বৈশাখের গরমে নিজেকে নিরাপদ রাখব যেভাবে
বৈশাখ এল। সঙ্গে এল আনন্দ ও উৎসব। প্রতিবছরের মতো বৈশাখের মাধ্যমে শুরু হলো গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্ম মানেই গরম। বাইরে এখন কাঠফাটা রোদ। সূর্য যেন আগুন ঢেলে দিচ্ছে। গরমের শুরুতেই ঢাকার তাপমাত্রা বেশ চড়া। গতকাল ছিল চৈত্রের শেষ দিন। এদিন দুপুরে কারওয়ান বাজার এলাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে অনুভব হচ্ছিল আরও এক ডিগ্রি বেশি।
বাংলাদেশের আবহাওয়ার চক্রে বৈশাখ মানেই আনুষ্ঠানিকভাবে গরমকাল শুরু। মার্চের শেষ দিক থেকেই গরমের আভাস পাওয়া যায়, কিন্তু বৈশাখ এলে সেটা যেন পুরো শক্তি নিয়ে হাজির হয়। বাইরে বের হলে সবাই একটু ছায়া খোঁজে। একটু ঠান্ডা, একটু বাতাস এ সময় স্বস্তি দিতে পারে। শহর বা গ্রামে একই চিত্র। কারও কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, কেউ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে অস্বস্তি নিয়ে। গ্রামে এ সময় পুকুরে গোসলের ভিড় বাড়ে। সঙ্গে গোসলের সময়ও বাড়ে। বেশি সময় ধরে পানিতে ডুব দিতে নিশ্চয়ই এ সময় ভালো লাগে।
বৈশাখের এই গরমের পেছনে আছে ভৌগোলিক ও মৌসুমি কিছু কারণ। সূর্য এখন প্রায় সরাসরি আমাদের ওপরে অবস্থান করছে। ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ কম থাকায় মাটিও শুকিয়ে গেছে। শুষ্ক মাটি তাপ ধরে রাখে বেশি সময় ধরে। ফলে দিনের গরম রাতেও খুব একটা কমে না। অনেকে রাতে গরমে ঘুমাতে পারে না।
এই গরমের মধ্যেও বৈশাখের আলাদা সৌন্দর্য আছে। ঝলমলে রোদে এখন মাঠে দুলছে কাঁচা ধানের খেত। গ্রামে গেলে তালগাছের মাথায় হালকা বাতাসের দোল দেখতে পাবে। হুট করে কোথাও কালবৈশাখীর কালো মেঘ জমে ওঠার দৃশ্যও দেখা সম্ভব। সব মিলিয়ে সময়টা আলাদা। হঠাৎ করে বৈশাখের কোনো বিকেলে যদি কালবৈশাখী ঝড় ওঠে, ধুলাবালির ওড়াউড়ি, বজ্রপাতের শব্দ, একপশলা বৃষ্টি যদি আসে, হুট করে যদি আমাদের চারপাশ ঠান্ডা হয়ে যায়, তাহলে এই গরমের দিনে শরীর জুড়িয়ে যাবে।
গরমের এই সময়টায় আমাদের শরীর হুট করে আসা অস্বাভাবিক গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিপাকে পড়তে পারে। এ সময় আমাদের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আসে। মানুষ বেশি করে পানি পান করতে শুরু করে। হালকা পোশাক বেছে নেয়। দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। শহরের ফুটপাতে এ সময় বেশি বেশি লেবুর শরবত, আখের রস, ডাবের পানি বিক্রি হয়।
পয়লা বৈশাখের দিনটি বেশ আলাদা। সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা, লাল-সাদা পোশাক, পান্তা-ইলিশের আয়োজন। সবকিছুর সঙ্গে যেন অতিরিক্ত গরম, তীব্র রোদ বাড়তি কিছু হয়ে আছে। তবু মানুষের আনন্দ। গরমকে সঙ্গী করেই উৎসব চলছে।
বৈশাখে তীব্র গরমে আমাদের জীবনযাপনে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। যেমন অতিরিক্ত তাপপ্রবাহে আমাদের ঘাম আর ক্লান্তি হয়। এই সময়টায় একটু অসতর্ক হলেই দেখা দিতে পারে বিভিন্ন রকম শারীরিক সমস্যা। হিটস্ট্রোক থেকে শুরু করে পানিশূন্যতা পর্যন্ত এ সময়ে ঘটতে পারে। তাই বৈশাখের গরমে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
সকালবেলা বাসা থেকে বের হওয়ার আগে পর্যাপ্ত পানি পান করা খুব জরুরি। শরীরের ভেতরে পানি ঠিক থাকলে গরমের প্রভাব অনেকটা কম অনুভূত হয়। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা যেতে পারে। এগুলো সরাসরি রোদের তাপ থেকে আমাদের রক্ষা করে। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সময়টায় রোদ সবচেয়ে তীব্র থাকে। তাই সম্ভব হলে এই সময় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো।
খাবারের দিকেও রাখতে হবে বিশেষ খেয়াল। গরমের দিনে ভারী ও তৈলাক্ত খাবার শরীরকে আরও ক্লান্ত করে। এর বদলে হালকা ও পানিসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যেমন ফল, শাকসবজি, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত শরীরকে ঠান্ডা রাখে এবং শক্তি জোগায়। রাস্তাঘাটে যে ঠান্ডা পানীয় পাওয়া যায়, সেগুলো খাওয়ার সময় পরিচ্ছন্নতার দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
পোশাক নির্বাচনও এই সময়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গাঢ় রঙের কাপড়ের বদলে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা পোশাক পরলে শরীর সহজে বাতাস পায়। কম গরম লাগে। সুতি কাপড় সবচেয়ে ভালো। কারণ, এটি ঘাম শোষণ করে শরীরকে স্বস্তি দেয়।
এই সময় বিশ্রাম নেওয়াও জরুরি। দিনের মধ্যে কিছুটা সময় ঠান্ডা জায়গায় বসে থাকা, সুযোগ পেলে গোসল করে শরীরকে দ্রুত ঠান্ডা করা জরুরি। যাঁরা বাইরে কাজ করেন, রিকশাচালক, শ্রমিক বা কৃষক, তাঁদের জন্য বিরতি নেওয়া আরও বেশি প্রয়োজন।
সবচেয়ে জরুরি হলো শরীরের সংকেত বুঝতে পারা। যদি মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা বমি ভাব দেখা দেয়, তাহলে সেটি হিটস্ট্রোকের আগের লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া এবং পানি পান করা উচিত।
একটু সচেতনতা, কিছু সহজ অভ্যাস আমাদের বৈশাখের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের সুস্থ আর স্বস্তিতে রাখতে পারে।