ফিলিস্তিনের শিশুরা নিজেদের স্বপ্নের কথা জানাচ্ছে ছবি এঁকে
অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে থাকেন এক নারী। তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে শিশুদের ছবি আঁকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হেবরন শহরে প্রায়ই ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান চলে। চারপাশে নানা ধরনের ভয় ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতেও সেই বাড়িতে গিয়ে ছোট শিশুরা ছবি আঁকে। আঁকার মাধ্যমে তারা তাদের মনের ভয় আর নানা অনুভূতির কথা জানায়। তাদের মন হালকা করার জন্যই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্পী সারা আবু মাদি ২০২০ সালে এ কেন্দ্র শুরু করেন। আরবি শব্দ ‘রোমমানা’র নামানুসারে এর নাম রাখা হয়েছে, যার বাংলা অর্থ ‘ডালিম’। সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের মন থেকে ভয় দূর করতে তাঁর এ বাড়ির গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।
সারা আবু মাদি জানান, খারাপ কোনো ঘটনা ঘটলে তাঁরা শিশুদের মনখুলে কথা বলতে উৎসাহিত করেন। কোনো বাড়িতে সেনা অভিযান হলে কিংবা শিশুরা ভয় পেলে তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, ঘটনাটির পর তাদের কেমন লেগেছে? কেমন সুন্দর জীবনে তারা বাঁচতে চায়, সেটাও জানতে চাওয়া হয়। তখন রং-তুলি দেওয়া হয় শিশুদের; ছবি এঁকে তাদের মনের জমানো সব কথা জানায়।
যেমন এই সপ্তাহে শিশুদের বলা হয়েছিল তাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের ছবি আঁকতে। ১০ বছর বয়সী তালিয়া সাবাহ তখন খাঁচা থেকে উড়ে যাওয়া একটি পাখির ছবি আঁকে। সে জানায়, সে পাখিটির মতো মুক্ত হতে চায়। আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাধীনতা। আমরা চাই যুদ্ধের ভয় মুছে যাক। স্বাধীনতা আসুক। আমরা যেন নিজেদের মতো করে মনের আনন্দে বাঁচতে পারি।
‘স্বপ্ন তো দেখাই যায়’
১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে নেয়। এর পর থেকে এলাকাটি তাদের সামরিক শাসনের অধীন রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সময়ে সেখানে আরও বেশিসংখ্যক নতুন ইসরায়েলি বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে।
জাতিসংঘসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব নতুন বসতিকে অবৈধ মনে করে। তবে ইসরায়েল এই নিয়ম মানতে রাজি নয়। তাদের দাবি, জায়গাটির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা রয়েছে।
শিল্পী সারা আবু মাদি জানান, তাঁদের রোমানা স্টুডিওটি হেবরনের ওয়াদি আল-সামেন এলাকায় অবস্থিত। চারপাশের ছয়টি সামরিক চেকপয়েন্টের কারণে এলাকাটি শহরের বাকি অংশ থেকে একপ্রকার আলাদা হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায়ই এখানে সেনা অভিযান আর ইসরায়েলি বসতির মানুষের যাতায়াত দেখা যায়।
এখানকার ছোট শিশুরা ইসরায়েলি সেনা আর বসতি স্থাপনকারীদের মুখোমুখি হওয়ার কথা এত সহজে বলছিল, যা এই বয়সের শিশুদের মুখে মানায় না।
১১ বছর বয়সী কারাম সাবাহ বলে, পাহাড়ের ওপর আমার নানার জমি আছে। কিন্তু ইসরায়েলিরা সেখানে নতুন বসতি বানিয়ে আমাদের জায়গা দখল করে নিয়েছে। এখন আমাদের কেউ নিজের সেই পাহাড়ে গেলেও তাকে তারা ধরে নিয়ে যায়।
শুরুর দিকে রোমানা ছিল একটি পুরোনো গুদামঘর। যেখানে মেঝেতে কেবল কয়েকটি কার্পেট পাতা থাকত। আর এখন প্লাস্টিকের ছোট নিচু টেবিল ঘিরে শিশুরা এক হয়ে বসে। চারপাশের দেয়ালে রয়েছে শিশুদেরই আঁকা সব রঙিন ছবি।
সারা আবু মাদি জানান, শিশুদের আঁকা এসব ছবি এখন ফিলিস্তিনের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের দেশেও পৌঁছে গেছে। ইতিমধ্যে কানাডায় শিশুদের এই ছবির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেক্সিকোতে আরেকটি নতুন প্রদর্শনীর পরিকল্পনা চলছে।
বর্তমানে এই কেন্দ্রে নিয়মিত প্রায় ৬০০ শিশু আসে। সারা আবু মাদির ইচ্ছা, কাজের পরিধি আরও বাড়িয়ে এই এলাকার প্রায় ৩ হাজার শিশুর কাছে পৌঁছে যাওয়া।
শিশুদের আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, ডানাওয়ালা এক বিশাল ঘোড়ার পিঠে তিনটি শিশু বসে ওড়ার আনন্দ নিচ্ছে। চেকপয়েন্টের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন আকাশে ডানা মেলার স্বপ্নের কথাই বলছে এই ছবি।
সারা আবু মাদি বলেন, ছবি আঁকার এই মাধ্যম শিশুদের মনে করিয়ে দেয়, তোমরাও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারো। তোমরা নিজেদের কল্পনা দিয়ে চারপাশের এই কঠিন বাস্তবতাকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন বুনতে পারো।