পৃথিবীর একমাত্র ব্যক্তি যিনি অলিম্পিক মেডেল ও নোবেল পেয়েছেন
ইতালির মিলান ও কর্টিনায় এখন চলছে শীতকালীন অলিম্পিকের ধুমধাম। বরফের রাজ্যে সারা বিশ্বের সেরা অ্যাথলেটরা লড়ছেন একটা সোনার মেডেলের জন্য। টিভির পর্দায় বা মোবাইলে আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছি তাঁদের সেই লড়াই।
কিন্তু অলিম্পিকের এই উৎসবের মধ্যে আপনাদের একটা অদ্ভুত মানুষের গল্প বলি। এমন একজন মানুষ, যিনি দৌড়ের ট্র্যাকে যেমন ঝড় তুলে মেডেল জিতেছিলেন, তেমনি বিশ্বশান্তির জন্য লড়াই করে জিতে নিয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার! ইতিহাসের পাতায় তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর গলায় ঝুলেছে অলিম্পিকের রৌপ্যপদক এবং হাতে উঠেছে নোবেল শান্তি পুরস্কার। তাঁর নাম ফিলিপ নোয়েল-বেকার।
ফিলিপের জন্ম এক কোয়েকার পরিবারে। কোয়েকাররা খুব শান্তিপ্রিয় মানুষ। যুদ্ধবিগ্রহ একদম পছন্দ করে না। ফিলিপ ছিলেন দারুণ মেধাবী ছাত্র। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস ও অর্থনীতিতে তুখোড় রেজাল্ট করার পর তিনি আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু বইয়ের পোকা হলে কী হবে, তাঁর পায়ে ছিল দারুণ গতি!
১৯১২ সাল। সুইডেনের স্টকহোমে বসেছে অলিম্পিকের আসর। ২২ বছর বয়সী ফিলিপ তখন কেমব্রিজ অ্যাথলেটিক ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। পড়াশোনা সাময়িক শিকেয় তুলে তিনি ব্রিটিশ ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড দলের হয়ে ছুটলেন সুইডেনে। সেবার অলিম্পিকে ঘটেছিল অনেক নতুন ঘটনা। জাপান প্রথমবারের মতো অংশ নিল, মেয়েদের সাঁতার যুক্ত হলো। আর সবার নজর কেড়ে নিলেন আমেরিকান অ্যাথলেট জিম থর্প।
সেই আসরে ফিলিপ ৮০০ মিটার ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিলেন। ১৫০০ মিটারে তিনি হলেন ষষ্ঠ। খালি হাতে ফিরলেও তিনি দমে যাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়। মাঝে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯১৬ সালের অলিম্পিক বাতিল হলো। এরপর ১৯২০ সালে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে বসল অলিম্পিকের আসর। ৩০ বছর বয়সে ফিলিপ দেখালেন তাঁর জাদু। ১৫০০ মিটার দৌড়ে জিতে নিলেন রৌপ্যপদক!
ফিলিপ যখন অলিম্পিক মাতাচ্ছেন, তার আগেই পৃথিবী দেখে ফেলেছে এক ভয়ংকর রূপ। ১৯১৪ সালের ৪ আগস্ট। ফিলিপ পরে স্মৃতিচারণা করে বলেছিলেন, ‘আমি শুনলাম বিগ বেন ঘড়িতে রাত ১২টার ঘণ্টা বাজছে। আর ঠিক সেই সময়ই ভিক্টোরিয়া স্টেশনের দিকে গর্জন করে ছুটে যাচ্ছে ঘোড়ায় টানা কামানের গাড়ি। আমরা বুঝে গেলাম, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।’
বাবার মতো ফিলিপও ছিলেন আদ্যোপান্ত শান্তিকামী মানুষ। তাই তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নেননি। কনসায়েনসিয়াস অবজেক্টর হিসেবে তিনি যুদ্ধের ময়দানে মানুষ মারতে যাননি, বরং গিয়েছিলেন মানুষ বাঁচাতে। তিনি ফ্রন্টলাইনে আহত সৈনিকদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর সাহসিকতার জন্য তিনি একাধিক পদকও পান। কিন্তু যুদ্ধের এই ভয়াবহতা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটে যায়। তিনি ঠিক করেন, শুধু খেলার মাঠ নয়, পৃথিবীকে শান্ত করার জন্যও তাঁকে দৌড়াতে হবে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ফিলিপ যোগ দিলেন লিগ অব নেশনসের কাজে। লর্ড রবার্ট সিসিলের সহকারী হিসেবে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়লেন। পরে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হন এবং লেবার পার্টির মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
অনেকে বলতেন, অস্ত্রই নাকি শান্তির গ্যারান্টি। শক্তিশালী অস্ত্র থাকলে শত্রুরা ভয়ে আক্রমণ করবে না। কিন্তু ফিলিপ ছিলেন উল্টো পথের যাত্রী। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রফেসর মাইকেল ই. কক্সের ভাষায়, ‘ফিলিপ বাস্তববাদী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা।’ ফিলিপ বিশ্বাস করতেন, অস্ত্র দিয়ে শান্তি আসে না, শান্তি আনতে হলে অস্ত্র ছাড়তে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন জাতিসংঘ গঠিত হলো, ফিলিপ সেখানেও অস্ত্র কমানোর জন্য ক্লান্তিহীন কাজ করে গেলেন। তাঁর এই দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৯ সালে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়। অলিম্পিক মেডেল জয়ের প্রায় ৪০ বছর পর তিনি আবার স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় ফিরে গেলেন। তবে এবার দৌড়াতে নয়, শান্তির বার্তা দিতে। তাঁর লেখা বই দ্য আর্মস রেস: আ প্রোগ্রাম ফর ওয়ার্ল্ড ডিজআর্মামেন্ট ছিল সেই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
নোবেল পুরস্কার নেওয়ার সময় ফিলিপের বয়স প্রায় ৭০। তিনি তাঁর বক্তৃতায় এক ভয়ানক সত্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এখনো চলছে, তবে এখন তা আরও ভয়ংকর, আরও ব্যয়বহুল। ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত প্যারাডক্স হলো প্রতিটি নতুন মারণাস্ত্র তৈরি করা হয় দেশের প্রতিরক্ষার নামে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানেন, আধুনিক যুগের এই গণবিধ্বংসী অস্ত্রগুলো আসলে প্রতিরক্ষার ধারণাটিকেই ধ্বংস করে দিয়েছে।’
তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, যুদ্ধকে কোনো নিয়ম দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। শান্তি চাইলে যুদ্ধকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে হবে। ফিলিপ নোয়েল-বেকার আজ নেই, কিন্তু তাঁর সেই সতর্কবার্তা আজও প্রাসঙ্গিক। অলিম্পিকের মশাল যেমন ঐক্যের প্রতীক, ফিলিপের জীবনও তেমনি আমাদের শেখায়, একজন মানুষ চাইলে খেলার মাঠেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, আবার মানবতার কল্যাণেও রাখতে পারে অসামান্য অবদান।
আজকের এই অলিম্পিকের মৌসুমে ফিলিপ নোয়েল-বেকারকে মনে করাটা তাই খুব জরুরি।
সূত্র: নোবেল প্রাইজ ডট অর্গ ও পপুলার সায়েন্স