৯১ বছর বয়সেও থামেননি ‘গ্রে বিয়ার্ড’, আবারও হাঁটছেন অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলে

ডেল ‘গ্রে বিয়ার্ড’ স্যান্ডার্সের গল্পটা অন্য রকমনিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া

বয়স ৯১ বছর। এই বয়সে প্রতিদিনের হাঁটাচলাটুকুই অনেকের কাছে বড় লক্ষ্য। কিন্তু ডেল ‘গ্রে বিয়ার্ড’ স্যান্ডার্সের গল্পটা অন্য রকম। তাঁর সামনে প্রায় ২ হাজার ১৯০ মাইলের পথ পড়ে আছে। পাহাড়, পাথর, বৃষ্টি, কুয়াশা আর প্রচণ্ড বাতাস পেরিয়ে সেই পথ হাঁটছেন তিনি। লক্ষ্য, আবারও নিজের রেকর্ড ফিরে পাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া থেকে মেইন পর্যন্ত বিস্তৃত অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইল। প্রায় ২ হাজার ১৯০ মাইল বা ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই পথ। পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত দীর্ঘ পদযাত্রার পথ। স্যান্ডার্স পুরো পথ এক বছরের মধ্যে হেঁটে শেষ করতে চান। তাহলে আবারও সবচেয়ে বেশি বয়সে এই পথ পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড তাঁর দখলে আসবে।

গ্রীষ্মের প্রথম দিন। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। নিউ হ্যাম্পশায়ারের হোয়াইট মাউন্টেনসে ফ্রাঙ্কোনিয়া রিজের দিকে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্যান্ডার্স। সামনে খাড়া, পাথুরে পথ। ছোট একটি ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে প্রস্তুত হলেন। তারপর নিজেকেই মনে করিয়ে দিলেন, আজকের দিনে শুধু একটি কাজ করা যাবে না। সেটি হলো পড়ে যাওয়া। ৯১ বছর বয়সে পাহাড়ে হাঁটার জন্য এর চেয়ে ভালো নিয়ম আর কী হতে পারে!

আরও পড়ুন
প্রতিদিন প্রায় ১২ মাইল বা ১৯ কিলোমিটার হাঁটবেন
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া

৮২ বছর বয়সে প্রথম রেকর্ড

স্যান্ডার্সের এই যাত্রা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে তাঁর বয়স ছিল ৮২। প্রথমবার পুরো অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইল হেঁটে সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। কিন্তু রেকর্ডটি বেশিদিন তাঁর কাছে থাকেনি। ২০২১ সালে এম জে এবেরহার্ট স্যান্ডার্সের রেকর্ড ভেঙে দেন। এবেরহার্টের ট্রেইল নাম ‘নিম্বলউইল নোম্যাড’। তবে রেকর্ড হারালেও দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। বরং স্যান্ডার্স নিজেই এবেরহার্টকে নতুন রেকর্ড গড়তে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

এবেরহার্ট কয়েকবার পথ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলে স্যান্ডার্স তাঁর সঙ্গে শেষ কয়েক দিন হাঁটতেও গিয়েছিলেন। বন্ধুকে যেন হাল ছেড়ে দিতে না হয়, সেটাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তবু নিজের পুরোনো রেকর্ড ফিরে পাওয়ার ইচ্ছাটা স্যান্ডার্সের মধ্যে থেকে গিয়েছিল। তাই আবার শুরু হলো অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলের পথে তাঁর যাত্রা।

আরও পড়ুন

প্রতিদিন ১২ মাইল

এবার তাঁর পরিকল্পনাটা বেশ গোছানো। প্রতিদিন প্রায় ১২ মাইল বা ১৯ কিলোমিটার হাঁটবেন। সপ্তাহে এক দিন বিশ্রাম নেবেন। পুরো পথ একটানা দক্ষিণ থেকে উত্তরে হাঁটতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তাই আবহাওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজের মতো করে পথ সাজিয়েছেন স্যান্ডার্স। তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার হার্পার্স ফেরি থেকে দক্ষিণের দিকে হাঁটা শুরু করেন। পরে আবার সেই জায়গায় ফিরে এসে উত্তরের অংশে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর যাত্রার বড় একটি অংশে সঙ্গে থাকে একটি বিশেষ গাড়ি। পিকআপ ট্রাকের পেছনে তৈরি ছোট্ট ক্যাম্পারটি তাঁর অস্থায়ী ঘর। নাম দিয়েছেন ‘বেজ ক্যাম্প অন হুইলস’। চাকার ওপর ঘাঁটি।

