বিশ্বজুড়ে কোন কেকগুলো সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়

ওভেন আবিষ্কারের পর থেকে কেক সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। এখন যেকোনো আনন্দ উদ্‌যাপনে কেক থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে নানান পদের বিখ্যাত ও সুস্বাদু কেক। চলো, আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় তেমন কিছু কেকের কথা জেনে নেওয়া যাক।

তিরামিসু
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ইতালির তিরামিসু

তিরামিসু নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর অর্থ। ইতালীয় ভাষায় শব্দটির অর্থ হলো আমাকে চাঙা করে তোলো। কফির স্বাদ ও গন্ধ থাকা কেকটি দারুণ সুস্বাদু। বিশ্বজুড়ে ইতালীয় রেস্তোরাঁগুলোতে এটি খুব সহজলভ্য। আসল তিরামিসু বানাতে কফিতে ডোবানো বিশেষ লেডিফিঙ্গার বিস্কুট ব্যবহার করা হয়। সেই বিস্কুটের ওপর ডিম, চিনি আর মাস্কারপোন চিজের স্তর সাজিয়ে কেকটি তৈরি হয়। তবে আজকাল বিস্কুটের বদলে নরম স্পঞ্জ কেকও ব্যবহার করা হয়। ইতালির রাজধানী রোমে বার পম্পি নামের ক্যাফে ও পেস্ট্রি শপ তিরামিসুর জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত।

ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক

জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক

চকলেট আর চেরিতে ভরা ব্ল্যাক ফরেস্ট কেকের আসল জার্মান নাম ‘শোয়ার্জওয়াল্ডার কির্শটর্টে’। এটি তৈরি করতে কির্শওয়াসার নামের বিশেষ একধরনের চেরি ফলের পানীয় ব্যবহার করা হয়। এই কেকের ভেতরে চেরির মিষ্টির সঙ্গে মসৃণ হুইপড ক্রিম আর চকলেট দেওয়া থাকে। ফলে প্রতি কামড়েই মিলবে চকলেট আর চেরির দারুণ এক স্বাদ। ১৯১৫ সালে জোসেফ কেলার নামের এক শেফ প্রথম এই কেক বানান। তাঁর তৈরি সেই মূল রেসিপি এখনো জার্মানির ‘ক্যাফে শেফার’-এ সযত্নে রাখা আছে।

ক্যারামেল কফি চিজ কেক

যুক্তরাষ্ট্রের চিজ কেক

আমেরিকার জনপ্রিয় সব ডেজার্টের মধ্যে চিজ কেক অন্যতম। বহু বছর আগে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান যুগেও মিষ্টি পনির দিয়ে তৈরি একধরনের খাবার খাওয়ার চল ছিল। তবে ১৮০০-এর দশকের শেষ দিকে ক্রিম চিজ আবিষ্কারের পর আজকের পরিচিত চিজ কেক বানানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে এটি দারুণ জনপ্রিয়। সাধারণত নিচে গুঁড়া করা বিস্কুটের স্তর এবং ওপরে পনির, চিনি ও ডিমের মিশ্রণ দিয়ে এই কেক তৈরি করা হয়। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রুকলিনের ‘জুনিয়র্স’ নামের দোকানটি সুস্বাদু চিজ কেকের জন্য বেশ পরিচিত।

আরও পড়ুন

মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের পান্ডান কেক

পান্ডান কেক মূলত স্পঞ্জের মতো নরম একধরনের শিফন কেক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রান্নায় পান্ডানাসগাছের সবুজ পাতার রস প্রচুর ব্যবহার করা হয়। এই পাতার প্রাকৃতিক রসের কারণেই কেকটি দেখতে সুন্দর উজ্জ্বল সবুজ রঙের হয়। এটি বেশ নরম ও জুসি প্রকৃতির। এর আলাদা মিষ্টি সুগন্ধ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের ‘বেঙ্গাওয়ান সোলো’ এবং ‘পাইন গার্ডেন’ দোকানে খুব ভালো মানের পান্ডান কেক পাওয়া যায়।

ফ্রান্সের ম্যাডেলিন

ম্যাডেলিন হলো ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ছোট আকারের কেক, যা দেখতে কিছুটা সমুদ্রের ঝিনুকের মতো। বিখ্যাত ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্ত তাঁর বইয়ে লিখেছেন, এই কেক মুখে দিলেই শৈশবের নানা স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ওভেন থেকে সদ্য বের করা গরম, হালকা ও মাখনে ভরা ম্যাডেলিন খেতে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। প্যারিসের ‘ব্লে সুক্রে’ নামের বেকারি তাদের লেবুর মিষ্টি প্রলেপ দেওয়া বিশেষ ম্যাডেলিনের জন্য বিখ্যাত।

