গোবি মরুভূমিতে ১৮টি ডাইনোসরের অদ্ভুত সমাধি

আসলে ওগুলো ছিল বিশাল এক ডাইনোসরের পায়ের ছাপ!ছবি: রয়টার্স

ডাইনোসরদের এক অদ্ভুত করুণ পরিণতির গল্প বলি। তবে এটা গল্প হলেও সত্যি। আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগের সত্যিকারের ঘটনা।

প্রায় ১৫ বছর আগের কথা। বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে অদ্ভুত কিছু গর্ত খুঁজে পেলেন। সেই গর্তগুলো কিন্তু যেনতেন গর্ত নয়! একেকটা গর্ত প্রায় ৩–৬ ফুট গভীর। মানে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষও সেখানে দিব্যি ডুবে যেতে পারবে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের ও অবাক বিষয় হলো, সেই গর্তের ভেতর একটার ওপর একটা ডাইনোসরের হাড় সাজানো ছিল। বিজ্ঞানীরা গুনে দেখলেন, সেখানে প্রায় ১৮টি ডাইনোসরের কঙ্কাল একটার পিঠে আরেকটা স্তূপ হয়ে আছে!

সবাই তো অবাক! এতগুলো ডাইনোসর একসঙ্গে এক গর্তে মরল কীভাবে? এটা কি কোনো গণকবর? কেউ কি ওদের মেরে পুঁতে রেখেছিল? কিন্তু তখন তো আর মানুষ ছিল না, তাহলে এ কাজ করবে? তাহলে কি কোনো ভয়ানক অসুখে ওরা একসঙ্গে মারা গেছে? হতে পারে!

অনেক গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এক দারুণ রহস্য ভেদ করলেন। ওই গর্তগুলো কী ছিল জানো? আসলে ওগুলো ছিল বিশাল এক ডাইনোসরের পায়ের ছাপ!

আরও পড়ুন

তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই তো? পায়ের ছাপ এত বড় আর গভীর হয় কীভাবে? আসলে বহু কোটি বছর আগে পৃথিবীতে সাওরোপড নামে বিশাল সব ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত। এরা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাণী। এদের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় হিসেবে ধরা হয় প্যাটাগোটাইটানকে। এরা লম্বায় হতো প্রায় ১২০ ফুট, মানে একটা বড় দালানের সমান! আর ওজন? প্রায় ৭০ টন! মানে একসঙ্গে ১০টি আফ্রিকান হাতির সমান ওজন ছিল এদের।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই বিশেষ গর্তগুলো তৈরি করেছিল মামেনচিসরাস নামে আরেক বিশাল ডাইনোসর। এদের গলা ছিল পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে লম্বা, প্রায় ৫০ ফুট!

আজ যেখানে চীনের গোবি মরুভূমি, প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে সেই জায়গাটা কিন্তু এমন শুকনো ছিল না। জায়গাটা ছিল জলার মতো, কাদাপানিতে থিকথিক করত। সেই নরম কাদামাটির ওপর দিয়ে যখন এই বিশাল ডাইনোসর হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন তার বিশাল ওজনের চাপে মাটি দেবে গিয়ে গভীর গর্ত তৈরি হতো। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে লিকুইফেকশন। মানে পায়ের চাপে মাটি অনেকটা তরল কাদার মতো হয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন

আর ঠিক সেই মরণফাঁদ দিয়েই যাচ্ছিল ছোট ছোট কিছু ডাইনোসর। এদের নাম ছিল লিমুসরাস। সঙ্গে ছিল টি-রেক্সের পূর্বপুরুষ গুয়ানলং। যেই না ওরা ওই বড় গর্তে পা দিয়েছে, অমনি কাদায় আটকে গেছে! ওরা দুই পায়ের ডাইনোসর ছিল, তাই চাইলেও আর উঠে আসতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, চার পায়ের প্রাণী বা বড় ডাইনোসররা হয়তো ওই গর্তে পড়েও গায়ে জোর খাটিয়ে উঠে আসতে পেরেছিল। গাড়ি যেমন কাদায় আটকে পড়লে চার চাকার সাহায্যে উঠে আসে, অনেকটা তেমন। কিন্তু বেচারা ছোট দুই পায়ের ডাইনোসরগুলোর আর রক্ষা পায়নি।

একটার পর একটা ডাইনোসর ওই গর্তে পড়েছে, আর বের হতে না পেরে ওখানেই মারা গেছে। এভাবেই একটার ওপর আরেকটা জমে ওদের হাড়গুলো ফসিল হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, এভাবে কাদার নিচে দ্রুত চাপা পড়ে যাওয়ার কারণেই কিন্তু ওদের হাড়গোড় এত চমৎকারভাবে সংরক্ষিত ছিল।

ওই বিশাল ডাইনোসরটা হয়তো আপনমনে ঘাস-পাতা খেতে খেতে হাঁটছিল। ওটা টেরই পায়নি যে ওর পায়ের ছাপগুলো ছোটদের জন্য কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে! প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল, তাই না? সেই ১৬ কোটি বছর আগের কাদার গর্ত আজ আমাদের শোনাচ্ছে এক করুণ মৃত্যুফাঁদের গল্প।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন