শীতকালীন অলিম্পিক কী

ফালোরিয়া পর্বতের নিচে চলছে অলিম্পিকের আয়োজন।ছবি: এক্স

ইতালির আল্পস পর্বতমালায় এখন সাদা তুষারের রাজত্ব। মিলান ও কর্টিনা শহরজুড়ে উড়ছে ৯২টি দেশের পতাকা। ফুটবল ও ক্রিকেটের উন্মাদনার মধ্যে পর্দা উঠেছে শীতকালীন অলিম্পিকের। নামটা শুনে খটকা লাগতে পারে। অলিম্পিক তো হয় চার বছর পরপর গ্রীষ্মকালে, একেকটি আসরকে কেন্দ্র করে কত কত আয়োজন। শীতকালীন অলিম্পিক আবার কী?

শীতকালীন অলিম্পিকের জন্ম গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের কাছাকাছি সময়েই। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে যখন আধুনিক অলিম্পিকের পুনর্জন্ম হলো, তখন গ্রীষ্মকালীন খেলাগুলোই ছিল সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু মেরু অঞ্চলের কিছু দেশ বছরের বেশির ভাগ সময়েই থাকে বরফের নিচে। বিশেষ করে নরওয়ে, সুইডেন বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো খুব একটা খেলার সুযোগ পেত না এই খেলাগুলোয়। কারণ, তাদের বেশির ভাগ খেলাই বরফ ও তুষারের মধ্যে। তবু তাদের মূল অলিম্পিকের অংশ করার ইচ্ছে ছিল অলিম্পিক কমিটির।

যে কারণে ১৯০৮ লন্ডন অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো জায়গা করে আইস স্কেটিং। কিন্তু লন্ডনের তীব্র রোদের মধ্যে আইস স্কেটিংয়ের জন্য বরফ জমা রাখা ছিল একরকম অসম্ভব ব্যাপার। অলিম্পিক কমিটি তখন একই সঙ্গে দুটি জিনিস বুঝতে পেরেছিল। শীতকালীন খেলাগুলোকে মূল অলিম্পিকের অংশ করা রীতিমতো অসম্ভব। কিন্তু একই সঙ্গে এই খেলাগুলোর জনপ্রিয়তা কোনোভাবেই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এই উভয়সংকট থেকেই জন্ম নিল শীতকালীন অলিম্পিক।

আরও পড়ুন

শীতকালীন অলিম্পিকের আয়োজন যে নতুন কিছু ছিল, তা কিন্তু নয়। ১৯০১ সাল থেকে নর্ডিক দেশগুলো নিয়ে ছোট করে আয়োজন করা হয়েছিল নর্ডিক গেমস। যার প্রতিটি আসরই অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুইডেনের স্টকহোমে। সেখান থেকেই অলিম্পিক কমিটির মনে বিশ্বাস জন্মেছিল, শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজন কোনো ব্যর্থ প্রকল্প হবে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে মূল অলিম্পিকের অংশ হিসেবে আবারও যোগ দেয় ফিগার স্কেটিং। সেখান থেকে আরও জোরালো হয় শীতকালীন অলিম্পিকের আয়োজন।

১৯২৪ শীতকালীন অলিম্পিকে আইস হকি দল।
ছবি: উইকিপিডিয়া কমন্স

অবশেষে ১৯২৪ সালে ফ্রান্সের শামেনি নামক এক পাহাড়ি গ্রামে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক শীতকালীন ক্রীড়া সপ্তাহ’। ১১ দিনের সেই আয়োজনে ১৬টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছিল ১৬টি দেশের ২৫০ জন অ্যাথলেট। প্রথম স্থান অধিকার করে নরওয়ে, ৪টি সোনা, ৭টি রুপা আর ৬টি ব্রোঞ্জপদক নিয়ে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে স্কি করে নেমে আসা কিংবা বরফের ওপর হকি খেলার রোমাঞ্চ বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়েছিল। সেই আয়োজন এতটাই সফল ছিল যে পরে ইতিহাসের প্রথম ‘শীতকালীন অলিম্পিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সমান্তরালে নিজের একটি আলাদা সত্তা তৈরি করে নেয় শীতকালীন অলিম্পিক।

১৯৯২ সাল পর্যন্ত একই বছরে দুটি অলিম্পিক আয়োজন করা হতো। কিন্তু সেই বছর থেকেই একটা ছোট্ট পরিবর্তন আনা হয়। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের দুই বছর পর শীতকালীন আসর আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ১৯৯২ সালের পর ১৯৯৪ সালে দুই বছরের ব্যবধানে আয়োজন করা হয় দুটি অলিম্পিক। তবে এখন পর্যন্ত একই শহরে দুই অলিম্পিক আয়োজনের ঘটনা ঘটেছে একবারই, ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের পর ২০২২ সালে সেখানে আয়োজন করা হয় শীতকালীন অলিম্পিক।

আরও পড়ুন
ফুটবলার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের হাতে অলিম্পিকের মশাল।
ছবি: এক্স

গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে চীনের জয়জয়কার থাকলেও এখানে একদমই উল্টো। শীতকালীন অলিম্পিকের সবচেয়ে সফল দেশ নরওয়ে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্র। শীত-গ্রীষ্ম দুই অলিম্পিকেই তারা সমানভাবে সফল। তৃতীয়তে আছে জার্মানি। তবে চতুর্থ অবস্থান অবাক করতে বাধ্য—দেশটির নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৯১ সালে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তারা এখনো পদক তালিকায় আছে চতুর্থ অবস্থানে। বোঝাই যাচ্ছে, শীতকালীন অলিম্পিকে ঠিক কতটা দুর্দান্ত ছিল তারা। বিলুপ্ত হওয়ার আগের মৌসুমেও তারা ছিল সর্বোচ্চ পদকধারী দল। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে কানাডা।

এবারের আয়োজনটা কিছুটা হলেও আলাদা। ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক, যা দুটি বড় শহর এবং বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে আয়োজন করা হচ্ছে। মিলানের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস, তেমনই কোর্তিনায় আছে শীতকালীন অলিম্পিকের পুরোনো ঐতিহ্যে। সাধারণত শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের জন্য আলাদা করে বরফ থেকে শুরু করে অলিম্পিক ভিলেজ তৈরি করা হয়। এবার সেটা হচ্ছে না, বরং এবারের আসরে ৯২ শতাংশ ভেন্যুই আগের তৈরি করা অবকাঠামো ব্যবহার করে সাজানো হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে চলা পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে আরও একবার সমর্থন জানিয়ে গেল।

আরও পড়ুন
সান সিরো স্টেডিয়ামে চলছে দুর্দান্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন।
ছবি: এক্স

গত ৬ ফেব্রুয়ারি মিলানের বিখ্যাত সান সিরো স্টেডিয়ামে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছে তুষার-উৎসবের। মোট ১৭ দিন ধরে চলবে এ আয়োজন। অতঃপর ২২ ফেব্রুয়ারি ভেরোনা অ্যারেনায় পর্দা নামবে আয়োজনের। এবারের আসরে মোট ৮টি স্পোর্টস ও ১৬টি ডিসিপ্লিনে মোট ১১৬টি মেডেল ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২২ বেইজিং অলিম্পিকের থেকেও সাতটি ইভেন্ট বেশি আয়োজন করা হচ্ছে এবার। শীতকালীন অলিম্পিক শেষে মার্চ মাসে শুরু হবে শীতকালীন প্যারালিম্পিক।

আরও পড়ুন