নিঃসঙ্গ বানরছানা পাঞ্চের মতো যেসব প্রাণী খেলনার সঙ্গে বড় হচ্ছে
ইন্টারনেটে ভাইরাল জাপানের ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানার বানরছানা পাঞ্চ। আছে লাখ লাখ ভক্ত। বিশ্বজুড়ে যার তুমুল জনপ্রিয়তা। তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনের গল্পটি মোটেও আনন্দের নয়; বরং খানিকটা আবেগের। ভাইরাল হওয়া রিলসে দেখা যায়, ছোট্ট পাঞ্চ সারাক্ষণ একটি খেলনা পুতুল শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দৃশ্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর সারা বিশ্বের মানুষ বানরটির মানসিক অবস্থা নিয়ে আগ্রহ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে।
বর্তমানে চিড়িয়াখানার কর্মীরা জানিয়েছেন, পাঞ্চ এখন আগের চেয়ে ভালো আছে। পাঞ্চের মতো এমন অনেক এতিম বা উদ্ধার করা বন্য প্রাণী আছে, যারা খেলনাকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। উদ্ধার করা শিম্পাঞ্জি, পেঙ্গুইন, হাতি কিংবা পাহাড়ি সিংহের মতো প্রাণীগুলোও একা থাকলে খেলনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। মূলত নিজেদের একাকিত্ব দূর করতেই এরা এই খেলনাগুলো আঁকড়ে ধরে থাকে।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজি ও ইভোলিউশনারি বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক মার্ক বেকফ এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানান, নবজাতক স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো অন্য কারও স্পর্শে নিরাপদ বোধ করে। উদ্ধার করা অনাথ বন্য প্রাণীগুলো যখন এদের পরিবারকে পায় না, তখন এরা এই নরম খেলনাগুলোর সংস্পর্শে শান্তি ও নিরাপত্তা খুঁজে পায়। এমন শুধু ছোট ছানার ক্ষেত্রে হয় না, কিছু প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণীর মধ্যেও নিরাপত্তা ও সঙ্গীর অভাব দূর করতে খেলনার প্রতি এমন আগ্রহ দেখা যায়। এসব খেলনা প্রাণীগুলোর মনে একধরনের আনন্দ তৈরি করে ও এদের মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।
আমরা তো শুধু পাঞ্চের কথা জানি। কিন্তু পাঞ্চ ছাড়াও এমন আরও প্রাণী আছে, যারা পুতুলকে পরিবার ভেবে বড় হচ্ছে ও হয়েছে। চলো সেসব প্রাণীর কথা জেনে নেওয়া যাক।
শিম্পাঞ্জি লিজি
২০২১ সালে জর্জিয়ার একটি অভয়ারণ্যে আনা হয় ৩৫ বছর বয়সী শিম্পাঞ্জি লিজিকে। সেখানে অনেক খেলনা থাকলেও লিজির পছন্দ শুধু একটি সবুজ রঙের গ্রিঞ্চ পুতুল। সে সারাক্ষণ পুতুলটি নিজের কাছে রাখে। এমনকি বনে ঘোরাঘুরি বা ঘুমানোর সময়ও এটি সঙ্গে থাকে। খাওয়ার সময় বা গাছে চড়ার প্রয়োজন হলে সে পুতুলটি পায়ের ভাঁজে আটকে নেয়। লিজির জন্য এ পর্যন্ত প্রায় এক ডজন একই রকম পুতুল কেনা হয়েছে। সে শুধু ১৪ ইঞ্চি লম্বা ও গলায় কাপড় থাকা পুতুলটিই পছন্দ করে। সে বাসার মাঝখানে পুতুলটিকে খুব যত্ন করে সাজিয়ে রাখে। গবেষকদের মতে, মানুষের মতো আকৃতি হওয়ায় পুতুলটিকে লিজির কাছে কোনো সঙ্গীর মতো মনে হয়।