অস্ট্রেলিয়ার ল্যামিংটন কেক

চৌকো আকারের স্পঞ্জ কেককে চকলেটের সিরাপে ডুবিয়ে তার ওপর নারকেলের গুঁড়া ছড়িয়ে ল্যামিংটন বানানো হয়। এটি এত জনপ্রিয় যে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতীকের মতো পরিচিতি পেয়েছে। ১৮৯৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ছিলেন লর্ড ল্যামিংটন। তাঁর নামানুসারেই কেকটির এমন নাম দেওয়া হয়। মেলবোর্নের ‘ক্যান্ডিড বেকারি’ এই কেকের ভেতরে রাস্পবেরি জ্যাম ও চকলেট দিয়ে বেশ মজার ল্যামিংটন তৈরি করে।

নিউজিল্যান্ডের পাভলোভা

বিশ্বখ্যাত রাশিয়ান ব্যালে নৃত্যশিল্পী আনা পাভলোভার নামানুসারে এই কেকের নামকরণ করা হয়। ডিমের সাদা অংশ আর চিনি ভালোভাবে ফেটিয়ে হালকা আঁচে বেক করে এটি প্রস্তুত করা হয়। পাভলোভার ওপরের স্তরটি বেশ মচমচে হলেও ভেতরের অংশটি তুলতুলে ও নরম থাকে। পরিবেশন করার সময় এর ওপর তাজা ফলের টুকরা সাজিয়ে দেওয়া হয়। কেকটি প্রথম কারা বানিয়েছিলম তা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। তবে ১৯২৭ সালে নিউজিল্যান্ডে প্রথম এর রেসিপি ছাপা হওয়ার প্রমাণ পেয়ে অক্সফোর্ড ডিকশনারি এটিকে নিউজিল্যান্ডের আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

আরও পড়ুন

তুরস্কের বাকলাভা

খাওয়া শেষে মিষ্টি খাবার হিসেবে কিংবা নাশতাতে থাকে বাকলাভা। চা আর ফলের সঙ্গে সাধারণত এটি পরিবেশন করা হয়। বাদাম ও পেস্তাবাদামের কুচি ভরা পাতলা রুটির একের পর এক স্তর সাজিয়ে মিষ্টি সিরাপে ডুবিয়ে এই খাবার বানানো হয়। ২০১৩ সালে তুরস্কের গাজিয়ানতেপ অঞ্চলের বাকলাভা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রোটেক্টেড জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন; অর্থাৎ ঐতিহাসিক খাবারের স্বীকৃতি পায়। এটিই প্রথম কোনো তুর্কি খাবার, যা এমন সম্মান পেয়েছে।

জাপানের দোরায়াকি

জাপানি কার্টুন ও অ্যানিমে ভক্তদের কাছে দোরায়াকি বা ডোরা কেক ভীষণ চেনা একটি নাম। কারণ, এটি সবার প্রিয় কার্টুন চরিত্র ডোরায়েমনের সবচেয়ে পছন্দের খাবার। দেখতে দুটি গোল প্যান কেকের মতো হলেও এর মাঝখানে থাকে মিষ্টি আনকোর পুর। ফলে কেকটি দেখতে স্যান্ডউইচের মতো লাগে। জাপানি ভাষায় দোরা শব্দের অর্থ হলো ঘণ্টা। কথিত আছে, বহু বছর আগে এক আহত সামুরাই তাঁর ধাতব ঘণ্টা ফেলে রেখে যান। তখন এক বৃদ্ধ দম্পতি সেই ঘণ্টার ওপর প্যান কেক ছেঁকে প্রথম এই খাবার তৈরি করেন। টোকিওর ১৫০ বছরের পুরোনো দোকান ‘সেইজুকেন’ সেরা দোরায়াকি বানানোর জন্য বিখ্যাত।

নরওয়ের ক্রানসেকাগে

ডেনমার্ক ও নরওয়ের অন্যতম বড় উৎসবের খাবার হলো ক্রানসেকাগে। এটি ডিমের সাদা অংশ, চিনি আর বাদাম দিয়ে তৈরি গোল আংটির মতো কেক। ছোট-বড় অনেক গোল কেকের স্তর সাজিয়ে এটি তৈরি করা হয়। একদম নিচে থাকে সবচেয়ে বড় গোল কেকটি, আর একদম ওপরে থাকে সবচেয়ে ছোটটি। বিয়ে বা নতুন বছর উদ্‌যাপনের মতো বিশেষ দিনে এই কেক বানানো হয়। কেকের ওপর সুন্দর ক্রিমের নকশা ও ছোট ছোট জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো থাকে। ১৮৭০ সালে তৈরি ডেনমার্কের সবচেয়ে পুরোনো বেকারি ‘কন্ডিতোরিয়েট লা গ্লেস’-এ ঐতিহ্যবাহী এই কেক পাওয়া যায়।

সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন