এমন একটা এককোষী শৈবাল আছে, যেটা আলো দেখলে সাঁতরে আলোর দিকে চলে যায়। ক্ল্যামাইডোমোনাস নামের এই ক্ষুদ্র জীবটা নিয়ে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কাজ করছিলেন জার্মান গবেষক পিটার হেগেমান। তাঁর প্রশ্ন ছিল খুব সোজা, আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এত দ্রুত কীভাবে এই শৈবালের ভেতরে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল তৈরি হয়?
এই ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই কয়েক দশক পরে বিজ্ঞানীরা এমন একটা প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যেটা দিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই পদ্ধতির নাম অপ্টোজেনেটিকস। আর এই কাজের জন্যই ২০২৬ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পেয়েছেন কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল।
আইডিয়াটা অবশ্য আরও পুরোনো। ডিএনএর গঠন নিয়ে বিখ্যাত কাজের কয়েক দশক পরে ফ্রান্সিস ক্রিকের আগ্রহ ঘুরে যায় মস্তিষ্কের দিকে। তিনি বুঝতে চাইছিলেন, মস্তিষ্ক কীভাবে আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতাগুলো তৈরি করে। তখন একটা বড় সমস্যা ছিল। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো একে অপরের সঙ্গে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল দিয়ে যোগাযোগ করে, আর এই কাজটা হয় মিলিসেকেন্ডের মধ্যে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের হাতে এমন কোনো পদ্ধতি ছিল না, যেটা দিয়ে তাঁরা নির্দিষ্ট একধরনের স্নায়ুকোষকে ঠিক দরকারের মুহূর্তে আলাদা করে অ্যাকটিভ করতে পারবেন।
ক্রিকের ধারণা ছিল, আলো দিয়ে হয়তো কাজটা করা সম্ভব। সমস্যা হলো, মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ তো এমনিতে আলোতে সাড়া দেয় না।
এই সমস্যার সমাধান পাওয়া গেল শৈবালে।
ক্ল্যামাইডোমোনাসের মধ্যে এমন কিছু আলোক সংবেদনশীল প্রোটিন আছে, যেগুলো আলো পড়লে কোষের ঝিল্লিতে একটা চ্যানেল খুলে দেয়। সেই চ্যানেল দিয়ে চার্জযুক্ত আয়ন চলাচল করে, আর তাতেই কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়।
২০০০ সালের দিকে হেগেমানের দল এমন দুটি জিন খুঁজে পায়, যেগুলো থেকে পরে channelrhodopsin-1 এবং channelrhodopsin-2 নামের প্রোটিন শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে channelrhodopsin-2 বা ChR2 ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আলো পড়ার মাত্র ০.২ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে এর চ্যানেল খুলে যায়।
এরপর গল্পে আসেন কার্ল ডাইসেরথ।
ডাইসেরথের প্রশ্ন ছিল, শৈবালের এই আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন যদি কোনোভাবে স্নায়ুকোষে বানানো যায়, তাহলে কি আলো দিয়েই সেই স্নায়ুকোষে সিগন্যাল তৈরি করানো সম্ভব?
