কাঠ কুড়াতে গিয়ে ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুর মৃত্যু
শীতকালে উষ্ণতার জন্য দরকার আগুন। সেই আগুনের জ্বালানি কাঠ কুড়াতে বের হয়েছিল গাজার দুই শিশু। উত্তর গাজায় একই পরিবারের এই দুই শিশুর জীবন থেমে গেছে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায়।
স্থানীয় চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, কামাল আদওয়ান হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছিল তারা। ঠিক সেই সময় বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালায় একটি ইসরায়েলি ড্রোন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় শিশু দুটি। হামলাটি ঘটে এমন এক সময়ে, যখন প্রতিদিন যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে প্রতিদিনই সেই যুদ্ধবিরতি ভাঙছে।
এবার গাজায় বেশ শীত পড়েছে। রাতের তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই। ফলে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে কাঠ, ভাঙা আসবাব কিংবা যা কিছু পাওয়া যায় তাই খুঁজতে বের হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, সেগুলো জ্বালিয়ে সামান্য তাপ পাওয়া। কারণ, পাতলা ক্যানভাস আর অস্থায়ী তাঁবুগুলো ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টি ঠেকাতে পারে না।
এই সংকট আরও গভীর হয়েছে জরুরি সহায়তা প্রবেশে কড়াকড়ির কারণে। ইসরায়েল গাজায় তাঁবু, অস্থায়ী ঘর, এমনকি তাঁবু মেরামতের উপকরণও ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের পাশাপাশি দখলদার শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করার অভিযোগও বারবার সামনে আসছে।
চিকিৎসা কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৮১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২০০-এর বেশি। আর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে মোট নিহত মানুষের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে। এই সংখ্যাগুলো প্রতিদিনই বাড়ছে।
গাজার শিশুরা শুধু বোমা আর ড্রোনের আঘাতে মারা যাচ্ছে না; শীতও বোমার মতোই প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি শীত মৌসুমে ঠান্ডার কারণে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০। সর্বশেষ মারা গেছে মাত্র তিন মাস বয়সী আলী আবু জুর। আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তার মৃত্যু হয়।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতার খবর আসছে। ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ‘নতুন গাজা’ গড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। উঁচু আবাসিক ভবন, ডেটা সেন্টার আর সমুদ্রতীরের রিসোর্টের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে।
কাগজে-কলমে সেই ভবিষ্যৎ ঝকঝকে। কিন্তু ঠিক একই সময়ে গাজায় শিশুরা কাঠ কুড়াতে বের হচ্ছে, একটু উষ্ণতার খোঁজে। কেউ কেউ আর ফিরে আসছে না। এটাই গাজার প্রতিদিনের বাস্তবতা। এখানে শীত, অবরোধ আর ড্রোন একসঙ্গে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা