অদেখা ধূমকেতুর খোঁজে ইউরোপীয় নভোযান

নিওওয়াইজ ধূমকেতুছবি: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

উপহারের বাক্স কিনে বসে আছ, কিন্তু জানো না সেটা কাকে দেবে। অথবা স্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছ এমন কোনো ট্রেনের অপেক্ষায়, যার টাইমটেবিল বা গন্তব্য কিছুই তোমার জানা নেই। অদ্ভুত লাগছে, তাই না?

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ঠিক এমন অদ্ভুত একটা কাজই করতে যাচ্ছে। তারা মহাকাশে এমন এক মিশনে নামছে, যার লক্ষ্যবস্তু এখনো আবিষ্কৃতই হয়নি! এই মিশনের নাম কমেট ইন্টারসেপ্টর। বিজ্ঞানীরা মহাকাশে এক নতুন ফাঁদ পাততে যাচ্ছেন এমন এক ধূমকেতুকে ধরার জন্য, যে এখনো আমাদের সৌরজগতের ভেতরে আসেইনি।

সম্প্রতি এডিনবরা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর কলিন স্নডগ্রাস এবং তাঁর দল এই মিশনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। চলো শোনা যাক সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প।

সাধারণত মহাকাশ মিশনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা আগে টার্গেট ঠিক করেন, তারপর মহাকাশযান পাঠান। যেমন চাঁদে যাওয়ার অনেক বছর আগেই বিজ্ঞানীরা তা ঠিক করে রেখেছিলেন। আবার মঙ্গলে যে যাবে, তা অনেক আগে থেকেই আমাদের জানা। অর্থাৎ কোথায় যেতে হবে, তা সবাই জানে। কিন্তু এই মিশনে বিষয়টা ভিন্ন।

২০২৯ সালে এই নভোযান উৎক্ষেপণ করা হবে। পৃথিবী থেকে ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে মহাকাশের একটি বিশেষ পার্কিং স্পট আছে। সেটির নাম ল্যাগ্রঞ্জ পয়েন্ট-২। সেখানেই গিয়ে নভোযানটি ঘাপটি মেরে বসে থাকবে অনেকটা শিকারির মতো, অপেক্ষা করবে নতুন কোনো ধূমকেতুর জন্য। আমাদের সৌরজগতের ভেতরের আগে কখনো আসেনি, এমন কোনো মহাজাগিত বস্তু দেখা মিললেই তার তথ্য পাঠাবে পৃথিবীতে।

আরও পড়ুন

কেন এই অচেনা অতিথির খোঁজ

আসলে যে ধূমকেতু আগেও এসেছে এবং বারবার আসে, সেগুলো সূর্যের কাছে আসতে আসতে সূর্যের তাপে তাদের ওপরের অনেক আদিম উপাদান নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু যে ধূমকেতু প্রথমবারের মতো আসছে, সেটা একদম অক্ষত। মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়কার উপাদানগুলো তার মধ্যে অবিকৃত অবস্থায় থাকে। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে এদের গুরুত্ব অনেক বেশি।

চাইলেই কি ধরা দেবে এমন ধূমকেতু

এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। কারণ, মহাকাশ অসীম এবং আমাদের নভোযানের ক্ষমতা সীমিত। চাইলেই যেকোনো ধূমকেতুর পিছু নেওয়া যাবে না। শিকার ধরতে হলে সেটাকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। শর্তগুলো হলো:

১. জ্বালানির সীমাবদ্ধতা: নভোযানটির চলার ক্ষমতা সীমিত। তাই ধূমকেতুটিকে এমন পথে আসতে হবে, যা পৃথিবী বা নভোনের নাগালের ভেতরে রয়েছে।

২. সঠিক রুট: ধূমকেতুটিকে অবশ্যই পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি দিয়ে যেতে হবে।

৩. গতিবেগ: এখানেই সবচেয়ে বড় ঝামেলা। ধূমকেতুটির পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় মহাকাশযানের গতি সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটারের বেশি হওয়া যাবে না। গতি এর চেয়ে বেশি হলে ধূমকেতুর লেজ থেকে আসা ধূলিকণার আঘাতে মহাকাশযানের ছোট প্রোবগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

৪. গ্যাসের পরিমাণ: ধূমকেতু থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস বা ধুলা বের হতে হবে, যাতে গবেষণা করা যায়। কিন্তু সেটা আবার হ্যালির ধূমকেতুর মতো এত বেশি হওয়া যাবে না, যাতে মহাকাশযানটিই নষ্ট হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

অতীতে এমন ধূমকেতু কি পাওয়া গেছে

বিজ্ঞানীরা ১৮৯৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আসা ১৩২টি নতুন ধূমকেতুর ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন, এদের মধ্যে কয়টিকে এই নভোযান দিয়ে ধরা যেত। ফলাফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সবচেয়ে জুতসই ধূমকেতুগুলো হয় অনেক দূর দিয়ে গেছে, অথবা সেগুলোর নাগাল পেতে প্রচুর জ্বালানি লাগত। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। গত ২৫ বছরের মধ্যে অন্তত ৩টি এমন ধূমকেতু পাওয়া গেছে, যেগুলো এই মিশনের শর্ত পূরণ করত। যেমন ২০০১ সালে আবিষ্কৃত ‘C/2001 Q4 (NEAT)’ ধূমকেতুটি বেশ ভালো প্রার্থী ছিল। যদিও এর গতিবেগ ছিল সেকেন্ডে ৫৭ কিলোমিটার, তবু এটি নাগালের মধ্যেই ছিল।

আরও পড়ুন

অন্ধকারে ঢিল ছোড়া

এখন প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে এমন ধূমকেতু আসবে কি না, তা আমরা জানব কী করে? এখানেই ত্রাতা হিসেবে আসছে ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি। চিলির এই বিশাল টেলিস্কোপ আকাশের দিকে নজর রাখবে। আশা করা হচ্ছে, এটি অনেক আগেই নতুন ধূমকেতু শনাক্ত করতে পারবে, যাতে আমাদের এই ‘ধূমকেতু ধরার নভোযানটি’ প্রস্তুত হওয়ার সময় পায়। এই মিশন আসলে মহাকাশবিজ্ঞানীদের এক বিশাল বাজি। হাজারটা শর্ত মিললে তবেই মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত দেখা। আদর্শ বা পারফেক্ট টার্গেট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। হয়তো মিশন অপারেটরদের মোটামুটি ভালো কোনো ধূমকেতুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তবে যদি কপাল ভালো হয়, আর সত্যিই যদি কোনো নক্ষত্রমণ্ডল থেকে আসা ইন্টারস্টেলার অতিথি আমাদের ফাঁদে ধরা দেয়, তবে সেটা হবে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

সূত্র: ইউনিভার্স টুডে

আরও পড়ুন