বিভিন্ন সময়ে স্বেচ্ছাসেবকেরা গাড়িটি চালান। তাঁরা খাবার রান্না করেন, বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন এবং পরের দিনের কতটা পথ হাঁটবেন, সেটিও পরিকল্পনা করতে সাহায্য করেন। প্রথম ৮০০ মাইলের সময় গাড়িটি চালিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু এবেরহার্ট। সেই একই ব্যক্তি, যিনি একসময় স্যান্ডার্সের পুরোনো রেকর্ড ভেঙেছিলেন। এবেরহার্টের বয়স এখন ৮৭। অর্থাৎ তিনিও নিজের বয়সের রেকর্ড ভাঙার দৌড়ে আছেন।

আরও পড়ুন

পথ এবার যেন আরও কঠিন

হোয়াইট মাউন্টেনসের আবহাওয়া ভয়ংকর। ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা আর প্রচণ্ড বাতাস এখানে হঠাৎ হাজির হতে পারে। এক সপ্তাহ আগে এমনই এক ঝড়ে স্যান্ডার্সকে পথ থেকে ফিরে যেতে বলেছিলেন একজন ট্রেইলকর্মী। পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল, তিনি সতর্ক করেছিলেন, এভাবে এগোতে থাকলে স্যান্ডার্সের জীবন বিপন্ন হতে পারে। তবে ঝড় থামার পর আবার পথ ধরেছেন তিনি। ফ্রাঙ্কোনিয়া রিজে ওঠার সময়ও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠল। গাছের সারি পেরিয়ে পাহাড়ের ওপরের খোলা অংশে উঠতেই শুরু হলো প্রচণ্ড বাতাস। নেমে এল ঘন কুয়াশা। আকাশ থেকে তিরের মতো বৃষ্টি এসে লাগতে লাগল শরীরে। পথের কিছু অংশ এত দুর্গম যে সেখানে শুধু হাঁটলেই হয় না। হাত-পা ব্যবহার করে পাথর বেয়ে উঠতে হয়। একটি বড় পাথুরে ঢালের কাছে এসে স্যান্ডার্স থমকে গেলেন। জায়গাটি তাঁর পরিচিত মনে হচ্ছিল না। অথচ ২০১৭ সালে এই পথই একবার পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সাবধানে পাথর বেয়ে ওপরে উঠলেন। কিন্তু এবারকার পথ তাঁর কাছে আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কঠিন মনে হলো। বয়সের পার্থক্যটা তিনি নিজেও টের পাচ্ছেন। ২০১৭ সালের নিজের শরীরের সঙ্গে এখনকার শরীরের তুলনা করলে পার্থক্যটা স্পষ্ট ধরা পড়ে। স্যান্ডার্স চেয়েছিলেন আগের মতো অবস্থায় ফিরতে। কিন্তু চেষ্টা করেও আর ২০১৭ সালের সেই অবস্থায় ফিরতে পারেননি।

আরও পড়ুন
তাঁর ইচ্ছাশক্তির যেন কোনো সীমা নেই
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া

স্বাস্থ্যের সীমা আছে, ইচ্ছার নেই

বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ক্ষমতার একটা সীমা তৈরি হয়। কঠোর অনুশীলন করেও সেই সীমা পুরোপুরি অতিক্রম করা যায় না। স্যান্ডার্সও সেটা জানেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছাশক্তির যেন কোনো সীমা নেই। এই মানসিকতার পেছনে তাঁর জীবনের পুরোনো গল্প আছে।

