ডাইনোসরের পায়ের ছাপ কীভাবে কোটি কোটি বছর টিকে থাকে
ডাইনোসরের ফসিল বলতে আমরা সাধারণত হাড়গোড় বুঝি। মিউজিয়ামের বিশাল কঙ্কাল দেখে আমরা অবাক হই। কিন্তু হাড় ছাড়াও আরেকটা জিনিস পাওয়া যায়, যা বিজ্ঞানীদের কাছে দামি গুপ্তধনের মতো। সেগুলো হলো পায়ের ছাপ। এই ছাপগুলো দেখে বোঝা যায়, ডাইনোসরটা কত জোরে দৌড়াত, দল বেঁধে কোথাও যাচ্ছিল কি না, বা তারা সাঁতার কাটতে জানত কি না! হাড় দেখে শুধু গঠন বোঝা যায়, কিন্তু পায়ের ছাপ দেখে বোঝা যায় তাদের আচরণ।
ডাইনোসরের হাড় পাওয়া তুলনামূলক সহজ। হাড় ক্যালসিয়াম দিয়ে তৈরি বলে মাটির নিচে অনেক দিন থাকতে পারে। কিন্তু নরম কাদামাটির ওপর পড়া পায়ের ছাপ কীভাবে টিকে থাকে? ওটা তো বাতাসের ঝাপটায় বা একপশলা বৃষ্টিতেই ধুয়েমুছে যাওয়ার কথা। তাহলে সেটা কীভাবে কোটি কোটি বছর ধরে অবিকল টিকে থাকে? নরম কাদা পাথরই–বা হয় কীভাবে?
ফসিল নিয়ে বিজ্ঞানের একটা আলাদা শাখা আছে। এর নাম ইকনোলজি। গ্রিক শব্দ ইকনস মানে পায়ের ছাপ বা চিহ্ন। তবে বিজ্ঞানের এই শাখার সাহায্যে পায়ের ছাপের পাশাপাশি লেজ টেনে নেওয়ার দাগ, নখ দিয়ে আঁচড়ানোর দাগ, গর্ত করার চিহ্ন, এমনকি মাটিতে বসে থাকার দাগ নিয়েও গবেষণা করা হয়। এই দাগগুলো পড়তে জানলে ডাইনোসরের গোপন স্বভাব-চরিত্রও বের করা সম্ভব।
বিজ্ঞান লেখক ও প্যালিওনটোলজিস্ট রাইলি ব্ল্যাক এই বিষয়টা একটু সহজভাবে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভাবি পায়ের ছাপ বেশিক্ষণ টেকে না। কিন্তু মরুভূমিতে হাঁটলে দেখবে, বহুদিন পরেও মানুষের পায়ের ছাপ থেকে যায়। ডাইনোসরের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমনই। তবে এর জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতি একদম নিখুঁত হতে হয়। একে বলা হয় গোল্ডিলকস কন্ডিশন। মানে খুব বেশি গরমও নয়, আবার খুব ঠান্ডাও নয়। সব দিক থেকে একদম ঠিকঠাক।
ব্যাপারটা আসলে কীভাবে ঘটে? কল্পনা করো, জুরাসিক যুগে তুমি কোনো নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছ। পানি মাত্র নেমে গেছে, মাটিটা কাদা কাদা। পেছনে তাকালে দেখবে, তোমার পায়ের ছাপের একটা লম্বা সারি। সাধারণত পরের দিনই এই ছাপ মুছে যাওয়ার কথা। কিন্তু যদি কপাল ভালো হয়?
ধরো, ছাপ পড়ার পরপরই প্রচণ্ড রোদ উঠল। কাদাটা একদম খটখটে হয়ে শুকিয়ে গেল। একদম ইটের মতো শক্ত। এরপর হঠাৎ বৃষ্টি এল বা নদীর পানি বাড়ল। নতুন পলিমাটি বা বালু এসে ওই শক্ত হয়ে যাওয়া পায়ের ছাপের গর্তটা আলতো করে ভরাট করে ফেলল। কিন্তু নিচের ছাপটাকে নষ্ট করল না।
রাইলি ব্ল্যাকের মতে, এটা অনেকটা প্লাস্টার অব প্যারিস দিয়ে ছাঁচ বা মূর্তি বানানোর মতো। নিচের শক্ত কাদাটা হলো ছাঁচ। আর ওপরের নতুন জমা মাটিটা কাস্ট। এরপর শুরু হয় সময়ের খেলা। কোটি কোটি বছর ধরে এর ওপর আরও মাটির স্তর জমে। প্রচণ্ড চাপে নিচের ওই কাদা ও বালু ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলে লিথিফিকেশন। পরে হয়তো ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে ওপরের স্তর সরে যায়, আর কোনো এক সন্ধানী বিজ্ঞানী হাতুড়ি দিয়ে পাথর সরিয়ে আবিষ্কার করেন কোটি বছর আগের সেই পদচিহ্ন।
তবে ব্যাপারটা কিন্তু এত সহজ নয়। কোটি কোটি প্রাণীর মধ্যে খুব প্রাণীরই এমন পায়ের ছাপ ফসিল হয়। বেশির ভাগ ছাপই বাতাসে বা পানিতে মুছে যায়। হাড়ের ফসিল হওয়ার জন্যও যেমন মৃত্যুর পরপরই দ্রুত মাটির নিচে চাপা পড়া দরকার, পায়ের ছাপের জন্যও ঠিক তাই।
ইকনোলজির নিয়ম ও হাড়ের ফসিল হওয়ার নিয়ম অনেকটা একই। দুটিই খুব দ্রুত মাটির নিচে চাপা পড়তে হয়। অর্থাৎ, ডাইনোসর হেঁটে যাওয়ার পর খুব দ্রুত সেই ছাপ শুকিয়ে যাওয়া এবং নতুন মাটিতে ঢেকে যাওয়া জরুরি।
তুমিও নিজের পায়ের ছাপ রেখে যেতে চাইলে নদীর পাড়ের কাদামাটিতে গিয়ে জোরে জোরে পা ফেলে হাঁটতে পারো। এরপর তোমার কাজ শেষ। কিন্তু শুধু এটুকুতেই কাজ হবে না। পলিমাটির স্তূপ এসে তোমার পায়ের ছাপ ঢেকে দিতে হবে। তাহলেই কোটি কোটি বছর পর তোমার পায়ের ছাপ হয়তো কেউ আবিষ্কার করবে।
আর যদি নিজের হাড়ের ফসিল রেখে যেতে চাও? হুম, সেটার জন্য তোমাকে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা করতে হবে!
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স