ইতিহাসের দীর্ঘতম ফ্লাইট, ২৯ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য যাত্রা
প্লেনে উঠলে, চা-কফি খেলে, গান শুনলে, ডুবলে মুভির জগতে। তারপর ঘুমিয়ে পড়লে। ঘুম থেকে উঠে আগের কাজগুলোই করলে আবার। কিন্তু প্লেন তখনো চলছে। এভাবেই কেটে গেল টানা ২৯ ঘণ্টা! ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার জন্ম দিয়েছে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস। তারা চালু করেছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ যাত্রীবাহী ফ্লাইট।
ঘটনাটা ঘটেছে সম্প্রতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস একটি বিশেষ ফ্লাইট চালু করেছে। চীনের সাংহাই থেকে ফ্লাইটটি যায় আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে। প্রায় ১৯ হাজার ৬৩১ কিলোমিটারের বিশাল পথ পাড়ি দেয় এই ফ্লাইট। পৃথিবীর পরিধির প্রায় অর্ধেকটাই অতিক্রম করে ফেলছে এক যাত্রায়! সাংহাই থেকে বুয়েনস এইরেস যেতে সময় লাগছে প্রায় ২৫ ঘণ্টার একটু বেশি। কিন্তু ফেরার পথে বাতাসের বিপরীতে যুদ্ধ করে ফিরতে সময় লেগে যাচ্ছে প্রায় ২৯ ঘণ্টা! এটি বর্তমানে দূরত্বের দিক থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এখানে একটা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্যাঁচ আছে। অনেকেই ভাবতে পারো, এটা টানা চীন থেকে আর্জেন্টিনায় উড়ে গেছে। ঠিক তা নয়। এই ফ্লাইটটিকে বলা হচ্ছে ডিরেক্ট ফ্লাইট, কিন্তু নন-স্টপ নয়। মানে প্লেনটি সাংহাই থেকে ওড়ার পর নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে একটা ছোট্ট বিরতি নেয়। মাত্র ২ ঘণ্টার এই বিরতিতে প্লেনটি তেল ভরে নেয়। পরিবর্তন করে ক্রু মেম্বার। কিন্তু যাত্রীদের প্লেন বদলাতে হয় না। একই সিটে বসে ভেতরেই অপেক্ষা করেন তাঁরা। তারপর নিউজিল্যান্ড থেকে তাঁরা আবার যাত্রা শুরু করেন আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের উদ্দেশে। যেহেতু ফ্লাইট নম্বর একই থাকে এবং প্লেন বদলাতে হয় না, তাই প্রযুক্তিগতভাবে একে ডিরেক্ট ফ্লাইট বলা হচ্ছে।
এত দিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ নন-স্টপ ফ্লাইটের মুকুট ছিল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের দখলে। তাদের সিঙ্গাপুর থেকে নিউইয়র্ক যাওয়ার ফ্লাইটটি টানা ১৯ ঘণ্টা আকাশে উড়ত। মাঝখানে কোনো বিরতিও ছিল না। চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস দূরত্বের দিক থেকে সেই রেকর্ড ভেঙে দিলেও একটানা ওড়ার রেকর্ড কিন্তু এখনো সিঙ্গাপুরের দখলেই আছে।
তবে সামনে আরও বড় চমক আসছে! অস্ট্রেলিয়ার কান্টাস এয়ারলাইনস নিয়ে আসছে প্রজেক্ট সানরাইজ। তাদের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সিডনি থেকে লন্ডন পর্যন্ত বিরতিহীন ফ্লাইট চালু করা। এই ফ্লাইটে যাত্রীরা আকাশে থাকা অবস্থাতেই দুইবার সূর্যোদয় দেখার সুযোগ পাবেন! টানা ২০-২২ ঘণ্টা আকাশে ওড়ার সেই অভিজ্ঞতার জন্য বিশেষ এয়ারবাস এ৩৫০ তৈরি করছে কান্টাস এয়ারলাইনস। এই প্লেনে যাত্রীদের হাঁটাচলা এমনকি ব্যায়াম করার জায়গাও থাকবে।
তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এত কষ্ট করে ২৯ ঘণ্টা জার্নি করার মানে কী? আসলে চীন এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। আর্জেন্টিনায় প্রায় ৫৫ হাজারের বেশি চীনা নাগরিক বাস করে। এত দিন তাঁদের দেশে ফিরতে হলে ইউরোপ বা আমেরিকা হয়ে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় নষ্ট করতে হতো। এই নতুন রুটটি সেই কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এখানে সময়ের পার্থক্য কিন্তু বেশি নয়। সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা হয়তো বাঁচবে যাত্রীদের। কিন্তু আগে একটার পর একটা প্লেন পরিবর্তন করতে হতো, অপেক্ষা করতে হতো অনেক সময়। এখন যেহেতু একই প্লেনে আসবে, তাই বাড়তি ঝুঁকি থাকবে না।
এখন আসি আসল কথায়, টিকেটের দাম কত? সাংহাই থেকে একমুখী যাত্রার জন্য ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া শুরু হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ইউরো থেকে। আর তুমি যদি বিজনেস ক্লাসে আয়েশ করে যেতে চাও, তবে গুনতে হবে ৪ হাজার ইউরোর বেশি! টাকার হিসাবে ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার এবং বিজনেস ক্লাসের প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
সূত্র: দ্য উইক জুনিয়র ম্যাগাজিন, সিম্পল ফ্লাইং ও সিনহুয়া নেট ডটকম