এআই সাইকোসিস কী, এটা কীভাবে মরণফাঁদ হয়ে উঠছে
হাতের স্মার্টফোনটি কি তোমার অজান্তেই তোমার মনের দখল নিচ্ছে? চ্যাটজিপিটির নিরীহ উত্তরের আড়ালে কি লুকিয়ে আছে কোনো মনস্তাত্ত্বিক মরণফাঁদ। তোমার মন কি এখনো তোমার নিয়ন্ত্রণে, নাকি অ্যালগরিদমের ইশারায় চলছে?
চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাই এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। একাকিত্বের সময় গল্প করা থেকে শুরু করে কঠিন অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করে দিচ্ছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কথা বলে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। কিন্তু এই মিষ্টি কথার আড়ালে কি লুকিয়ে আছে কোনো ভয়ংকর বিপদ? মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা খুব কঠিন এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছেন। এআই যে মানুষের মতো কথা বলছে, আবেগ দেখাচ্ছে; এটা কি দুর্বল মানসিকতার মানুষদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে? তাদের কি মানসিক বিকারগ্রস্ত হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষেরা চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলার পর তাদের সমস্যা আরও বেড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা একে বলছেন এআই সাইকোসিস।
এআই সাইকোসিস কী
প্রথমেই বলে রাখি, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ, এটি এখনো কোনো ডাক্তারি বইয়ের স্বীকৃত রোগের নাম নয়। তবে চিকিৎসকেরা এই শব্দটা ব্যবহার করছেন এমন কিছু মানসিক অবস্থাকে বোঝাতে, যেখানে রোগীর মতিভ্রম বা উল্টোপাল্টা চিন্তাগুলো এআইয়ের সঙ্গে কথা বলার কারণে আরও তীব্র হয়ে উঠছে। সাইকোসিস হলো এমন এক অবস্থা, যখন মানুষ বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা এমন কিছু দেখে বা শোনে, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের চিন্তাভাবনা এলোমেলো হয়ে যায়। আগেকার দিনে মানসিক রোগীরা ভাবত, রেডিওর মাধ্যমে সরকার তাদের ওপর নজরদারি করছে। যুগ পাল্টেছে, তাই এখন তাদের পাল্টেছে ডিলিউশন। এখন তারা ভাবছে এআই জীবন্ত, এআই তাদের মনের কথা পড়ে ফেলছে, কিংবা এআইয়ের সঙ্গে মিলে তারা কোনো গোপন মিশনে আছে!
মূল সমস্যাটা হলো চ্যাটবটগুলোকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে যে ওগুলো খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে উত্তর দেয় ও ব্যবহারকারীর কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। ধরো, একজন মানুষ মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। তিনি বিশ্বাস করেন যে কেউ তাঁকে মারার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি যদি চ্যাটবটকে বলেন, ‘আমার মনে হয় কেউ আমাকে ফলো করছে’, চ্যাটবট হয়তো সহমর্মিতা দেখিয়ে বলবে, ‘এটা তো খুব ভয়ের ব্যাপার! তোমার সাবধানে থাকা উচিত।’ সাধারণ মানুষের জন্য এই উত্তরটা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মানসিক রোগীর জন্য এটা মারাত্মক! সে ভাববে, ‘আরে, যন্ত্রও বুঝতে পারছে আমি ঠিক! তার মানে সত্যিই আমাকে কেউ মারতে চায়।’ এআইয়ের এই স্বীকৃতি রোগীর অসুস্থতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সে বাস্তব আর কল্পনার পার্থক্য গুলিয়ে ফেলে।
একাকিত্ব মানুষকে মানসিক রোগের দিকে ঠেলে দেয়। চ্যাটবট হয়তো সাময়িকভাবে একাকিত্ব দূর করে, কিন্তু এটি সত্যিকারের মানুষের বিকল্প হতে পারে না। যারা সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, তারা যদি সারা দিন মেশিনের সঙ্গে কথা বলে, তবে তারা বাস্তব জগৎ থেকে আরও দূরে সরে যায়।
গবেষণা কী বলছে
গবেষণা বলছে, এআই নিজে থেকে কাউকে এমন বানাতে পারে না। মানসিক রোগ হওয়ার পেছনে জিনগত সমস্যা, ছোটবেলার ট্রমাসহ থাকে নানা কারণ। কিন্তু যাদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি আগে থেকেই আছে, তাদের জন্য আগুনে ঘি ঢালছে এআই। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম যেমন মানুষকে উগ্র বানিয়ে দেয়, চ্যাটবটও তেমনি ভুল ধারণাগুলোকে উসকে দিতে পারে। আরও ভয়ের ব্যাপার হলো, এআই ডেভেলপারেরা আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলো আটকাতে পারলেও, এ ধরনের মানসিক সমস্যা আটকানোর মতো প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি তৈরি করতে পারেননি।
বাঁচার উপায় কী
এআই আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাবে না, এটা মেনে নিতেই হবে। তাই চিকিৎসকদের মতে, এখন সময় এসেছে এআই ডিজাইনের সময় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার। চিকিৎসকেরা আগে যেমন জিজ্ঞেস করতেন, ‘আপনি কি কোনো মাদক গ্রহণ করেন?’, এখন জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আপনি কি কোনো চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলেন?’ আর ডেভেলপারদের এমন সিস্টেম তৈরি করতে হবে যাতে কেউ উল্টোপাল্টা বা বিভ্রান্তিকর কথা বললে এআই তাকে সায় না দিয়ে বরং মানসিক সাহায্যের পরামর্শ দেয়।
সাইকোসিস বা মানসিক সমস্যা সব যুগেই সেই সময়কার প্রযুক্তির ওপর ভর করে রূপ বদলায়। এআই বর্তমান যুগের সমস্যা। আমাদের দায়িত্ব হলো খেয়াল রাখা, যাতে এই ‘সমস্যা’ দুর্বল মনের মানুষদের বাস্তবতাকে বিকৃত করতে না পারে। আমরা যেন প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে না পড়ি। প্রযুক্তির কাজ জীবন সহজ করা, বাস্তবতাকে কেড়ে নেওয়া নয়।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট