বেশি বই পড়লেই কি মানুষ মেধাবী হয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন বই পড়াও যেন একটা প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। গুডরিডস চ্যালেঞ্জ বা বুকস্টাগ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায়, বছরে ১০০ কিংবা ১ হাজার বই পড়ার লক্ষ্য নিয়ে অনেকেই দৌড়াচ্ছেন। সুন্দর করে বই সাজিয়ে ছবি তোলা, পাশে কফির মগ ও আকর্ষণীয় সব কোটেশন শেয়ার করাই যেন এখনকার ট্রেন্ড। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যে হাজার হাজার পৃষ্ঠা ওলটানো হচ্ছে, তার কতটুকু আসলে মস্তিষ্কে স্থায়ী হচ্ছে? নাকি পুরো ব্যাপারটাই নিছক সংখ্যার খেলা?

অনেকেই জীবনের কঠিন সময় কাটাতে বইয়ের জগতে আশ্রয় নেন। একটার পর একটা বই শেষ করে আত্মতৃপ্তি পান এই ভেবে যে, তাঁরা খুব অর্থবহ কিছু করছেন। কিন্তু দিন শেষে দেখা যায়, এটি শেখার চেয়ে বরং সংখ্যা বাড়ানোর নেশাই বেশি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সামনে একটি সহজ, কিন্তু ভুল সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে। আমরা মনে করছি, বইয়ের সংখ্যা = ব্যক্তিগত প্রবৃদ্ধি, পড়ার গতি = বুদ্ধিমত্তা। মানে, বই পড়ার সংখ্যা যত বাড়বে, আমরা তত মেধাবী হব এবং বছরে হাজারটা বই পড়া মানে বেশি বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

আরও পড়ুন
অনেকেই জীবনের কঠিন সময় কাটাতে বইয়ের জগতে আশ্রয় নেন। একটার পর একটা বই শেষ করে আত্মতৃপ্তি পান এই ভেবে যে, তাঁরা খুব অর্থবহ কিছু করছেন।

সকালের রুটিনে ১৭টি ধাপ থাকা বা বাথরুমে যাওয়ার সময়টাও কাজে লাগানো, এমনই এক হাইপার ইফিশিয়েন্ট ফ্যান্টাসিতে আমরা বাস করছি। এই ফ্যান্টাসির অংশ হিসেবেই দ্রুত ও বেশি বই পড়াকে স্মার্টনেসের লক্ষণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, দ্রুত পড়ার চক্করে পড়ে পাঠক আসলে কিছুই শিখছেন না। তাঁরা পড়ছেন না; বরং তথ্য গিলছেন। এতে সাময়িকভাবে নিজেকে জ্ঞানী মনে হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্কের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয় না। সত্যিকার পড়া সেটাই, যা পাঠকের ভেতরে কোনো পরিবর্তন আনে। হোক তা দৃষ্টিভঙ্গির বদল, কোনো বিশ্বাসের পরিবর্তন কিংবা নতুন কোনো চিন্তার জন্ম। যদি পড়ার পর মনের ভেতর কোনো ‘আহা মোমেন্ট’ বা নতুন বোধোদয় না ঘটে, তবে সেই পড়ার সময়টুকুই অপচয়।

জনপ্রিয় ‘মেক ইট স্টিক’ বইয়ে একটি চমৎকার কথা আছে, ‘শেখা তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তা কষ্টসাধ্য হয়। যা সহজে শেখা যায়, তা বালুতে লেখার মতো—আজ আছে, কাল নেই।’

আরও পড়ুন
এতে সাময়িকভাবে নিজেকে জ্ঞানী মনে হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্কের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয় না। সত্যিকার পড়া সেটাই, যা পাঠকের ভেতরে কোনো পরিবর্তন আনে।

পড়া ও বোঝার প্রক্রিয়াটি একটি শিল্প। এটি কোনো ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁর খাবার নয় যে তাড়াহুড়া করে গিলে খেয়ে ফেললাম; বরং এটি একটি সুস্বাদু খাবারের মতো, যার স্বাদ ধীরে ধীরে নিতে হয়। রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার অনেকক্ষণ পরও যে স্বাদ মুখে লেগে থাকে।

অথচ স্পিড রিডিংয়ের নামে আমরা ঠিক উল্টোটা করছি। জঘন্য কোনো হোটেলের ব্রেকফাস্ট যেভাবে মানুষ তাড়াহুড়ায় শেষ করে শুধু পেট ভরানোর জন্য, বইও সেভাবে শেষ করা হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের কথায় প্রভাবিত হয়ে এমন সব বই পড়ার চেষ্টা করা, যার প্রতি পাঠকের হয়তো কোনো আগ্রহই নেই। অর্ধেক পড়ে রেখে দিলে লোকে কী বলবে, এই ভয়ে জোর করে বই শেষ করার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। যেন বই মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া মানে জীবন থেকেই পালিয়ে যাওয়া!

দ্রুত পড়ার কৌশলগুলোর জন্ম হয়েছিল ভালো উদ্দেশ্যেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একে একটি প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে। ফিকশন বা গল্পের বই কি কখনো দ্রুত পড়ে উপভোগ করা সম্ভব? এটি অনেকটা দ্বিগুণ গতিতে মুভি বা ভিডিও দেখার মতো। গল্পটা জানা হলো, কিন্তু অনুভূতিটা পাওয়া গেল না। তার চেয়ে গুগলে সামারি পড়ে নেওয়াই ভালো!

