১৩ বছরের সাঁতারুর এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জেতার হ্যাটট্রিক
এশিয়ান গেমসে তিনটি স্বর্ণ জিতে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে ১৩ বছর বয়সী চীনা মেয়ে সাঁতারু ইউ জিদি। সে ২০০ মিটার বাটারফ্লাই, ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলি ও ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলি ইভেন্টে প্রথম হয়েছে। মেডলি সাঁতার হলো সাঁতারের এমন একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে একজন সাঁতারু বা একটি দল নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে চারটি ভিন্ন সাঁতারের ধরন ব্যবহার করেন। নিজের সেরাটা দেখিয়ে সাঁতারের এই তিনটি কঠিন প্রতিযোগিতা জিতেছে সে।
চীনের এই কিশোরী শুরু থেকেই নিজের ছন্দে সাঁতার কেটে ৪ মিনিট ২৮.৫৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে। ২০১৪ সালের পুরোনো রেকর্ডটি প্রায় ৪.৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে ভেঙে দেয়। চলতি বছরে এটি বিশ্বের চতুর্থ দ্রুততম সময়। এ বছরে শুধু কানাডার বিশ্ব রেকর্ডধারী সামার ম্যাকিনটশই তার চেয়ে কম সময়ে এই সাঁতার শেষ করেছেন।
প্রতিযোগিতায় ইউ তারই দেশের কে ওয়েনক্সির চেয়ে ৩.৯৫ সেকেন্ড এগিয়ে থেকে প্রথম হয়। ওয়েনক্সি রৌপ্যপদক পায় এবং জাপানের মিও নারিটা ব্রোঞ্জ জেতে।
ইউ জিদির সাঁতার দেখে এশিয়ান গেমসে বিভিন্ন দেশের সাঁতারুরা বেশ প্রশংসা করছেন। তাঁদের মতে, সাঁতারের এই নতুন প্রতিভা খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বমঞ্চ জয় করবে। ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অলিম্পিক খেলা হবে। সেখানে সে সেরা সাঁতারুদের একজন হতে পারে। অলিম্পিকে কানাডার তারকা সাঁতারু সামার ম্যাকিনটশের সঙ্গে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। কারণ, সামারও ইউ জিদির মতো একই ইভেন্টগুলোতে সাঁতার কাটে।
একইভাবে ২০২৭ সালে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ওয়ার্ল্ড অ্যাকুয়াটিকস চ্যাম্পিয়নশিপেও এই দুই তরুণ সাঁতারুর মুখোমুখি হওয়ার দারুণ সুযোগ রয়েছে। কানাডার সাঁতারু সামার ম্যাকিনটশের বয়স এখন ২০ বছর। তিনি অলিম্পিকে তিনবার স্বর্ণ জিতেছেন। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড অ্যাকুয়াটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে আটবার ও কমনওয়েলথ গেমসে দুবার স্বর্ণ পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে তাঁর।
ইউ জিদি যেসব ইভেন্টে সাঁতার কাটে, সেগুলোতে কানাডার তারকা সাঁতারু সামার ম্যাকিনটশই সেরা। সে মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই সাঁতারের বিশ্বমঞ্চে সাঁতার কাটছে। ইউ জিদির তিনটি মূল ইভেন্টেই তাঁর বিশ্বরেকর্ড রয়েছে। এই তিন ইভেন্ট হলো ২০০ মিটার বাটারফ্লাই (২ মিনিট ১.৬৫ সেকেন্ড), ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলি (২ মিনিট ৫.৭০ সেকেন্ড) এবং ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলি (৪ মিনিট ২৩.৬৫ সেকেন্ড)।
তবে ইউ জিদি খুব দ্রুতই সেই বিশ্ব রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। সম্প্রতি এশিয়ান গেমসে সে ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলি সাঁতার শেষ করে মাত্র ২ মিনিট ৬.১০ সেকেন্ডে। অর্থাৎ এই ইভেন্টে সে ম্যাকিনটশের রেকর্ডের একেবারেই কাছাকাছি রয়েছে।
১২ বছর বয়সের হিসাব করলে দেখা যায়, ম্যাকিনটশ ওই বয়সে যা করেছিলেন, ইউ তাঁর চেয়ে অনেক দ্রুত সাঁতার কেটেছিল। ওই বয়সে ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলিতে ইউ প্রায় ১৫ সেকেন্ড এবং ২০০ মিটারে প্রায় ১২ সেকেন্ড দ্রুত সাঁতার শেষ করেছিল। ৫০ মিটারের পুলে ১২ থেকে ১৫ সেকেন্ডের সময় মানে প্রায় অর্ধেকটা পুলের ব্যবধান।
নিজের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ইউ জিদি হয়তো একটির পর একটি নতুন রেকর্ড গড়বে। সে অন্য দূরত্বের সাঁতারে অংশ নিলে সেখানেও রেকর্ড ভাঙতে পারে। তবে সামার ম্যাকিনটশ বা অন্য প্রতিযোগীরা তাঁকে সহজে ছেড়ে দেবেন না।
মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিশ্বমঞ্চে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন ইউ। ওই ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার বয়সেই সে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়। সেখানে তার তিনটি সাঁতারেই খুব অল্পের জন্য পদক হাতছাড়া হয় এবং সে ৪ নম্বরে থেকে শেষ করে। তবে একটি রিলে ইভেন্টে ব্রোঞ্জপদক জিতেছিল তার দল। যদিও ফাইনালে সে নিজে নামেনি।
ইউ চীনের হেবেই প্রদেশের বাওডিং শহরে থাকে। শহরটি রাজধানী বেইজিং থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। চীনের বেশির ভাগ সেরা সাঁতারু দেশের আরও দক্ষিণের অঞ্চলগুলো থেকে আসেন।
ছয় বছর বয়সে ইউ সাঁতার কাটা শুরু করে। একজন স্থানীয় কোচ থেকে সে শিখেছে সাঁতার। চীনা সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাঁতারে মন দেওয়ার জন্য তাকে পিয়ানো ও নাচের ক্লাস ছেড়ে দিতে হয়। এশিয়ান গেমসের সাঁতার দেখার জন্য তার মা লিউ হুই এবং বাবা ইউ তাও দুজনই মাঠে উপস্থিত ছিলেন।
গত বছর চীনের একটি টিভি চ্যানেলে ইউকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সে নিজেকে জন্মগত প্রতিভাবান মনে করে কি না। জবাবে সে জানায়, ‘আমি কোনো জন্মগত প্রতিভাবান নই, আমি শুধুই একজন পরিশ্রমী মানুষ।’