বিশ্বের বিরলতম ডলফিন টিকিয়ে রাখতে এসেছে ডিজিটাল প্রতিকৃতি
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন এক সামুদ্রিক প্রাণীর অবিকল ডিজিটাল প্রতিকৃতি তৈরি করেছেন। ফলে প্রাণীটির কঙ্কালের প্রতিটি হাড়ের থ্রিডি গঠন এখন কম্পিউটারে নিখুঁতভাবে দেখা যাবে। মূলত বিলুপ্তির মুখে থাকা এক প্রজাতির ডলফিনকে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নতুন প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও প্রাণীটি বাঁচানোর উপায় খুঁজতে বিশেষভাবে সাহায্য করবে।
কাজটি করার জন্য স্ক্যানিং প্রযুক্তির নিখুঁত মাইক্রো সিটি স্ক্যান ও সাধারণ ফটোগ্রাফি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে একধরনের ছোট্ট ডলফিন ভাকিতার কঙ্কালের ডিজিটাল ক্লোন তৈরি করা হয়। ভাকিতা ডলফিন এখন শুধু মেক্সিকোর ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরের উত্তর দিকে টিকে আছে।
গবেষকেরা এই ডিজিটাল ছবিগুলো ইন্টারনেটে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। ফলে পৃথিবীর যেকোনো দেশের বিজ্ঞানীরা ঘরে বসে এই বিরল প্রাণীর পুরো কঙ্কালটি নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন। এতে জাদুঘরে থাকা আসল কঙ্কালটির একটুও ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকবে না। বর্তমানে পৃথিবীতে এই ডলফিনের আসল কঙ্কালের নমুনা আর মাত্র কয়েকটিই অক্ষত আছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির পিএইচডির শিক্ষার্থী জেমি নউব। তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত ভাকিতা ডলফিনকে বাঁচাতে ও এটি নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চাই। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এই তথ্যগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ও প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে জানার জন্য তথ্যের একটি বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে, যা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। শুধু একটি তথ্যভান্ডার থেকেই অনেক অজানা বিষয় শেখা সম্ভব।’
১৯৯৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, সাগরে প্রায় ৬০০টি ভাকিতা ডলফিন বেঁচে আছে। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা কমে এখন মাত্র ৭ থেকে ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে ভাকিতা ডলফিন আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।
এই ডলফিনের সংখ্যা এত দ্রুত কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চোর, শিকারি ও অবৈধ জেলেদের পেতে রাখা জাল। এই অ্যাঁরলেরা মূলত টোটোবা নামের একটি বড় মাছ ধরার জন্য সাগরে ফাঁদ পাতে। কারণ, ওই মাছের পটকা আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়। আর সেই জালে আটকা পড়ে বেঘোরে প্রাণ হারায় নিরীহ ভাকিতা ডলফিনগুলো।
ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি, স্যান ডিয়েগো ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, সিওয়ার্ল্ড ক্যালিফোর্নিয়া ও নোয়া ফিশারিজের একদল গবেষক এই প্রকল্প তৈরি করেছেন। তাঁরা ১৯৬৬ সালে সংগ্রহ করা একটি পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী ভাকিতার কঙ্কাল নিয়ে এই কাজ শুরু করেন।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মেরিন ম্যামাল সায়েন্স’–এ এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এতে হাসপাতালের সাধারণ সিটি স্ক্যানের পাশাপাশি মাইক্রোস্কোপিক সিটি ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি মানুষের একটি চুলের চেয়ে পাতলা বা ছোট গঠন নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। এরপর হাজার হাজার স্ক্যান করা ছবি একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে প্রতিটি হাড়ের থ্রিডি মডেল তৈরি করা হয়েছে।
এই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকেরা পুরো কঙ্কাল থেকে শুরু করে হাড়ের ভেতরের আণুবীক্ষণিক গঠন পর্যন্ত প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ের একটি বিস্তারিত মডেল তৈরি করতে পেরেছেন।
যেহেতু পৃথিবীতে ভাকিতার কঙ্কাল খুবই কম, তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে এগুলো দেখার সুযোগ নেই বললেই চলে। গবেষক জেমি নউব বলেন, এই ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে এখন জাদুঘরের প্রদর্শনী বা শ্রেণিকক্ষের জন্য হুবহু আসল কঙ্কালের মতো নকল প্রতিরূপ তৈরি করা যাবে। এতে অনেক বেশি মানুষ এই বিরল প্রাণী সম্পর্কে জানতে পারবে।
গত ১০ বছরে ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির ফলে বিভিন্ন জাদুঘরের সংগ্রহগুলোকে ডিজিটাল করার কাজ অনেক বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর দুর্লভ প্রাণীর নমুনাগুলো বিশ্বজুড়ে সব গবেষকের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে এই কাজ করছে। ফলে বিজ্ঞানীদের আর শুধু সাধারণ ছবির ওপর নির্ভর করতে হবে না কিংবা গবেষণার জন্য আসল ও সংবেদনশীল কঙ্কাল ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে বসে থাকতে হবে না।
ভাকিতা ডলফিনকে ১৯৫৮ সালে একটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই ডলফিনগুলো লম্বায় মাত্র ৫ ফুটের মতো হয়ে থাকে। ডলফিনগুলো তিমি ও ডলফিন পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য। এদের চোখ ও মুখের চারপাশে সুন্দর কালো দাগ থাকে, যা দেখে এদের খুব সহজেই চেনা যায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান