বিড়ালের শিকারের তালিকায় আছে ২ হাজারের বেশি প্রজাতির প্রাণী
তোমার বাড়িতে কি বিড়াল আছে? তুলতুলে, নরম আর খুব আদুরে, তাই না? সারা দিন মিউ মিউ করে দুধ ও মাছের কাঁটা চায়। দেখে মনে হয়, এর চেয়ে নিরীহ প্রাণী বুঝি আর নেই। মাছে-ভাতে বাঙালিদের বিড়ালগুলোও যেন মাছই পছন্দ করে। কিন্তু তুমি কি জানো, তোমার কোলের এই নিরীহ প্রাণীটি দক্ষ এবং ভয়ংকর এক শিকারি?
বিড়াল মাংসাশী প্রাণী। বাঘ বা সিংহের ডিএনএ তাদের শরীরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিড়াল মোটেও বেছে বেছে খায় না, বরং সুযোগ পেলে ওরা প্রায় সবকিছুই খেয়ে ফেলতে পারে! ওদের শিকারি প্রবৃত্তি এতটাই প্রবল যে পেট ভরা থাকলেও নিছক খেলার ছলে বা শিকারের আনন্দ নিতে তারা অন্য প্রাণীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন ইউনিভার্সিটির ইকোলজিস্ট ক্রিস্টোফার লেপসিক এবং তাঁর দল সম্প্রতি বিড়াল নিয়ে বিশাল এক গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে। তাঁরা দেখেছেন, বিড়ালেরা বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৮৪ রকমের প্রাণী খায়! ভাবা যায়? পৃথিবীর আর কোনো শিকারি প্রাণীর খাবারের তালিকায় এত বৈচিত্র্য নেই।
এই তালিকায় কী নেই! ৯৮১ প্রজাতির পাখি, ৪৬৩ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৩১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১১৯ প্রজাতির পোকামাকড় এবং ৫৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী যায় এদের পেটে। সহজ কথায়, পৃথিবীর মোট পাখি প্রজাতির প্রায় ৯ শতাংশ এবং মোট স্তন্যপায়ী প্রজাতির ৬ শতাংশ এখন বিড়ালের খাবারের মেনুকার্ডে আছে। চড়ই, শালিক থেকে শুরু করে বিরল প্রজাতির টিকটিকি পর্যন্ত শিকার করে এই আদুরে প্রাণীটি।
শুনে কি চমকে গেলে? ভাবছ, পুঁচকে বিড়াল আবার এত্ত সব প্রজাতির প্রাণী শিকার করে কীভাবে? তাহলে তোমাকে আরেকটু অবাক করে দিই। বিড়াল গরুর মাংসও খায়। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, বিড়ালেরা ইমু পাখি, সামুদ্রিক কচ্ছপ, এমনকি গরুর মাংসও খায়। তবে ভয় পেয়ো না, এরা জ্যান্ত গরু শিকার করে না। বিড়াল হলো সুবিধাবাদী শিকারি। এরা যেমন শিকার করতে জানে, তেমনি মরা প্রাণী খেতেও ওস্তাদ।
কোথাও মরা গরু, ইমু বা বড় প্রাণী পড়ে থাকলে বিড়ালেরা সেখান থেকে দিব্যি ভোজ সারে। অস্ট্রেলিয়ায় তো এক বিড়ালকে মরা ক্যাঙারু খেতেও দেখা গেছে! এমনকি মানুষের ফেলে দেওয়া ফাস্ট ফুডও এরা হজম করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ, এদের হজমশক্তি এবং খাদ্যাভ্যাস অবিশ্বাস্য রকমের ভালো।
আমাদের কাছে বিড়াল আদুরে হলেও প্রকৃতির অন্য প্রাণীদের কাছে এরা সাক্ষাৎ যমদূত। গবেষকেরা দেখেছেন, বিড়াল যেসব প্রাণী খায়, তার মধ্যে প্রায় ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকির মধ্যে আছে। অর্থাৎ, বিড়ালেরা বিপন্ন প্রাণীদের অস্তিত্ব আরও সংকটে ফেলছে।
বিড়ালদের এই সর্বভুক স্বভাবের কারণে অনেক নিরীহ প্রাণী পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড, মাদাগাস্কার বা হাওয়াইয়ের মতো দ্বীপগুলোতে, যেখানে স্থানীয় প্রাণীরা বিড়ালের মতো শিকারি চেনে না। সেখানে বিড়ালের আক্রমণ আরও বেশি ধ্বংসাত্মক। রেকর্ড বলছে, আধুনিক যুগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়া পাখি, স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ প্রজাতির মধ্যে ২৬ শতাংশের বিলুপ্তির জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিড়াল দায়ী। যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর পোষা বিড়ালেরা প্রায় ১৬ থেকে ২৭ কোটি ছোট প্রাণী মেরে ফেলে। আর অস্ট্রেলিয়ায় তো এরা কোটি কোটি সরীসৃপ সাবাড় করে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে অস্ট্রেলিয়ায় কিছু জায়গায় এখন বিড়ালদের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। সেখানে নিয়ম হলো, পোষা বিড়ালকে ২৪ ঘণ্টা ঘরের ভেতরেই রাখতে হবে, বাইরে ছাড়া যাবে না। অনেক জায়গায় বিড়ালদের জন্য বিশেষ খাঁচা-বারান্দা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা নিরাপদে থাকে কিন্তু অন্য প্রাণী শিকার করতে না পারে।
বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বেঁধে দেওয়াও একটা সমাধান হতে পারে। এতে শিকার করার সময় শব্দে অন্য প্রাণীরা সতর্ক হতে পারবে।
তবে প্রাকৃতিক কারণে বিড়াল এত এত প্রজাতি শিকার করে, সে দিকটাও আমাদের ভাবতে হবে।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স