ছয় মাসের বদলে এক মাসে মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার প্রযুক্তি আবিষ্কারের দাবি রাশিয়ান বিজ্ঞানীদের

প্লাজমা প্রপালশন ইঞ্জিনরোসাটম/ ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার নিউজ থেকে নেওয়া

রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, একটি নতুন ধরনের রকেট ইঞ্জিন পরীক্ষা চালাচ্ছেন তাঁরা। যা সফল হলে মানুষ মাত্র ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছে যেতে পারে। এই ইঞ্জিনের নাম প্লাজমা প্রপালশন ইঞ্জিন। প্রচলিত রাসায়নিক জ্বালানি ব্যবহারকারী রকেট যেখানে মঙ্গল পৌঁছাতে ৬ থেকে ৯ মাস সময় নেয়, সেখানে এই প্রযুক্তি পুরো ধারণাটাই বদলে দিতে পারে।

ইঞ্জিনটির প্রটোটাইপ তৈরি করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের অধীন ট্রইৎস্ক ইনস্টিটিউট। আপাতত এটি পৃথিবীতেই পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি মহাকাশে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

এই ইঞ্জিনে সাধারণ জ্বালানির বদলে ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে হাইড্রোজেনের চার্জযুক্ত কণা প্রোটন ও ইলেকট্রনকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুড়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কণাগুলোর গতি পৌঁছাতে পারে সেকেন্ডে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তুলনামূলকভাবে প্রচলিত রাসায়নিক রকেটের সর্বোচ্চ গতি প্রায় সেকেন্ডে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

আরও পড়ুন

এই প্লাজমা ইঞ্জিনটি এখন পরীক্ষা করা হচ্ছে। একটি বিশাল ১৪ মিটার লম্বা ভ্যাকুয়াম চেম্বারে আছে এটি। যেখানে মহাকাশের মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়। ইঞ্জিনটি ৩০০ কিলোওয়াট শক্তিতে কাজ করে এবং ইতিমধ্যে ২ হাজার ৪০০ ঘণ্টা টানা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই সময় মঙ্গল অভিযানের জন্য যথেষ্ট। যার মধ্যে আছে যাত্রার সময় এবং গতি কমানোর ধাপ।

তবে এই ইঞ্জিন পৃথিবী থেকে সরাসরি উৎক্ষেপণের জন্য না। প্রথমে একটি সাধারণ রকেট মহাকাশযানকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকেই প্লাজমা ইঞ্জিন চালু করে যানটিকে মঙ্গল গ্রহের দিকে ঠেলে নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এটি মহাকাশে মালামাল পরিবহন বা গ্রহের কক্ষপথে যন্ত্রাংশ সরানোর কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে।

ইঞ্জিনটি চালাতে ব্যবহার করা হবে হাইড্রোজেন জ্বালানি এবং শক্তির উৎস হিসেবে থাকবে একটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর। গবেষকদের মতে, হাইড্রোজেন হালকা হওয়ায় এতে কম জ্বালানিতে বেশি গতি পাওয়া যায়। এছাড়া মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন প্রচুর থাকায় ভবিষ্যতে অন্য গ্রহ থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

এখন পর্যন্ত এই ইঞ্জিনের থ্রাস্ট বা ধাক্কা দেওয়ার শক্তি প্রায় ৬ নিউটন, যা প্লাজমা ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। যদিও এটি রাসায়নিক রকেটের মতো হঠাৎ জোরালো ধাক্কা দেয় না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে আস্তে আস্তে গতি বাড়ায়।

প্লাজমা ইঞ্জিন একেবারে নতুন কিছু নয়। আগেও বিভিন্ন স্যাটেলাইট ও মহাকাশ মিশনে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি নাসার সাইক গ্রহাণু মিশনেও রাশিয়ার তৈরি প্লাজমা থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। তবে নতুন এই ইঞ্জিন নিয়ে দাবি করা এই গতি বর্তমান প্রযুক্তির প্রায় দ্বিগুণ।

তবু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত মহাকাশযান ব্যবহারে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অনুমোদন প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি মহাকাশচারীদের সুরক্ষা, তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকিরণ প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা, ইঞ্জিনটি এখনো মহাকাশে বাস্তবে পরীক্ষা করা হয়নি।

সব মিলিয়ে এই প্লাজমা ইঞ্জিন এখনো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি। কিন্তু যদি এটি সফল হয়, তাহলে মানুষ মঙ্গল গ্রহে যাতায়াতের সময় কমিয়ে এনে মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে।

সূত্র: ট্রইৎস্ক ইনস্টিটিউট

আরও পড়ুন