গ্যালাক্সি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে এক সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নতুন তথ্য
বহু বছর ধরে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এবার বাস্তবে এর প্রমাণ ধরা পড়েছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের চোখে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি হতে পারে প্রথম নিশ্চিত ‘রানঅ্যাওয়ে’ সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এটি নিজের গ্যালাক্সি ছেড়ে প্রায় ২.২ মিলিয়ন মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে মহাকাশে ছুটে চলেছে।
এই ব্ল্যাকহোলটির অস্তিত্ব প্রথম জানা যায় ২০২৩ সালে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিটার ভ্যান ডকুম ও তাঁর দল হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পুরোনো একটি ছবিতে এক অদ্ভুত, সরু আলোর রেখা দেখতে পান। এটি এত অস্বাভাবিক ছিল, রেখাটিকে প্রথমে ক্যামেরার ত্রুটি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে হাওয়াইয়ের কেক অবজারভেটরির পর্যবেক্ষণে সেই সন্দেহ দূর হয়। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, এটি আসলে এক বিশাল ব্ল্যাকহোলের পেছনে রেখে যাওয়া নক্ষত্রদের দীর্ঘ ‘লেজ’।
এই ব্ল্যাকহোলটির ভর প্রায় দুই কোটি সূর্যের সমান। এর পেছনে থাকা নক্ষত্রের লেজ প্রায় ২ লাখ আলোকবর্ষ দীর্ঘ, যা আমাদের পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির দ্বিগুণ প্রস্থের কাছাকাছি। হাবলের তোলা ছবিটি বহু আগেরকার সময়ের চিত্র তুলে ধরেছে। এটি এত আগের, যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল আজকের ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছরের প্রায় অর্ধেক।
বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন ছিল। সত্যিই কি এটি গ্যালাক্সি থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া একটি ব্ল্যাকহোল? নাকি অন্য কিছু? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে বিজ্ঞানীরা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্য নেন। কারণ, ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করে অসাধারণ সংবেদনশীল ও সূক্ষ্ম ছবি তুলতে পারে নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ।
জেমস ওয়েবের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্ল্যাকহোলটি যখন প্রচণ্ড বেগে গ্যাসের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এর সামনে তৈরি হচ্ছে এক শক্তিশালী শকওয়েভ বা ‘বো শক’। অনেকটা জাহাজ চলার সময় পানিতে ঢেউ ওঠার মতো। জাহাজকে ধরতে পারো এক অদৃশ্য ব্ল্যাকহোল হিসেবে। আর পানিকে ধরো হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস। এই শকওয়েভের স্পষ্ট চিহ্নই বিজ্ঞানীদের কাছে ছুটে চলা ব্ল্যাকহোলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বিভিন্ন টেলিস্কোপে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পাওয়া তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাত্ত্বিক মডেলগুলো যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, সেগুলো মিলছে। পাঁচ দশকের গবেষণা ও ধারণার প্রমাণ হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিশাল এক ব্ল্যাকহোল কীভাবে নিজের গ্যালাক্সি ছেড়ে বেরিয়ে গেল? বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর পেছনে আছে ভয়ংকর এক মহাজাগতিক সংঘর্ষ। অন্তত দুটি, এমনকি তিনটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল যদি খুব কাছাকাছি আসে, এদের তীব্র মহাকর্ষীয় টানাপোড়েনে একটি গ্যালাক্সি থেকে ব্ল্যাকহোলের ছিটকে যাওয়া সম্ভব। প্রতিটির ভর যদি কোটি কোটি সূর্যের সমান হয়, তবে সেই সংঘর্ষ কতটা ভয়ানক হতে পারে, কল্পনা করা কঠিন।
এই ধরনের ছুটে যাওয়া ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সি ও ব্ল্যাকহোলের বিবর্তন বোঝার নতুন নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন। আমাদের মিল্কিওয়ের মতো প্রায় সব বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল আছে। এরা কি সারা জীবন কেন্দ্রেই আটকে থাকে, নাকি কোনো কোনো ছুটে পালিয়ে যেতে পারে, এই প্রশ্নের উত্তর বহুদিন ধরেই খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স