পৃথিবীর ১৮টি বৃহত্তম বদ্বীপ ডুবে যাচ্ছে কেন
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে ধীরে ধীরে বাড়ছে, তা আমরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, কিছু অঞ্চলের জন্য বিপদটা আরও গভীর। যেমন দক্ষিণ এশিয়ার গাঙ্গেয় বদ্বীপ, যেখানে বাংলাদেশ অবস্থিত। এখানে ঝুঁকি শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে নয়, একই সঙ্গে বদ্বীপের ভূমিও নিচে দেবে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ভূমি দেবে যাওয়ার হার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
নতুন গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ৪০টি নদী বদ্বীপের মধ্যে ১৮টিতে ভূমি দেবে যাওয়ার হার বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির গড় হারকে অতিক্রম করেছে। এই তালিকায় রয়েছে নাইল বা নীল নদ, আমাজন, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ও মিসিসিপি বদ্বীপ। এগুলো মানবসভ্যতার জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে জড়িত।
বিশ্বের অনেক বদ্বীপ অঞ্চলে এখন ভূমি হারানো, উপকূলীয় বন্যা ও লবণাক্ত পানির আগ্রাসনের প্রধান কারণ শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূমি বসে যাওয়ার সমস্যা, যা ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত। এটি বিশ্বের উর্বরতম অঞ্চলগুলোর একটি। তাই একে অনেকেই ‘গ্রিন ডেল্টা’ বা সবুজ বদ্বীপ বলে থাকেন। পশ্চিমে হুগলী নদী থেকে পূর্বে মেঘনা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই বদ্বীপে কোটি কোটি মানুষ বাস করে।
বদ্বীপগুলো কেন ডুবছে
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূপদার্থবিদ্যা ও রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ মানুচেহর শিরজাই ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টি বড় বদ্বীপের ভূমি উচ্চতার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন। এই স্যাটেলাইট ভূমির উচ্চতা কমে যাওয়া, পলি জমা, ক্ষয়সহ সবকিছুই নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে।
তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪০টির মধ্যে ১৮টি বদ্বীপে গড় বার্ষিক ভূমি দেবে যাওয়ার হার বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বর্তমান গড় হারের চেয়ে বেশি। প্রতিবছর প্রায় ৪ মিলিমিটার। এরিও গ্রান্ডে বদ্বীপ ছাড়া প্রায় সব বদ্বীপেই অন্তত কিছু অংশ এমন গতিতে নিচে নামছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে।
৩৮টি বদ্বীপে গবেষণা সময়কালে মোট এলাকার ৫০ শতাংশের বেশি অংশ ভূমি দেবে যাওয়ার শিকার হয়েছে। আর ১৯টি বদ্বীপে ৯০ শতাংশের বেশি এলাকায় এ সমস্যা দেখা গেছে, যার মধ্যে মিসিসিপি, নীল নদ ও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ রয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা থাইল্যান্ডের চাও ফ্রায়া, ইন্দোনেশিয়ার ব্রান্তাস এবং চীনের ইয়েলো রিভার বদ্বীপে। এসব এলাকায় ভূমি প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৮ মিলিমিটার নিচে নামছে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ।
মানুষের তৈরি বিপদ
গবেষণাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে এই ভূমি দেবে যাওয়ার প্রধান কারণ প্রাকৃতিক নয়, মানুষের কর্মকাণ্ডই এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন বদ্বীপ ডোবার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
শহর, কৃষি ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ পানি মাটির নিচ থেকে তুলে নেওয়া হয়। এতে মাটির নিচের স্তর সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং ভূমি ধীরে ধীরে দেবে যায়। বড় শহরগুলোয় এ সমস্যা আরও তীব্র। কোটি কোটি মানুষের বসবাস, ভারী ভবন, সড়ক ও অবকাঠামোর চাপ মাটির ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে। গবেষকেরা একে বদ্বীপের ওপর ‘ডাবল বার্ডেন’ বা দ্বিমুখী চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, অন্যদিকে ভূমি নিজেই নিচে নামছে।
পলির অভাবও বড় কারণ
বদ্বীপ টিকে থাকার জন্য নদীর বয়ে আনা পলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পলি জমে জমে ভূমিকে উঁচু করে, যা ভূমি বসে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা হলেও সামাল দেয়। কিন্তু বাঁধ, ড্যাম ও নদী নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের কারণে এখন অনেক নদী আগের মতো পলি বহন করে সাগরে পৌঁছাতে পারছে না।
মিসিসিপি নদীর উদাহরণ এখানে উল্লেখযোগ্য। ১৯৩২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়েছে এই বদ্বীপ। নদীতীরের বাঁধ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ ও পলি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই ক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে
বিশ্বজুড়ে ৩৫ থেকে ৫০ কোটি মানুষ নদী বদ্বীপে বসবাস করে। পৃথিবীর ৩৪টি মেগাসিটির মধ্যে অন্তত ১০টি গড়ে উঠেছে এসব বদ্বীপ অঞ্চলে। বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশ এই ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। গবেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব বদ্বীপ সবচেয়ে দ্রুত ডুবছে, সেগুলোর বেশির ভাগই এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে বিপর্যয় মোকাবিলার আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলনামূলক কম।
তবে এই গবেষণা শুধু সতর্কবার্তাই নয়, কিছু আশার কথাও শোনাচ্ছে। যেহেতু ভূমি বসে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো মানুষের তৈরি, তাই সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো, বন্যার পানি বা পরিশোধিত বর্জ্যপানি দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আবার পূরণ করা, নিয়ন্ত্রিত বন্যা ও পলিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বদ্বীপ ডোবার গতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়া গেলে দীর্ঘ মেয়াদে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও বসতভূমি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স