সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করার আগে যে তথ্যগুলো মুছে ফেলা জরুরি
অনেকে হয়তো ‘জিওগেসার’ (GeoGuessr) অনলাইন গেমের নাম শুনেছ। না শুনলেও সমস্যা নেই। এটি আসলে দারুণ একটি গেম। এতে তোমাকে হঠাৎ যেকোনো একটি জায়গার গুগল স্ট্রিট ভিউ ছবি দেখানো হবে। ছবি দেখে তোমাকে বলতে হবে, এটি পৃথিবীর ঠিক কোন জায়গা।
এটি খেলার জন্য বেশ মজার একটি চ্যালেঞ্জ। যারা এই খেলায় খুব দক্ষ, তারা নিমিষেই জায়গা চিনে ফেলে। রাস্তার সাইনবোর্ড, ঘরবাড়ি, গাড়ির মডেল, দোকানের ব্যানার, গাছের ধরন আর ফুটপাতের নকশা দেখেই সূত্র পেয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময় শেষ হলে গেমটি আসল জায়গার নাম দেখিয়ে দেয়।
ছবি দেখে ভৌগোলিক অবস্থান চেনার এই কাজ এখন এআই চ্যাটবটগুলোও খুব ভালোভাবে শিখে ফেলেছে। তুমি নিজে প্রিয় চ্যাটবট দিয়ে এটি পরীক্ষা করে দেখতে পার। গুগল স্ট্রিট ভিউ থেকে একটা ছবি নামিয়ে এআইকে দাও। তারপর দেখ এআই কতটা নিখুঁত উত্তর দিতে পারে।
ছবিতে থাকা রাস্তা বা জায়গাটি যত পরিচিত হবে, এআই তত ভালো কাজ করবে। লন্ডনের ‘দ্য স্ট্র্যান্ড’ নামক একটি রাস্তার ছবি চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং ক্লড এ তিনটি এআইকে দেওয়া হয়েছিল। কোনো অতিরিক্ত তথ্য ছাড়াই শুধু ছবিতে থাকা গাড়ি ও ভবনের নকশা দেখেই তিনটি এআই একদম সঠিক উত্তর দিয়ে দেয়।
ছবি থেকে অবস্থান চেনে এআই
এরপর চ্যাটবটগুলোকে রাশিয়ার একটি প্রায় ফাঁকা রাস্তার ছবি দেওয়া হলো। সেখানে গাছপালা আর রাস্তার একটি চিহ্ন ছাড়া আর কোনো ইঙ্গিত ছিল না। তাতেই তিনটি এআই সঠিকভাবে রাশিয়া দেশটির নাম বলে দিতে পারল। তবে রাস্তার নিখুঁত অবস্থান তারা বলতে পারেনি।
নিজের তোলা ছবি দিয়েও এটি পরীক্ষা করতে পারো। কোথা থেকে ঘুরে এসে একটি ছবি যেকোনো এআইকে দিয়ে দেখো। ছবির পেছনে যদি যথেষ্ট জিনিসপত্র থাকে আর জায়গাটি পরিচিত হয়, তবে এআই ঠিকই তোমার অবস্থান চিনে ফেলবে।
আসলে এই এআই চ্যাটবটগুলো ইন্টারনেটের কোটি কোটি ছবি আর তথ্য পড়তে পারে। তাই কোন শহরের মোড়ে কোন ভাস্কর্য আছে, কোন সমুদ্রসৈকতে কেমন গাছ থাকে কিংবা কোন দেশে কোন রঙের ট্যাক্সি চলে—এসব তথ্য এআইয়ের বেশ ভালো জানা আছে।
এখন যদি এআই এটি করতে পারে, তবে যে কেউ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যে কারও অবস্থান জেনে নিতে পারবে। অনলাইনে পোস্ট করা ছবি দেখে কেউ যদি তার বাড়ি, অফিস বা বেড়ানোর জায়গা চিনে ফেলে, তবে এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আগে বলা হতো ছবি পোস্ট করার আগে শুধু মেটাডেটা বা লোকেশন তথ্য মুছে ফেললেই চলবে। কিন্তু এখন ছবি শেয়ার করার আগে এআইয়ের এই বিষয়টিকেও মাথায় রাখতে হবে।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে
প্রতারক, হ্যাকার ও অপরাধীরা ছবির অবস্থান দেখে নানাভাবে ক্ষতি করতে পারে। এরা হয়তো ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে মিথ্যা পরিচয়ে অপরাধ করছে। কিংবা স্কুল, কোচিং বা অফিস থেকে বের হওয়ার পর অনুসরণ করতে পারে।
এই বিপদ থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ছবি কোথায় শেয়ার করছ, সে বিষয়ে সতর্ক হওয়া। চাইলে ছবি এডিট করে পেছনের অংশ ঝাপসা করে দিতে পার কিংবা রেস্তোরাঁর নাম ঢেকে দিতে পার। তবে এর চেয়েও সহজ ও দ্রুত উপায় হলো ছবি আপলোড করার সময় বাড়তি সাবধানতা বজায় রাখা।
প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়াতেই নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য আলাদা সেটিংস থাকে। ফেসবুকে কোনো ছবি পোস্ট করার আগে লেখাটির ওপরে একটি ড্রপ-ডাউন মেনু থাকে। সেটি ‘পাবলিক’ না রেখে ‘ফ্রেন্ডস’ করে দাও। এতে বন্ধু ছাড়া যেকোনো সাধারণ মানুষ বা এআই ছবি সহজে দেখতে পাবে না।
ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট ‘প্রাইভেট’ করা না থাকলে যে কেউই ছবি দেখে ফেলতে পারে। এটি বন্ধ করতে ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রোফাইলে ক্লিক কর। নাম দিয়ে পাশে থাকা গিয়ার আইকনে যাও। তারপর ‘সেটিংস অ্যান্ড প্রাইভেসি’ থেকে ‘অ্যাকাউন্ট প্রাইভেসি’-তে গিয়ে ‘প্রাইভেট অ্যাকাউন্ট’ অপশনটি চালু করে দাও।
হোয়াটসঅ্যাপে এই নিরাপত্তা বিষয়গুলো আরও জোরদার থাকে। ছবি, স্টোরি কিংবা স্ট্যাটাস শুধু তারাই দেখতে পাবে, যাদের নম্বর ফোনে সেভ করা আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রুপ চ্যাটে দেওয়া ছবি ও ভিডিও বাইরের কারও দেখার সুযোগ থাকে না।
অবশ্যই একটি ঝুঁকি থেকেই যায়। যার কাছে ছবি পাঠিয়েছ, সে হয়তো সেটি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিতে পারে। এ বিষয়ে পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে সতর্ক থাকা ভালো।
যদি কাজের প্রয়োজনে বা নিজের প্রচারের জন্য অনলাইনে ছবি সবাইকে দেখাতেই হয়, তবে সাবধানে পোস্ট করতে হবে। ছবিটিতে যেন থাকার জায়গার কোনো ইঙ্গিত না থাকে, সে জন্য চারপাশের পেছনের অংশ ক্রপ করে শুধু নিজের অংশটুকু রাখা ভালো।
একটা ছবি দেখে এআই বলে দিতে পারে কোথায় আছো। বিষয়টি ভেবে ভয় লাগতেই পারে। তবে একটু সচেতন হয়ে এই সহজ নিয়মগুলো মানলে এআই বা কোনো খারাপ মানুষ তোমার অবস্থান সহজে বের করতে পারবে না।