মঙ্গলের চাঁদ ডিমোসের আকার আলুর মতো কেন
মঙ্গল গ্রহের দুটি ছোট চাঁদ আছে। ফোবোস ও ডিমোস। এই দুই চাঁদ কীভাবে মঙ্গলের চারপাশে ঘুরতে শুরু করল, তা এখনো বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি জানেন না। তবে নতুন এক গবেষণায় মঙ্গলের চাঁদ ডিমোসকে নিয়ে বেশ কিছু তথ্য অনুমান করা গেছে।
ডিমোসের নাম এসেছে গ্রিক দেবতা এরিসের ছেলে ডিমোসের নাম থেকে। গ্রিক ভাষায় ডিমোস মানে আতঙ্ক বা ভয়। মঙ্গলেরই গ্রিক নাম এরিস। দেখতে ডিমোস অনেকটা ছোট, এবড়োখেবড়ো আলুর মতো। মঙ্গল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। ১৯৭০-এর দশক থেকেই মহাকাশযানগুলো ডিমোসকে পর্যবেক্ষণ করছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার হেরা মিশনও চাঁদটির কাছ দিয়ে উড়ে গেছে।
ডিমোসের সঙ্গে ফোবোসের তুলনা করলে পার্থক্যটা ভালোভাবে বোঝা যায়। ফোবোসের গায়ে অসংখ্য গর্ত বা খাদ আছে। কিন্তু ডিমোসের পৃষ্ঠ অনেক মসৃণ। এর ওপর ছড়িয়ে আছে ধুলা ও পাথরের ছোট ছোট টুকরার একটি স্তর। এই স্তরকে বলা হয় রেগোলিথ।
ডিমোসের ব্যাস প্রায় ১২ কিলোমিটার। এর দক্ষিণ মেরুতে আছে প্রায় ১০ কিলোমিটার চওড়া একটি বিশাল গর্ত। পাহাড়ের মাঝখানে হঠাৎ তৈরি হওয়া বিশাল নিচু জায়গার মতো দেখতে এত বড় গর্ত কীভাবে তৈরি হলো? ডিমোসের ওপর ছড়িয়ে থাকা ধুলার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন গবেষণায় জানা গেছে, সম্ভবত একটি বড় গ্রহাণুর আঘাতেই ডিমোসের আলুর মতো চেহারা তৈরি হয়েছে।
একটি বড় আঘাতই কি সব বদলে দিয়েছিল?
গবেষক দল ডিমোসে গ্রহাণুর আঘাতের বিভিন্ন পরিস্থিতি কম্পিউটারে মডেল তৈরি করে দেখেছেন। এ জন্য তাঁরা ব্যবহার করেছেন সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি একটি বিশেষ কম্পিউটার মডেল। এই মডেলের সাহায্যে গ্রহাণু, ধূমকেতু বা গ্রহের সংঘর্ষের সময় কী ঘটে, তা বিশ্লেষণ করা যায়।
কম্পিউটারে এমন সংঘর্ষের সময় কোটি কোটি ছোট কণার গতিবিধিও হিসাব করা সম্ভব। ফলে কোনো বস্তু কতটা ঘন, এর মাধ্যাকর্ষণ কত এবং পাথর কতটা শক্ত, এসব বিষয়ও হিসাব করা যায়।
গবেষকেরা প্রায় ১০০টি আলাদা পরিস্থিতির মডেল তৈরি করেছেন। প্রতিটি মডেল চালাতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগেছে। কোনো মডেলে আঘাতকারী গ্রহাণুর আকার বদলানো হয়েছে, কোনো মডেলে এর গতি বা আঘাতের কোণ বদলানো হয়েছে। একই সঙ্গে ডিমোসের ভেতরের গঠনও বিভিন্নভাবে ধরে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।
এরপর কম্পিউটার মডেলের ফলাফল মিলিয়ে দেখা হয়েছে ২০২৫ সালে হেরা মিশনের তোলা ছবির সঙ্গে।
সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে দেখা যায়, প্রায় ৩২০ মিটার চওড়া একটি গ্রহাণু ৪৫ ডিগ্রি কোণে ডিমোসে আঘাত করেছিল। সেই আঘাতেই তৈরি হতে পারে দক্ষিণ মেরুর বিশাল গর্ত এবং চাঁদটির চারপাশে ছড়িয়ে পড়া ধুলার স্তর।
আঘাতটি ছিল ভয়ংকর শক্তিশালী। এর ফলে ডিমোসের পৃষ্ঠের অনেকটা অংশের পাথর ও ধুলা ছিটকে গিয়ে আবার চাঁদটির ওপর ছড়িয়ে পড়েছিল। কোথাও কোথাও এই নতুন স্তরের পুরুত্ব ২০০ মিটার পর্যন্ত মনে করা হচ্ছে। এ কারণেই ডিমোসকে এখন ফোবোসের তুলনায় অনেক মসৃণ দেখায়।
গবেষণার সহলেখক মার্টিন ইউটজি বলেন, একটি আঘাতই ডিমোসের বর্তমান ভূদৃশ্য তৈরি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তবে আঘাতটি এত শক্তিশালী ছিল না যে পুরো চাঁদকে টুকরা টুকরা করে ফেলবে।
এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। ডিমোসের ওপরের ধুলার স্তরের নিচে এখনো পুরোনো কিছু গর্তের চিহ্ন দেখা যায়। যদি ডিমোস শক্ত ও জমাট পাথরের তৈরি হতো, তাহলে গ্রহাণুর আঘাতের ধাক্কা চাঁদের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরোনো এসব গর্তের চিহ্ন মুছে দিতে পারত। কিন্তু ডিমোসের ভেতরের গঠন অনেকটা ভাঙা পাথরের স্তূপের মতো। তাই আঘাতের শক্তি ভেতরে গিয়ে অনেকটাই কমে যায়।
তবে এই আঘাত ঠিক কত বছর আগে ঘটেছিল, তা গবেষকেরা এখনো বলতে পারছেন না। শুধু ধারণা করা হচ্ছে, ডিমোস তৈরি হওয়ার বেশ কিছু সময় পরেই এই সংঘর্ষ ঘটেছিল।
ডিমোস কোথা থেকে এল
ডিমোস নিয়ে রহস্য শুধু এর চেহারা নিয়েই নয়। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে ভাবছেন, ফোবোস ও ডিমোসের জন্ম কীভাবে?
একটি ধারণা হলো, বহু কোটি বছর আগে মঙ্গলে কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তু আঘাত করেছিল। সেই আঘাতে মঙ্গল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা পাথর ও ধুলা একত্র হয়ে তৈরি হতে পারে এই দুই চাঁদ।
আরেকটি ধারণা হলো, ফোবোস ও ডিমোস আসলে গ্রহাণু ছিল। মঙ্গলের শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ এদের নিজের কক্ষপথ থেকে টেনে এনে মঙ্গলের চারপাশে আটকে ফেলেছে।
নতুন গবেষণার কম্পিউটার মডেল ও পর্যবেক্ষণ থেকে অবশ্য একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার হয়েছে। ডিমোসের ভেতরের গঠন অনেকটাই ফাঁপা বা ছিদ্রযুক্ত। এটি অনেকটা ‘রাবল-পাইল’ গ্রহাণুর মতো। মানে অসংখ্য পাথর শক্তভাবে জোড়া না লেগে শুধু মাধ্যাকর্ষণের টানে একসঙ্গে আটকে আছে।
তবে এর মানে এই না যে ডিমোস নিশ্চিতভাবেই একটি গ্রহাণু। গবেষণার প্রধান লেখক সাবিনা রাদুকান বলেন, মঙ্গলে কোনো বড় সংঘর্ষের ফলে ছিটকে বের হওয়া উপাদান থেকেও ডিমোস তৈরি হতে পারে।
ডিমোসের রহস্যের আরও ভালো উত্তর পাওয়া যেতে পারে শিগগিরই। জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন (এমএমএক্স) মিশন এ বছরের শেষ নাগাদ উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। মিশনটি মঙ্গলের দুই চাঁদ ফোবোস ও ডিমোসের খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে মঙ্গলের চাঁদগুলোর কাছে পৌঁছে এমএমএক্স প্রায় দুই বছর ফোবোসের মানচিত্র তৈরি করবে। এরপর ফোবোসে অবতরণের উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে। সেই নমুনা ২০৩১ সালে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কথা। পরে মিশনটি ডিমোসের কাছেও যাবে এবং সেটিকে আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
তখন হয়তো জানা যাবে, ডিমোস সত্যিই কোনো গ্রহাণু ছিল, নাকি মঙ্গল থেকেই ছিটকে বের হওয়া পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছিল। আর এর আলুর মতো অদ্ভুত চেহারা যদি সত্যিই একটি ভয়ংকর গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি হয়, তাহলে সেই মহাজাগতিক সংঘর্ষের কথা আরও ভালোভাবে জানা যাবে।
সূত্র: সিএনএন