নেপোলিয়নের পরাজয়ের নতুন কারণ জানালেন বিজ্ঞানীরা
১৮১২ সাল। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ইতিহাসের অন্যতম বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করলেন। এই বাহিনীর নাম ছিল ‘দ্য গ্রান্ডে আর্মি’। সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ!
কিন্তু এই বিশাল বাহিনীকেই যখন পিছু হটতে হলো, তখন ঘটল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয়। হাড় কাঁপানো শীত, খাবারের অভাব, তার ওপর জাঁকিয়ে বসল নানা রোগ। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, নেপোলিয়নের প্রায় ৩ লাখ সৈন্য সেই অভিযানে মারা গিয়েছিল।
আগে গবেষকদের মত ছিল, সৈন্যদের মৃত্যুর কারণ ছিল দুটি রোগ। টাইফাস ও ট্রেঞ্চ ফিভার। এই দুটি রোগই উকুনের মাধ্যমে ছড়ায়। এই রহস্যের নতুন জট খুলেছে প্রাচীন ডিএনএ।
কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বারবিয়েরি এবং তাঁর সহকর্মীরা এমন দুটি রোগের কথা জানিয়েছেন, যা আগে কেউ ভাবতেও পারেননি! তাঁরা বলছেন, নেপোলিয়নের সৈন্যদের ওপর আরও দুটি ঘাতক ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করেছিল। সালমোনেলা এন্টারিকা (Salmonella enterica) ও বোররেলিয়া রিকারেন্টিস (Borrelia recurrentis)। প্রথম ব্যাকটেরিয়ার কারণে প্যারাটাইফয়েড জ্বর হয়। আর দ্বিতীয় ব্যাকটেরিয়া উকুন ছড়ায় এবং এতে রিলেপসিং ফিভার নামে একধরনের জ্বর হয়। এই জ্বর বারবার হয়।
এমনিতেই সৈন্যরা রাশিয়ায় ক্ষুধায় ধুঁকছে। তারপর আবার বরফের মতো ঠান্ডা জায়গা। সেখানে যদি এ রকম দুটি রোগ আসে, তাহলে কী অবস্থা হবে, একবার কল্পনা করে দেখো। সৈন্যদের জন্য এই দুটি রোগ ছিল সাক্ষাৎ যম।
এবার আসা যাক, গবেষণাটি কীভাবে করা হলো। গল্পের শুরু ২০০২ সালে। লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে একটি গণকবর খোঁড়া হয়। সেখানে ২-৩ হাজার মানুষের কঙ্কাল পাওয়া যায়। কঙ্কালের আশপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ছিল নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর নানা জিনিস। যেমন পুরোনো বোতাম, বেল্ট ইত্যাদি। তা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ১৮১২ সালে রাশিয়া থেকে পিছু হটা সেই হতভাগ্য সৈন্যরাই এঁরা। বিজ্ঞানীরা সেখান থেকে ১৩ জন সৈন্যের কঙ্কাল বেছে নেন। কারণ, ওই কঙ্কালগুলোর দাঁত সবচেয়ে ভালো অবস্থায় ছিল।
ল্যাবে গিয়ে গবেষকেরা সেই দাঁত খোলেন। দাঁতের ভেতরের মজ্জা বের করে তা ডিএনএ সিকোয়েন্সিং মেশিনে পরীক্ষা করেন। আসলে তাঁরা জীবাণুর ডিএনএ খুঁজছিলেন।
এ ব্যাপারে গবেষক নিকোলাস রাস্কোভান বলেন, ‘আমরা আশা করছিলাম, সেই পুরোনো রোগগুলোই (টাইফাস বা ট্রেঞ্চ ফিভার) পাব।’
কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, এই ১৩ জন সৈন্যের দাঁতে তাঁরা টাইফাস বা ট্রেঞ্চ ফিভারের ব্যাকটেরিয়া পাননি! তার মানে এই নয় যে সেনাবাহিনীতে ওই রোগগুলো ছিল না। আসলে নেপোলিয়নের সেনাবিহিনীর সৈন্যরা অনেক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তার মধ্যে সালমোনেলা ও বোররেলিয়া ব্যাকটেরিয়াও ছিল; অর্থাৎ সৈন্যরা রোগে ভুগেই মারা গিয়েছিলেন।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান