জিব্রাল্টারের বানরগুলো কেন মাটি খায়
স্পেনের দক্ষিণে ব্রিটিশদের একটি এলাকা জিব্রাল্টার। বিশাল পাহাড় বা শিলার জন্য পরিচিত জায়গাটি। এই পাহাড়ে বসবাস করে বারবারি ম্যাকাক প্রজাতির বানর। তবে এরা ইদানীং এক অদ্ভুত কাজ করছে। নিয়মিত মাটি খাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় এই বানরদের পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া চিপস, চকলেট বা আইসক্রিমের মতো অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পর পেট ঠিক রাখতেই এরা এমনটা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বানর পর্যটকদের দেওয়া প্রক্রিয়াজাত খাবার; অর্থাৎ জাংক ফুড বেশি খায়, ওদের মধ্যেই মাটি খাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞানের ভাষায়, এই মাটি খাওয়ার বিষয়টিকে বলা হয় ‘জিওফ্যাজি’। তবে জিব্রাল্টারের যেসব বানর পর্যটকদের থেকে দূরে নির্জনে থাকে, ওদের কিন্তু কখনোই মাটি খেতে দেখা যায় না।
বর্তমানে জিব্রাল্টারে প্রায় ২৩০টি বানর রয়েছে। যদিও স্থানীয় প্রশাসন এদের প্রতিদিন নিয়ম করে টাটকা ফল ও সবজি খেতে দেয়। তবু পর্যটকেরা এদের চিপস বা বিস্কুট–জাতীয় খাবার দিয়ে থাকে। বানরও কিছু লোভী। এসব খাবার দেখলে মাথা ঠিক থাকে না, ঠিক আমাদের মতো। কিন্তু এসব খাবার বানরদের হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পাহাড়ের এই বিশেষ মাটি বানরদের পাকস্থলীতে একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিষক্রিয়া থেকে এদের পেটকে রক্ষা করে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডাক্তার সিলভাইন লেমোইন এই অদ্ভুত আচরণের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমাদের মতো বানরদের পেটেও অসংখ্য উপকারী অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা খাবার হজমে সাহায্য করে। কিন্তু পর্যটকদের দেওয়া অতিরিক্ত চর্বি, লবণ আর চিনিযুক্ত খাবার এই অণুজীবদের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ঠিক এই কারণেই বানররা মাটি খায়। কারণ, মাটির খনিজ ও ব্যাকটেরিয়া এদের পেটের ভেতরের পরিবেশ আবার স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জিব্রাল্টারের বানররা যা খেয়েছে, তার প্রায় ২০ শতাংশই ছিল পর্যটকদের দেওয়া জাংক ফুড। বিশেষ করে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা বানররা, যারা পর্যটকদের খুব কাছাকাছি থাকে, এরা অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি জাংক ফুড খায়। ফলে এদের মাটিও সবচেয়ে বেশি খাওয়া লাগে।
পর্যটকেরা বানরদের চিপস, চকলেট, বিস্কুট—এমনকি কোকা-কোলা বা আইসক্রিমও দিয়ে থাকেন। গবেষক লেমোইন জানান, বানররা ম্যাগনাম বা করনেটো আইসক্রিম খুব পছন্দ করে। কিন্তু এরা সরবেট বা বরফজাতীয় মিষ্টি খাবার তেমন একটা পছন্দ করে না। ৪৪টি বানরকে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, অনেক সময় আইসক্রিম বা বিস্কুট খাওয়ার ঠিক পরপরই এরা মাটি খেতে শুরু করে। আবার শীতকালে যখন পর্যটকের ভিড় কমে যায়, তখন এদের জাংক ফুড খাওয়ার পরিমাণ ৪০ শতাংশ ও মাটি খাওয়ার পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমে আসে।
বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বানররা একে অপরের থেকে এই মাটি খাওয়ার অভ্যাস শেখে। জিব্রাল্টারের বেশির ভাগ বানরই সাধারণত ‘টেরা রোসা’ বা লাল কাদামাটি খেতে পছন্দ করে। তবে একেকটি দল একেক ধরনের মাটি বেছে নেয়। পশ্চিমের ঢালে থাকা একটি দল আবার রাস্তার গর্তের আলকাতরা মেশানো মাটি খেতে বেশি পছন্দ করে।
পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ খনিজ উপাদানের অভাব মেটাতে মাটি খান। এরা শরীরে খনিজের অভাব মেটাতে মাটি খায় এমন না। পেটকে সুস্থ রাখতেই মাটি খায়।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই অভ্যাস আসলে এদের একধরনের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল। তবে এটি এদের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। কারণ, ব্যস্ত রাস্তার ধারের এই মাটিতে যানবাহনের ধোঁয়া ও বিষাক্ত বর্জ্য মিশে থাকার সম্ভাবনা থাকে। টেক্সাস ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ পলা পেবসওয়ার্থের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার বেবুন বা জাপানের আরাশিয়ামা মাঙ্কি পার্কের বানরদের মধ্যেও এমন আচরণ দেখা গেছে। তবে মাটি খেয়ে পেটের সমস্যা মেটানোর চেয়ে বানরদের মানুষের তৈরি খাবার দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করাই হলো সবচেয়ে ভালো সমাধান।