দক্ষিণ চীন সাগরে মিলল উল্টা সাঁতার কাটা অদ্ভুত মাছ

গভীর সাগরে অদ্ভুত সব প্রাণী বাস করে। দেখতে অদ্ভুত গবলিন শার্ক, ভ্যাম্পায়ার স্কুইডের মতো রহস্যময় সব প্রাণী সাগরে সাঁতার কাটে। তবে এবার গবেষকেরা খোঁজ পেয়েছেন অদ্ভুত এক মাছের। এটি পেছন দিকে হাঁটে। প্রথমবারের মতো চীনের একদল বিজ্ঞানী সাগরের তলদেশে একটি চিংড়ির মতো মাছের পেছনের দিকে হাঁটার ভিডিও করেছেন।

মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম স্কেলিকাস এনজাইসেরোস (Scalicus engyceros)। এরা মূলত ‘আর্মার্ড সি-রোবিন’ প্রজাতির মাছ। এরা এদের অদ্ভুত শরীরের গঠনের জন্য পরিচিত। এদের পুরো শরীর শক্ত হাড়ের তৈরি প্লেট বা বর্ম দিয়ে ঢাকা থাকে। আর বুকের দিকে থাকা শক্ত পাখনাগুলো দেখতে একদম ছোট ছোট পায়ের মতো। এই বিশেষ শক্ত পাখনাগুলোকে হাত-পায়ের মতো ব্যবহার করে এরা সাগরের তলদেশে হাঁটতে পারে।

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স (AAAS) থেকে প্রকাশিত গবেষণা সাময়িকী ওশান-ল্যান্ড-অ্যাটমোস্ফিয়ার রিসার্চে এই মাছকে নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। নতুন এই গবেষণা সমুদ্রের তলদেশে মাছের হেঁটে চলার ভিডিও প্রমাণ সামনে এনেছে। শুধু তাই নয়, ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে কোনো মাছের পেছনের দিকে হেঁটে চলার বৈজ্ঞানিক বিবরণ পাওয়া গেল।

আরও পড়ুন

চীনের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হান তিয়ান এই অদ্ভুত প্রাণীটির কথা প্রথম সবাইকে জানান। তিনি বলেন, গভীর সাগরে বসবাসকারী স্কেলিকাস এনজাইসেরোস নামে এই মাছের বুকের কাছে বেশ ভিন্ন ধরনের পাখনা রয়েছে। সাগরের অন্য সাধারণ মাছের মতো এদের পাখনাগুলো কিন্তু শুধুই সাঁতার কাটার কাজে ব্যবহৃত হয় না। বরং এদের পাখনাগুলো আলাদা আলাদাভাবে পায়ের আঙুলের মতো ছড়ানো থাকে। এই বিশেষ মুক্ত পাখনার ওপর ভর দিয়েই মাছটি সাগরের একেবারে তলদেশে হেঁটে বেড়ায়। পৃথিবীতে যেসব প্রজাতির মাছ পানির নিচে হাঁটাচলা করতে পারে, এদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। আর এই মাছটি সেই বিরল তালিকারই একটি নতুন সদস্য।

উত্তর–দক্ষিণ চীন সাগরের বহু গভীরে গবেষণার জন্য একটি আধুনিক ডুবোযান পাঠানো হয়। এর শক্তিশালী ক্যামেরায় হঠাৎ এই বিরল দৃশ্যটি ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীদের দল এই ভিডিও ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে মাছটির শরীরে আরও বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের খোঁজ পেয়েছেন।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এদের মুখের দিকটি। এই মাছের মাথার সামনে একটি চ্যাপটা অংশ বা শুঁড় বের হয়ে রয়েছে, যা দেখতে কোদালের মতো। মুখটা এমন বিদঘুটে আকৃতির হওয়ার কারণে সাগরের নরম মাটিতে হেঁটে যেতে মাছটির হয়তো একটু সমস্যা হয় বা কষ্ট করতে হয়। তবে এই কোদালের মতো মুখটিই কিন্তু এদের টিকে থাকার আসল হাতিয়ার। সাগরের তলদেশের থকথকে কাদা আর বালুর নিচে যেসব ছোট ছোট পোকা বা খাবার থাকে, সেগুলোকে খুঁচিয়ে বের করতে কিংবা সহজে শিকার ধরতে এই শুঁড় মাছটিকে দারুণভাবে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন

গভীর সমুদ্রের অন্যান্য প্রাণীর মতোই এই মাছের চোখ দুটো বেশ বড়। গবেষণাকালে দেখা যায়, কাছে আসা ডুবোযানটিকে দেখে মাছটি শুরুতে কোনো নড়াচড়া করেনি। তবে ডুবোযানের তীব্র আলো চোখে পড়ার পরপরই মাছটি সাঁতরে সরে যায়। এতে বোঝা যায়, অতি গভীর কালো পানিতে থাকলেও এর চোখ আলোর প্রতি সংবেদনশীল। গবেষকদের ধারণা, মাছটি হয়তো খুব বেশি দিন আগে গভীর সমুদ্রের এই পরিবেশটিতে বসবাস শুরু করেনি।

রহস্যময় এই মাছ সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু জানা বাকি। তবে উন্নত প্রযুক্তির কারণে সাগরের তলদেশের জীবনের নানা নতুন রহস্য এখন বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে।

গবেষণা হান তিয়ান জানান, আধুনিক ডুবোযানের সাহায্যে সাগরের গভীরে গিয়ে সরাসরি জীবন্ত প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। আগে ল্যাবরেটরিতে শুধু মৃত বা সংরক্ষিত নমুনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে গবেষণা করতে হতো। কিন্তু এখন প্রাকৃতিক পরিবেশেই প্রাণীদের জীবন্ত দেখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গভীর সাগরের প্রাণীরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে সময়ের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিয়েছে, তা এখন অনেক স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স
আরও পড়ুন