ওডিসিউস থেকে ওপেনহেইমার: ক্রিস্টোফার নোলানের চোখে
হলিউডের মুভিগুলোতে একটা দৃশ্য খুব পরিচিত—হঠাৎ আকাশ থেকে বিশাল এক গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে, কিংবা অদ্ভুত কোনো ভাইরাসে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে কোনো এক হিরো এসে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে দিল। মুভির ভাষায় একে বলে অ্যাপোক্যালিপ্স বা পৃথিবীর শেষ দিন। কিন্তু তুমি কি জানো, শব্দটার আসল অর্থ মোটেও ধ্বংস নয়?
গ্রিক শব্দ অ্যাপোক্যালিপসিস থেকে আসা এই শব্দের আসল অর্থ উন্মোচন করা। সোজা কথায়, কোনো পুরোনো দুনিয়া বা যুগের শেষ হয়ে নতুন এক দুনিয়ার শুরু হওয়া। হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের মুভিগুলোয় ঠিক এ ব্যাপারটাই বারবার ঘুরেফিরে আসে।
নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ বা ‘টেনেট’ মুভির কথা মনে আছে? সেখানেও পৃথিবী ধ্বংসের মুখে ছিল। তবে নোলানের আসল মুনশিয়ানা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। তাঁর আগের সাড়াজাগানো মুভি ‘ওপেনহেইমার’ এবং হালের ‘দ্য অডিসি’ দেখলে ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই দুটি মুভিতেই নোলান শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের গল্প বলেননি, বরং অতীত ও ভবিষ্যতের মানবসভ্যতা কীভাবে এক সুতায় গাঁথা, সেটাই দেখাতে চেয়েছেন।
নোলানের ‘দ্য অডিসি’ মুভির হিরো ওডিসিউস বেশ আধুনিক ও ভীষণ নীতিমান একজন মানুষ। প্রাচীন গ্রিসে নিয়ম ছিল, অচেনা অতিথিদের সম্মান করতে হবে; কারণ, ছদ্মবেশে কোনো দেবতাও তো আসতে পারেন! ওডিসিউস এই নিয়মে খুব বিশ্বাসী। তখনকার দিনে গায়ের জোর দিয়ে হিরোর ক্ষমতা মাপা হলেও, ওডিসিউসের কাছে সম্মানের দাম অনেক বেশি। সে গায়ের জোরের চেয়ে দেবী অ্যাথেনার বুদ্ধিকে বেশি সম্মান করে। এমনকি কোনো প্রাণী শিকার করার আগেও সে তাকে সতর্ক করে দেওয়ার পক্ষে!
প্রজ্ঞার দেবী অ্যাথেনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ওডিসিউস। ছবি: মেলিন্ডা সু গর্ডন/ইউনিভার্সাল পিকচার্স
ঠিক এই জায়গাতেই ওডিসিউসের সঙ্গে দারুণ মিল পাওয়া যায় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহেইমারের। দুজনই নিজেদের যুগের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ। ওপেনহেইমার যেমন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর চারপাশের চেনা দুনিয়ার নিয়মকানুন ভেঙে পড়ছে, ওডিসিউসও ঠিক তেমনই জানতেন। ওপেনহেইমার পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিলেন, কিন্তু এরপর কী ভয়ানক পরিণতি হবে, তা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।
ওডিসিউসের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। ট্রয় নগরীর পতন ও ট্রোজান হর্সের সেই বিখ্যাত গল্পটা তো তোমার জানাই আছে। বিশাল এক কাঠের ঘোড়ার পেটে লুকিয়ে দুর্ভেদ্য ট্রয় নগরীতে ঢুকে পড়েছিল গ্রিক সেনারা। এটা ছিল ওডিসিউসেরই আইডিয়া। কিন্তু এই উপহার দিয়ে ট্রয় জয় করার পর ওডিসিউস বুঝতে পারে, সে আসলে কত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। সে তার স্ত্রী পেনেলোপকে বলে, এই একটা চালাকি দিয়ে সে আসলে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের পবিত্র নিয়মটাই ভেঙে ফেলেছে। সামনাসামনি লড়াইকে সে বানিয়ে ফেলেছে শুধু একটা সম্মানহীন শিকার।
পারমাণবিক বোমার মতোই ওডিসিউসের এই একটা সিদ্ধান্ত হাজারো মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছিল। ফলে ব্রোঞ্জ যুগের অবসান ঘটে এবং পৃথিবী ডুবে যায় অন্ধকারে। নোলান আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, ইতিহাসে এমন ঘটনা বারবার ঘটে। আজ আমরা যে নিয়ম বা ভুলগুলো করছি, তা ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসবে। মজার ব্যাপার হলো, মুভিতে প্রাচীন গ্রিসের যে আতিথেয়তার নিয়মের কথা বলা হয়েছে, হুবহু একই কথার প্রতিধ্বনি পরে বাইবেলেও দেখা গেছে। অর্থাৎ সভ্যতার ইতিহাস আসলে একটা লম্বা শিকলের মতো।
নোলানের অন্য মুভিগুলোতেও কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের এই অলিখিত চুক্তির কথা আছে। ‘দ্য ডার্ক নাইট’ মুভিতে জোকারের সেই নৌকার গেমটার কথা মনে করে দেখো। যাত্রীদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তারা নিজেদের নীতি বিসর্জন দিয়ে নিজেদের বাঁচাবে, নাকি নীতি ধরে রেখে মরবে। আবার ‘টেনেট’ বা ‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিতেও মানুষের সঙ্গে মানুষের, অতীত ও ভবিষ্যতের এক অদ্ভুত টান দেখানো হয়েছে। আমরা আজ যা করছি, তার প্রভাব পড়বে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
নোলানের ‘দ্য অডিসি’ হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় ক্যানভাসের মুভি। ‘ওপেনহেইমার’ মুভির মতোই এখানকার হিরোও যুদ্ধে জেতে, কিন্তু নিজের অজান্তেই মানবসভ্যতার ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়ে একটা বিশাল বোঝা ঘাড়ে তুলে নেয়। তবে মুভিটার শেষ কিন্তু হতাশায় মোড়ানো নয়। ওডিসিউস ও পেনেলোপ যখন তাদের দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিয়ে কথা বলে, তখন তারা এটাও বিশ্বাস করে যে আগামীকাল ঠিকই আবার সূর্য উঠবে। নতুন একটা যুগ হয়তো আমাদের সামনে আরও একবার নিজেদের বাঁচানোর দারুণ একটা সুযোগ নিয়ে আসবে।