পেঙ্গুইন হেনরি
ইংল্যান্ডের একটি অ্যাকোয়ারিয়ামে গত ৩০ জানুয়ারি ছোট নীল প্রজাতির একটি পেঙ্গুইন জন্ম নেয়। যার নাম রাখা হয় ‘হেনরি’। ডিম থেকে বের হওয়ার পর হেনরিকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য একটি খেলনা পেঙ্গুইন দেওয়া হয়। এই খেলনাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘টম’।
শুরুতে খেলনাটি একটি আইফোনের সমান ছিল, তবে হেনরি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আরও বড় খেলনা দেওয়া হয়েছে। এই প্রজাতির পেঙ্গুইনরা সাধারণত এক ফুটের বেশি লম্বা হয় না। হেনরির মা–বাবা নতুন দম্পতি হওয়ায় এরা ডিম ফোটাতে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। তাই অ্যাকোয়ারিয়ামের কর্মীরা ইনকিউবেটরে ডিমটি ফুটিয়েছেন।
হেনরি যাতে একা বোধ না করে, সে জন্যই তাকে এই খেলনা বন্ধুটি দেওয়া হয়েছে। খেলনাটি পাশে থাকলে হেনরি অন্য কারও সঙ্গে থাকার অভ্যাস করতে পারবে। খেলনাটির গায়ের গন্ধ ও আকৃতি অনেকটা আসল পেঙ্গুইনের মতোই। বর্তমানে হেনরি অন্য পেঙ্গুইনদের সঙ্গে থাকলেও কর্মীরা ওর খেলনাগুলো সরিয়ে নেননি।
শিম্পাঞ্জি ফক্সি
২০০৮ সালে ডায়ানা গুডরিচ একটি পুরোনো দোকান থেকে গোলাপি চুলের একটি ট্রল পুতুল কিনেছিলেন। তিনি এটি শিম্পাঞ্জি অভয়ারণ্যের প্রাণীদের খেলার জন্য এনেছিলেন। ফক্সি নামের একটি শিম্পাঞ্জি আগে সব খেলনা প্রত্যাখ্যান করলেও এই পুতুলটি দেখা মাত্রই আপন করে নেয়। সে পুতুলটিকে আদর করে ও সারাক্ষণ নিজের পিঠে বা ঊরুর ভাঁজে বয়ে বেড়ায়।
৪৯ বছর বয়সী ফক্সির কাছে এখন স্ট্রবেরি শর্টকেক, ডোরা ও ডিজনি প্রিন্সেসের মতো শত শত পুতুল আছে। ফক্সির অতীত বেশ কষ্টের। ওয়াশিংটনের অভয়ারণ্যে আসার আগে তাকে একটি ল্যাবরেটরিতে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাকে ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণায় ব্যবহার করা হতো। ফক্সির চারটি সন্তান ছিল। কিন্তু জন্মের পরপরই ল্যাবরেটরির কর্মীরা এদের কেড়ে নিয়েছিলেন।
ওর দুই সন্তান ল্যাবরেটরিতে মারা যায় ও অন্য দুজন অন্য অভয়ারণ্যে আছে। ফক্সি ওর হারানো সন্তানদের অভাব পূরণ করতেই এই পুতুলগুলোর প্রতি মাতৃত্বসুলভ আচরণ করে। এটি তাকে মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে।
হস্তীশাবক কাইকাই