ইঁদুরের স্নায়ুকোষে এরপরে channelrhodopsin-2-এর জিন ঢোকানো হলো। স্নায়ুকোষগুলো নিজেরাই প্রোটিনটা তৈরি করল। এরপর নীল আলো ফেলতেই সেই কোষে বৈদ্যুতিক নার্ভ সিগন্যাল তৈরি হলো। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সেই সিগন্যাল শুধু ওই কোষের মধ্যেই আটকে থাকল না। কোষটা তার সঙ্গে সংযুক্ত অন্য স্নায়ুকোষেও স্বাভাবিকভাবে সিগন্যাল পাঠাতে পারল।
২০০৫ সালে ডাইসেরথের দল এই কাজের ফল প্রকাশ করে। পরের বছর নতুন এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয় অপ্টোজেনেটিকস।
এরপর শুরু হলো আরও চমকপ্রদ সব পরীক্ষা।
২০০৭ সালে জীবন্ত ইঁদুরের মোটর কর্টেক্সের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে channelrhodopsin-2 তৈরি করানো হয়। ইঁদুরের মাথায় পাতলা অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে নীল আলো দেওয়া হলো। আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্নায়ুকোষগুলো অ্যাকটিভ হলো, আর ইঁদুরের গোঁফ নড়ে উঠল। একই বছর আরেক পরীক্ষায় ঘুম আর জেগে থাকার সঙ্গে জড়িত একধরনের স্নায়ুকোষে আলো ফেলা হলো। কোষগুলো অ্যাকটিভ হওয়ার পর ঘুমন্ত ইঁদুরের জেগে ওঠার সম্ভাবনা বেড়ে গেল।
কয়েক বছর পরে গবেষকেরা স্মৃতি নিয়েও একই ধরনের পরীক্ষা করলেন।
২০১২ সালে ইঁদুরের ভয় পাওয়ার সময় মস্তিষ্কের কোন স্নায়ুকোষগুলো অ্যাকটিভ হয়েছিল, সেগুলো চিহ্নিত করেন ডাইসেরথ, সুসুমু তোনেগাওয়া ও তাঁদের সহকর্মীরা। পরে ইঁদুরটাকে এমন একটা জায়গায় নেওয়া হলো, যেখানে ভয় পাওয়ার মতো কিছুই নেই। কিন্তু আগের ভয় পাওয়ার সময় যে স্নায়ুকোষগুলো অ্যাকটিভ হয়েছিল, সেগুলো আলো দিয়ে আবার অ্যাকটিভ করতেই ইঁদুরটা ভয়ে একদম স্থির হয়ে গেল।
অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটা স্মৃতির সঙ্গে কোন স্নায়ুকোষগুলো জড়িত, শুধু সেই কোষগুলো আবার অ্যাকটিভ করলে ওই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত আচরণও ফিরে আসতে পারে।
অপ্টোজেনেটিকসের গুরুত্ব এখানেই।
আগে আমরা হয়তো বলতাম, মস্তিষ্কের এই জায়গাটা ভয় নিয়ন্ত্রণ করে, ওই জায়গাটা স্মৃতির জন্য কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা এত সোজা না। একই ছোট জায়গার মধ্যে পাশাপাশি থাকা দুই ধরনের স্নায়ুকোষের কাজ একেবারেই আলাদা হতে পারে। আবার অনেক দূরে থাকা স্নায়ুকোষও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে।
এভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত স্নায়ুকোষের একটা নেটওয়ার্ককে বলা হয় নিউরাল সার্কিট।
অপ্টোজেনেটিকস দিয়ে এখন গবেষকেরা নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে অ্যাকটিভ করতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে তাদের সিগন্যাল তৈরি হওয়া বন্ধও করে দিতে পারেন। তারপর তাঁরা দেখেন এতে ঘুম, ভয়, খাবার খোঁজা, তৃষ্ণা, নড়াচড়া বা অন্য কোনো আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে।
চিকিৎসায় এর ব্যবহার এখনো একেবারে শুরুর দিকে। তবে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসাতে (retinitis pigmentosa) দৃষ্টিশক্তি হারানো একজন মানুষের রেটিনার কোষে channelrhodopsin-জাতীয় আলোক সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করে বিশেষ চশমার সাহায্যে চোখের দেখার ক্ষমতা কিছুটা ফেরানোর পরীক্ষাও হয়েছে। আরেকটি সম্ভাবনা কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট নিয়ে। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট হলো এমন একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যেটা গুরুতর শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের কানে বসানো হয়। সাধারণ হিয়ারিং এইডের মতো এটি শুধু শব্দ জোরে শোনায় না, বরং বৈদ্যুতিক সিগন্যাল দিয়ে সরাসরি অডিটরি নার্ভ বা শ্রবণ স্নায়ুকে অ্যাকটিভ বা উদ্দীপিত করে। ভবিষ্যতে অপ্টোজেনেটিক্স ব্যবহার করে শ্রবণ স্নায়ুর কোষগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে আলো দিয়ে অ্যাকটিভ করা সম্ভব হতে পারে।
৫ অক্টোবর নোবেল অ্যাসেম্বলি ঘোষণা করেছে, লাইট-গেইটেড আয়ন চ্যানেলস এবং অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে আবিষ্কারের জন্য কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাচ্ছেন।
পুরো গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা খুব ছোট প্রশ্ন দিয়ে—একটা এককোষী শৈবাল আলো দেখলে কেন সেদিকে সাঁতরে যায়?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত মানুষ মস্তিষ্কের কিছু অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালানোর সুইচ খুঁজে পেয়েছে।