলো যেন অতীতের কোনো গল্প থেকে উঠে এসেছে। পুরোনো দিনের নকশা, কাঠের কারুকাজ, নরম আসন আর মার্জিত সাজসজ্জা এই ট্রেনের প্রধান আকর্ষণ। কিছু বগির ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো।
লন্ডন থেকে বিভিন্ন বিশেষ ভ্রমণসূচিতে এই ট্রেনে চড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। কখনো যাত্রার মূল আকর্ষণ হয় ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চল, কখনো বিশেষ খাবারের আয়োজন। ট্রেনের ভেতরের সাজসজ্জা দেখে মনে হবে, সময় যেন কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে। তবে বেলমন্ড ব্রিটিশ পুলম্যানকে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের অংশ বলা ঠিক নয়; এটি নিজস্ব ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে চলা একটি ঐতিহাসিক ট্রেন।
১৩. গোল্ডেন চারিয়ট, ভারত
ভারতের আরেকটি বিলাসবহুল পর্যটক ট্রেন হলো গোল্ডেন চারিয়ট। এর বিভিন্ন ভ্রমণসূচিতে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, গোয়া ও আশপাশের অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ থাকে। পথে দেখা যেতে পারে হাম্পির প্রাচীন মন্দির ও ধ্বংসাবশেষ, দক্ষিণ ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। কোনো কোনো ভ্রমণসূচিতে গোয়ার সমুদ্রসৈকত ও কেরালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ট্রেনের ভেতরে রয়েছে আরামদায়ক কেবিন, খাবারঘর ও নানা আধুনিক সুবিধা। ইতিহাস, প্রকৃতি আর বিলাসিতার স্বাদ একসঙ্গে পেতে চাইলে গোল্ডেন চারিয়ট হতে পারে আকর্ষণীয় একটি অভিজ্ঞতা।
ট্রেনে চড়লেই যে শুধু গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে, এমন নয়। পৃথিবীর এসব ট্রেন দেখিয়ে দেয়, যাত্রাপথও কতটা সুন্দর হতে পারে। কখনো পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলা, কখনো বিস্তীর্ণ মরুভূমি পেরোনো, আবার কখনো রাজকীয় সাজে খাবার খেতে খেতে নতুন শহর দেখা। সব মিলিয়ে ট্রেনভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সুযোগ পেলে পছন্দের কোনো একটি ট্রেনে চড়ে দেখতে পারো। হয়তো সেই যাত্রার স্মৃতি অনেক দিন মনে থাকবে।