অনেক হাতি টায়ার নিয়ে খেলতে পছন্দ করলেও কাইকাইয়ের ক্ষেত্রে এটি একটু আলাদা। ৯ মাস বয়সী এই আফ্রিকান হস্তীশাবকটি ওর টায়ারটিকে কখনো ঘোরায়, কখনো উল্টে দেয়, আবার কখনো ঘুমানোর সময় বালিশ হিসেবে ব্যবহার করে। কাইকাইয়ের জীবন শুরু হয়েছিল খুব কষ্টে। গত বছর মে মাসে কেনিয়ার বনে মৃত মা হাতির পাশে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর তাকে উদ্ধার করে কেনিয়ার একটি হাতি সংরক্ষণকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। কাইকাই এখন খুব আনন্দিত ও চঞ্চল। সে নিজের পছন্দের খেলনা খুঁজে নেয় ও সারাক্ষণ নিজেকে ব্যস্ত রাখে। ওর এই আচরণ দেখে বোঝা যায়, সে এখন মানসিকভাবে সুস্থ ও সুখী আছে। একজন অনাথ হস্তীশাবকের এভাবে বেঁচে থাকা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা গবেষক ও কর্মীদের জন্য অনেক বড় একটি সাফল্য।
শিম্পাঞ্জি নিয়া
জর্জিয়ার প্রজেক্ট শিম্পস অভয়ারণ্যের ২০ বছর বয়সী শিম্পাঞ্জি নিয়ার একটি অদ্ভুত শখ আছে। সে নীল রং ছাড়া অন্য কোনো রঙের কম্বল ব্যবহার করে না। সেটা হালকা আকাশি হোক বা গাঢ় নীল। কম্বলটি অবশ্যই নীল রঙের হতে হয়। অন্য কোনো রঙের কম্বল দিলে সে সেদিকে ফিরেও তাকায় না। নিয়া সারাক্ষণ এই নীল কম্বলটি নিজের সঙ্গে রাখে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় হোক কিংবা খাবার খাওয়ার আগে কম্বলটি ওর কাছে থাকা চাই। এমনকি মাঝেমধ্যে সে কম্বলটি মাথায় দিয়েও ঘুরে বেড়ায়। নিয়া এই কম্বলটিকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে চায় না। তাই যখন সে ভুল করে কম্বলটি রেখে অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়, কর্মীরা সেই সুযোগে দ্রুত ময়লা কম্বলটি ধুয়ে পরিষ্কার করে দেন।
পাহাড়ি সিংহ ব্রায়ার
পাহাড়ি সিংহ সাধারণত জন্মের পর প্রথম দুই বছর এদের মায়ের সঙ্গেই থাকে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ক্যালিফোর্নিয়ায় মাত্র চার সপ্তাহ বয়সী একটি পাহাড়ি সিংহের শাবককে একা পড়ে থাকতে দেখা যায়। কয়েক দিন খোঁজাখুঁজি করেও তার মাকে না পেয়ে বন্য প্রাণী কর্মকর্তারা তাকে ওকল্যান্ড চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেন।
ঝোপঝাড়ের মতো গায়ের দাগ দেখে কর্মীরা নাম রাখেন ব্রায়ার। চিড়িয়াখানার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ব্রায়ার খুব একা হয়ে পড়েছিল। তখন একাকিত্ব দূর করতে ও মায়ের অভাব মেটাতে কর্মীরা তাকে একটি খেলনা কুকুর দেন। ব্রায়ার সারাক্ষণ খেলনাটিকে জড়িয়ে ধরে থাকত, যা তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। তবে কয়েক সপ্তাহ পর যখন তাকে পাহাড়ি সিংহদের আসল আবাসে নেওয়া হয়, তখন সে খেলনাটি নিয়ে খেলা বন্ধ করে দেয়।
বর্তমানে ব্রায়ার আরও দুটি পাহাড়ি সিংহের সঙ্গে বড় হচ্ছে। ওরা একে অপরের সঙ্গে কুস্তি করে, গাছে ওঠে এবং হ্যামকে বিশ্রাম নিয়ে সময় কাটায়। ব্রায়ার দেখিয়েছে কীভাবে কঠিন সময় পার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা যায়। আশা করা যেতে পারে, নিঃসঙ্গ বানরছানা পাঞ্চও ব্রায়ারের মতো দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে ও নতুন সঙ্গী খুঁজে পাবে।