আরও পড়ুন
সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের কথায় প্রভাবিত হয়ে এমন সব বই পড়ার চেষ্টা করা, যার প্রতি পাঠকের হয়তো কোনো আগ্রহই নেই।

তবে কখনোই যে দ্রুত পড়া যাবে না, এমন নয়। ধরো, তুমি বইটি পড়বে কি, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটু পড়ে দেখতে চাও। তখন চাইলে দ্রুত পড়তে পারো বইয়ের বিষয়বস্তু বা ভাষা বোঝার জন্য। অর্থাৎ একটি বই আদৌ পড়ার যোগ্য কি না, তা যাচাই করার জন্য দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেওয়া আরকি। কারণ, বেশির ভাগ বই পুরোনো ধারণাগুলোকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করে। একই কথা বারবার পড়ার কোনো মানে নেই।

আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকর স্মৃতির একটি সীমা আছে। যখন খুব দ্রুত অনেক তথ্য মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো হয়, মস্তিষ্ক তা প্রক্রিয়া করতে পারে না। মিলার্স ল অনুযায়ী, ‘আমাদের ওয়ার্কিং মেমোরি একবারে ৭ থেকে ৯টি তথ্য ধারণ করতে পারে। আধুনিক গবেষণা বলছে, এ সংখ্যাটি আরও কম, প্রায় চারটির মতো।’

তাই কেউ খুব দ্রুত পড়েন, তিনি মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি তথ্য জোর করে ঢোকানোর চেষ্টা করেন। ফলে কিছুই মনে থাকে না। তথ্যগুলোও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে জমা হতে পারে না।

বর্তমানে কতগুলো বই শেষ করেছ, তা একটি লোকদেখানো সংখ্যামাত্র। এতে মন না দিয়ে পড়ে যাওয়া উচিত। মাসে ২০টি বই পড়তেই হবে, এমন ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই; বরং মাসে চার থেকে পাঁচটি বই পড়ো, কিন্তু তা ভালোভাবে। শুধু পড়ার জন্য পড়া নয়, নিজের তৃপ্তির জন্য পড়ো, জানার জন্য পড়ো।

আরও পড়ুন
সৃজনশীলতা হলো বিদ্যমান জ্ঞানের ব্লকগুলোকে নতুনভাবে সাজিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান করা। ‘মেক ইট স্টিক’ বইয়ে যেমন বলা হয়েছে, ‘উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা, আর সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজন মৌলিক জ্ঞানের ভিত্তি।’

পড়া হতে হবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সব বই সবার জন্য নয় এবং সব বই জীবনের সব সময়ের জন্যও নয়। কিছু বই তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন পাঠকের সেই নির্দিষ্ট তথ্যের প্রয়োজন হয়। অন্য সময় সেই একই বই অন্তঃসারশূন্য মনে হতে পারে। তাই ট্রেন্ডিং বইয়ের পেছনে না ছুটে নিজের মনের প্রশ্ন বা কৌতূহলের উত্তর খুঁজতে বই নির্বাচন করা উচিত।

উদ্দেশ্য নিয়ে ধীরে ধীরে পড়ার মধ্যেই আসল আনন্দ। যখন কেউ নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পড়েন, তখন তিনি হয়তো একসঙ্গে চার থেকে পাঁচটি বই ঘাঁটাঘাঁটি করেন। এতে বিভিন্ন বইয়ের ধারণার মধ্যে কানেকশন তৈরি হয়। এক লেখকের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে না থেকে একই বিষয়ে একাধিক লেখকের মতামতের ফলে বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়। জ্ঞান অর্জিত হয় কানেকশনের মাধ্যমে, অতিরিক্ত তথ্য গিলে নয়।

সৃজনশীলতা মানে আকাশ থেকে পড়া কোনো জাদুকরি কিছু নয়। সৃজনশীলতা হলো বিদ্যমান জ্ঞানের ব্লকগুলোকে নতুনভাবে সাজিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান করা। ‘মেক ইট স্টিক’ বইয়ে যেমন বলা হয়েছে, ‘উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা, আর সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজন মৌলিক জ্ঞানের ভিত্তি।’

যখন কেউ উদ্দেশ্য নিয়ে ধীরস্থিরভাবে পড়েন, তখন বইগুলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। হয়তো মনোবিজ্ঞানের কোনো একটি ধারণা ইতিহাসের কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে দেয়। এই সংযোগগুলো জোর করে তৈরি করতে হয় না, গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লে তা এমনিতেই ঘটে।

তাই বই পড়ার ক্ষেত্রে বিল গেটস বা ওয়ারেন বাফেট কী সুপারিশ করলেন, তা জরুরি নয়। জরুরি হলো বইটি আপনার চিন্তার জগতে কোনো পরিবর্তন আনছে কি না। পড়ার উদ্দেশ্য বই শেষ করা নয়; বরং নিজের কৌতূহল মেটানো। যদি কোনো বই আপনার চিন্তার গভীরতা না বাড়ায় বা মস্তিষ্কে নতুন কোনো সংযোগ তৈরি না করে, তবে আপনি সেটি কত দ্রুত শেষ করলেন বা কত লোক সেটির প্রশংসা করলেন, তা অর্থহীন।

আরও পড়ুন