ছোটবেলায় কেন্টাকির একটি তামাকখেতে বড় হয়েছেন স্যান্ডার্স। স্কুলে তাঁকে অন্যরা অনেক উত্ত্যক্ত করতেন। পড়াশোনাতেও খুব একটা ভালো ছিলেন না। কিন্তু খেলাধুলায় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের জায়গা। বইপত্রে ভালো না হলেও শারীরিক কর্মকাণ্ড তাঁকে নিজের মতো করে কিছু করার সুযোগ দিয়েছিল। সেই প্রতিযোগিতার মানসিকতাই হয়তো আজও তাঁকে পাহাড়ের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ২০০২ সালে নেভির পার্ক ও বিনোদন বিভাগে দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে অবসর নেন স্যান্ডার্স। ৮০তম জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছিলেন মিসিসিপি নদীর পুরোটা পথ প্যাডেল করে পাড়ি দিয়ে। এরপর শুরু হয় নতুন নতুন বয়সের রেকর্ড খোঁজার অভিযান। অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলের রেকর্ডের কথা জানার পর আর নিজেকে থামাতে পারেননি তিনি।

আরও পড়ুন

পথে পথে নতুন বন্ধু

অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে যাওয়া মানুষদের সাধারণত নিজেদের ট্রেইল নাম থাকে। স্যান্ডার্সের নাম ‘গ্রে বিয়ার্ড’ বা ধূসর দাড়ির মানুষ। পথে তাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে নানা বয়সের মানুষের। কেউ তাঁর সঙ্গে কয়েক মাইল হাঁটছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার দূর থেকেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। একদিন ২৮ বছর বয়সী গ্যারিসন গ্যান্ডি, যাঁর ট্রেইল নাম ‘ডাবলওয়াইড’, তাঁর সঙ্গে হাঁটছিলেন।

অন্য একদিন ২৯ বছর বয়সী নিকোলাস লুকাইডিস কয়েক মাইল সঙ্গী হন। লুকাইডিস ছোটবেলা থেকেই হোয়াইট মাউন্টেনসে হাঁটেন। তাঁর কাছে গ্রে বিয়ার্ডের সঙ্গে কয়েক মাইল হাঁটার সুযোগ ছিল ভ্রমণের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। তাঁর মতো আরও অনেক তরুণই পথে স্যান্ডার্সকে দেখে অবাক হচ্ছেন। ২৩ বছর বয়সী এমা বার্টলেটও একদিন তাঁকে দেখে থেমে ছবি তোলেন। জর্জিয়া থেকেই তিনি স্যান্ডার্সের কথা শুনে আসছিলেন। মজা করে বার্টলেট বলেছিলেন, ৯১ বছর বয়সেও যদি তিনি হাঁটতে পারেন, তাহলে তিনি আনন্দে লাফাতে থাকবেন।

আরও পড়ুন
পালাচিয়ান ট্রেইলের সবচেয়ে দুর্গম অংশগুলোর একটি এটি
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া

সামনে আরও কঠিন পথ

স্যান্ডার্সের পথ এখনো শেষ হয়নি। সামনে রয়েছে মেইনের ‘১০০ মাইল ওয়াইল্ডারনেস’। অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইলের সবচেয়ে দুর্গম অংশগুলোর একটি এটি। সেখানে নিয়মিত সরবরাহ বা সাহায্য পাওয়ার সুযোগ খুব কম। উত্তর ক্যারোলিনার স্মোকি মাউন্টেনসের একটি অংশও এখনো বাকি। তবে তাঁর বর্তমান গতির হিসাব বলছে, ৩৬৫ দিনের সময়সীমার মধ্যেই তিনি পুরো পথ শেষ করতে পারবেন। আর সেটি সম্ভব হলে আবারও সবচেয়ে বেশি বয়সে অ্যাপালাচিয়ান ট্রেইল পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড তাঁর হাতে ফিরবে।

তবে সময়ের হিসাব মেলেনি। রেকর্ডটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নামে হলো কি না, এতে তাঁর কিছু যায় আসে না। তিনি হাঁটা শেষ করবেনই। কারণ, স্যান্ডার্সের কাছে এই যাত্রা শুধু একটি রেকর্ডের জন্য নয়। এটি নিজেকে বারবার পরীক্ষা করার গল্প। বয়স যতই বাড়ুক, নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আবার প্রশ্ন করার গল্প।

ঠিক এ কারণেই ৯১ বছর বয়সেও পাহাড়ের পথে হাঁটছেন ‘গ্রে বিয়ার্ড’। শরীর হয়তো আগের মতো নেই। পথও আগের চেয়ে কঠিন মনে হচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছাটা এখনো আগের মতোই শক্ত আছে। তিনি থামবেন না, যতক্ষণ শারীর সায় দিচ্ছে।

আরও পড়ুন