অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র থাকার পরও ইরানের সস্তা ড্রোনের কাছে কেন হিমশিম খাচ্ছে শক্তিধর দেশগুলো

আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হামলার পর তা ঠেকাতে পাল্টা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কাতারের দোহা থেকে দৃশ্যটি এভাবেই দেখা যায়ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যবহার করেছে শাহেদ-১৩৬ ড্রোন। এখন এই ড্রোন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের তৈরি এই কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোনগুলো এখন আর কেবল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই। এগুলো এখন আধুনিক যুদ্ধের একটি শক্তিশালী সমরাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। দূরপাল্লার এই ড্রোনগুলো সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে নিজেকে ধ্বংস করে দেয়, যা যেকোনো দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা শাহেদ ড্রোনকে অনেক সময় ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ বলে অভিহিত করেন। এর প্রধান কারণ হলো এর উৎপাদন খরচ। যেখানে একটি অত্যাধুনিক ক্রুজ মিসাইল তৈরিতে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হয়, সেখানে এই ড্রোনগুলো অত্যন্ত স্বল্প খরচে তৈরি করা যায়। তবে সস্তা হলেও এর কার্যকারিতা অনেক বেশি। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে হাজার হাজার ড্রোন ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলো লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম দিয়েও এই ড্রোনগুলোকে শতভাগ ঠেকানো যাচ্ছে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া ৯৪১টি ড্রোনের মধ্যে ৬৫টি ড্রোন ঠিকই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। অল্পসংখ্যক ড্রোনের আঘাতেই বন্দর, বিমানবন্দর ও ডেটা সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আসলে দামি মিসাইল দিয়ে বড় আকারের আক্রমণ ঠেকানো সহজ হলেও, ছোট ও সস্তা ড্রোনগুলো রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই ঢুকে পড়ছে। বিপুলসংখ্যক ড্রোন যখন একসঙ্গে আক্রমণ করে, তখন সবগুলোকে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

বিশ্লেষকদের মতে, শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো এর বিশাল সংখ্যা। এই ড্রোনগুলো তৈরি করা যেমন সহজ, খরচও তেমনি অনেক কম। বিপরীতে, এগুলোকে ধ্বংস করতে যে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, তার খরচ অনেক বেশি।

যখন একসঙ্গে একঝাঁক ড্রোন আক্রমণ করে, তখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রতিটি ড্রোনকে আটকাতে গেলে যে মূল্যবান মিসাইল খরচ করতে হয়, তা আসলে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সমান। ওয়াশিংটন ডিসির সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক প্যাট্রিকজা বাজিলজিকের মতে, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রাশিয়া ও ইরান তাদের শত্রুদের ওপর বিশাল এক আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। শত্রুপক্ষ বাধ্য হয়ে মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করতে কয়েক লাখ বা কোটি টাকার মিসাইল নষ্ট করছে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় শাহেদ ড্রোন বেশ নিচ দিয়ে এবং ধীরগতিতে উড়ে চলে। এর বিস্ফোরণ ক্ষমতা কম ও এটি কেবল নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত করতে পারে। কিন্তু এর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে দামের পার্থক্যে। একটি শাহেদ ড্রোনের দাম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে একটি ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক লাখ বা কোটি ডলার হতে পারে। ইরানের মতো দেশ, যারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নত অস্ত্র সহজে পায় না, তাদের জন্য এই কম খরচের প্রযুক্তিটি অনেক বেশি কার্যকর।

আরও পড়ুন
ইউক্রেনের আকাশে সম্প্রতি ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন উড়তে দেখা যায়
ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাব অনুযায়ী উপসাগরীয় দেশগুলো বা ইসরায়েল যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে তার প্রতিটি মিসাইল বা ইন্টারসেপ্টরের দাম ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ একটি সস্তা ড্রোন ঠেকাতে গিয়ে ইরানের শত্রুরা কোটি কোটি টাকার সম্পদ ব্যয় করছে। এই খরচের ভারসাম্যহীনতা একটি বড় সমস্যা তৈরি করে। কারণ, প্রতিরক্ষা মিসাইলের সংখ্যা সীমিত, আর সস্তা ড্রোনের সংখ্যা হতে পারে অগণিত। ফলে এই মূল্যবান সম্পদগুলো শেষ হয়ে গেলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ব্যবহারের মূল কৌশল হলো বিপুল সংখ্যায় ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা। তেহরান মূলত কম দামি এই ড্রোনগুলো আগে পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের দামী ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুদ শেষ করে দেয়, যাতে পরে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বড় হামলা চালানো সহজ হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান প্রতি সপ্তাহে শত শত ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রাখে এবং তাদের কাছে ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার ড্রোনের বিশাল মজুদ রয়েছে। রাশিয়ার যুদ্ধ থেকে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এ ধরনের সহজ প্রযুক্তির ড্রোন বড় পরিসরে উৎপাদন করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

সস্তা এই ড্রোনের বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো তাদের প্রতিরক্ষা মিসাইলের উচ্চ মূল্য ও সীমিত মজুত। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক ফ্রন্ট থেকে ড্রোন হামলা শুরু হলে মাত্র কয়েক দিনেই মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলো ফুরিয়ে যেতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় এখন নতুন কিছু সাশ্রয়ী কৌশল নিয়ে কাজ চলছে। যুদ্ধবিমানের কামানের গোলা ব্যবহার করে ড্রোন ভূপাতিত করা, ড্রোনের জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করা কিংবা ইসরায়েলের আয়রন বিমের মতো লেজার প্রযুক্তির ব্যবহার, যা প্রথাগত মিসাইলের চেয়ে অনেক গুণ সস্তা ও কার্যকর।

কারিগরি দিক থেকে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটি ওজনে হালকা হলেও ৩০ থেকে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করে ১ হাজার ২০০ মাইল দূর পর্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে। এর নকশা ও কার্যকারিতা এত সফল যে খোদ যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তির অনুকরণে নিজস্ব ড্রোন তৈরি করে ইরানি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার শুরু করেছে। বর্তমানে কাতারসহ কয়েকটি দেশ তাদের বিমানবাহিনীর জেটের মাধ্যমে ড্রোন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় পরিসরে ড্রোন ঠেকানোর মতো স্থায়ী ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আরও কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।

সূত্র: সিএনবিসি, গালফ নিউস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন