ট্রেনের বাড়ি কই?
অর্হ অপরাজিতা রাসয়াত নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির সামার রাইটিং প্রোগ্রামে নন ফিকশন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কারের নাম দ্য হার্টস অব হোম অ্যাওয়ার্ড। এই খবর নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সঙ্গে তার লেখাটিও ছাপা হয়েছে। লেখাটি অর্হ লিখেছে ইংরেজিতে। বাংলা অনুবাদ থাকল কিশোর আলোর পাঠকের জন্য।
ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাতদুপুরে ওই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে—
ট্রেনের বাড়ি কই?
আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, শামসুর রাহমানের এই ট্রেনের কবিতাটি আমার খুব প্রিয় ছিল। কবিতাটি শুনলেই আমি কল্পনা করতাম, ট্রেনে চড়ে মাঠ পেরিয়ে বনের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছি। পুলের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রেনের চাকায় ঝনঝন করে বাজনা বাজছে। আমি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমার ঘোরার যেন কোনো শেষ নেই। ট্রেনটি হয়তো একটু থামবে, তারপর আমাকে নিয়ে আবার ছুটে যাবে নতুন কোনো জায়গায়।
তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন আমি ক্লাসের সবার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কবিতাটিই আবৃত্তি করছিলাম। সেদিন আমাদের ক্লাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হচ্ছিল। আমার মা আর আমার বন্ধু জোয়ার মা মিলে এই আয়োজন করেছিলেন। আমরা ঠিক করেছিলাম, নিউইয়র্কে আমাদের স্কুলে আমরা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি আর সঙ্গে করে নিয়ে আসা গল্পগুলো সবাইকে বলব।
মা আর আমি মিলিয়ে লাল-সবুজ শাড়ি পরেছিলাম। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম সন্দেশ। শাড়ি পরে সবার সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা বলতে আমার একটু লজ্জা লাগছিল। আবার ভেতরে–ভেতরে বেশ আনন্দও হচ্ছিল।
আমার ক্লাসের বেশির ভাগ বন্ধুর মতো আমি নিউইয়র্কে জন্মাইনি। ২০২৩ সালে, মাত্র তিন বছর আগে, আমি বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছিলাম। তখন সবে প্রথম শ্রেণি শেষ করেছি। আমার মা নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পড়তে এসেছিলেন। আমার বন্ধুরা সবাই দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠল। আর আমি আমার ছোট্ট জীবনটাকে দুটি স্যুটকেসে ভরে নিউইয়র্কে চলে এলাম।
আমি ভেবেছিলাম, নিউইয়র্কে থাকার অভিজ্ঞতা খুবই দারুণ হবে। কিন্তু এখানে এসেই বুঝলাম, শহরটি যতই দারুণ হোক, এটি আমার বাড়ি নয়। মাঝেমধ্যে মনে হতো, আমার সেই দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ট্রেনটি হঠাৎ থেমে গেছে।
এখানে সবকিছুই আমার কাছে অচেনা। কোনো কিছুর সঙ্গেই আমার পরিচিত জীবনের মিল ছিল না। বাংলাদেশে আমার প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু নিউইয়র্কে কেউ ‘ক্লাসে’ পড়ে না, সবাই ‘গ্রেডে’ পড়ে। আমার বয়স তখন আট বছর। তাই আমাকে বলা হলো, দ্বিতীয় নয়, তৃতীয় গ্রেডে যেতে হবে। নিউইয়র্কে আমার বয়সী সবাই তৃতীয় গ্রেডেই পড়ে। আমাকেও সেই নিয়ম মেনে নিতে হলো।
ক্লাসের পড়াশোনা খুব একটা কঠিন ছিল না। ইংরেজি বা গণিত আমাকে খুব বেশি ভোগায়নি। কিন্তু নিউইয়র্কের আদবকায়দা আর কোনো কথা কীভাবে বলতে হয়, সেগুলো শিখতে গিয়ে আমি সত্যিই হিমশিম খাচ্ছিলাম! প্রতিটি দিনই যেন ছিল নতুন এক লড়াই। আমি যতই ঠিকভাবে কিছু করার চেষ্টা করতাম, কীভাবে যেন কোনো না কোনো ঝামেলা হয়ে যেত।
একদিন আমাদের ক্লাসে একজন অতিথি এলেন। তাঁকে দেখতে আমার কাছে একেবারে মোমের পুতুলের মতো মনে হলো। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কি চীনা?’ আমার কথা শুনে পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল।
পরে আমার মায়ের কাছে অভিযোগ গেল যে আমি কারও জাতিগত পরিচয় নিয়ে মজা করেছি। নিউইয়র্কে এভাবে কারও পরিচয় নিয়ে কথা বলা অন্যায় হতে পারে। কিন্তু আমি তখন সেটি কীভাবে জানব? আমার জন্য তো সবকিছুই নতুন ছিল!
সবচেয়ে নতুন ব্যাপার ছিল, এই শহরে সারা পৃথিবীর মানুষ একসঙ্গে থাকে। প্রত্যেকের চেহারা, ভাষা, পোশাক, খাবার আর সংস্কৃতি আলাদা। আমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগত। আমি কৌতূহল থেকে জানতে চাইতাম, কে পৃথিবীর কোন জায়গা থেকে এসেছে।
বাংলাদেশে আমার চারপাশের বেশির ভাগ মানুষকে দেখতে মোটামুটি একই রকম মনে হতো। তাই একই শহরে এত রকমের মানুষ দেখে তাদের সম্পর্কে জানতে চাওয়া আমার কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল। পরে বুঝেছি, কাউকে শুধু চেহারা দেখে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে সে অস্বস্তি পেতে পারে। কারণ, এই শহরে মানুষের চেহারা ও জাতিগত পরিচয়ের জন্য তাদের সঙ্গে অন্যায় করার অনেক পুরোনো ইতিহাস আছে।
আমার মা শিক্ষকদের বোঝালেন যে আমি কাউকে নিয়ে মজা করতে চাইনি। আমি শুধু কৌতূহলী ছিলাম। শিক্ষকেরা বিষয়টি বুঝতে পারলেন। কিন্তু আমার অনেক সহপাঠী তখনো আমার মনের কথাটি বুঝতে পারেনি।
আমাদের স্কুলে দক্ষিণ এশিয়ার শিশুও ছিল হাতে গোনা মাত্র দুই-তিনজন। মাঝেমধ্যে মনে হতো, আমরা যেন সেখানে থেকেও চোখে পড়ি না। আমাদের ভাষা, খাবার বা গল্পের কথা কেউ জানে না।
তারপর নিউইয়র্কে শীত এল।
আমি সব সময় ভাবতাম, আকাশ থেকে তুষার পড়া বুঝি খুব জাদুকরি একটি ব্যাপার। প্রথম কয়েক দিন সত্যিই তা-ই মনে হয়েছিল। কিন্তু তীব্র ঠান্ডায় যখন আমার হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠত, তখন আর তুষারকে তেমন জাদুকরি লাগত না।
নিউইয়র্ক আমার বাড়ি নয়—এই অনুভূতি আরও বেড়ে গেল। আমি বাংলাদেশকে খুব মিস করতাম। নানু, বাবা, খালা, ফুপি—সবাইকে মনে পড়ত। আর সবচেয়ে বেশি মিস করতাম চারপাশে বাংলা কথা শুনতে। প্রায় প্রতি রাতেই আমার মন খারাপ হতো। আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাইতাম।
টেইলর সুইফটের একটি গানে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক নাকি সবার জন্য অপেক্ষা করে। আমার কাছে কথাটা একেবারেই ভুল মনে হতো। আমার মনে হতো, নিউইয়র্ক কারও জন্য অপেক্ষা করে না। শহরটি এত দ্রুত ছুটছে যে আমি তার সঙ্গে তালই মেলাতে পারছি না। এই শহর কখনো আমার বাড়ি হবে না।
সে সময় আমরা ম্যানহাটনের হারলেমে থাকতাম। হারলেম আফ্রিকান আমেরিকানদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। এখানকার মানুষ গান, কবিতা, গল্প, শিল্প আর আন্দোলনের মাধ্যমে আমেরিকায় নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছেন। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও ছড়িয়ে আছে এই এলাকায়।
আমাদের বাড়ির চারপাশেই ছিল ঐতিহাসিক সব জায়গা। ব্যাপারটা এমন যে মা আর আমি কাঁচাবাজার করতে বেরিয়েও কোনো ঐতিহাসিক জায়গা দেখে বাড়ি ফিরতাম।
আমরা লাইব্রেরি থেকে হারলেমের ইতিহাস নিয়ে বই আনতাম। পড়ে বোঝার চেষ্টা করতাম, এখানকার মানুষ কীভাবে নিজেদের গল্প বলে আমেরিকার বুকে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন।
এক রাতে মন খারাপ করে আমরা একটা বই পড়ছিলাম। হঠাৎ মা বইটা বন্ধ করে বললেন, ‘অর্হ, শুধু অন্যদের গল্পের ভেতর নিজেদের খুঁজলে হবে না। আমাদের নিজেদের গল্পও বলতে শিখতে হবে।’
সেই রাতেই মা আমার বন্ধু জোয়ার মা আমেনাকে ফোন করলেন। জোয়া আমেরিকায় জন্মেছে, কিন্তু তার পরিবার পাকিস্তানি। সে ছিল আমাদের স্কুলের মাত্র তিনজন দক্ষিণ এশীয় শিশুর একজন।
মা আর জোয়ার মা কথা বলে ঠিক করলেন, আমরা স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করব।
আমাদের স্কুলের শিশুরা হয়তো জানত না, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলায় কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য সালাম, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, নিজের মাতৃভাষা প্রত্যেক মানুষের কাছেই কতটা প্রিয়। তারা আরও জানতে পারবে, এই ঘটনার সম্মানে ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে।
ভাষাশহীদেরা শুধু আমাদের বাংলায় কথা বলার অধিকার রক্ষা করেননি। তাঁরা পৃথিবীকে দেখিয়েছেন, নিজের ভাষা ও পরিচয় রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন বাংলাদেশি হিসেবে নিউইয়র্কে থেকেও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উদ্যাপন করার একটা তাগিদ আমরাও অনুভব করলাম।
আমাদের ক্লাস শিক্ষক ভ্যালরি ও ফ্রান এই প্রস্তাব শুনেই খুব খুশি হলেন। তারপর অবশেষে সেই অপেক্ষার দিনটি এল।
ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সবচেয়ে ঠান্ডা মাসগুলোর একটি। বাইরে তখন চারদিকে তুষার। কিন্তু আমাদের ক্লাসরুমটি নানা রং, খাবারের গন্ধ আর ভালোবাসায় উষ্ণ হয়ে উঠেছিল।
মা-বাবারা নিজেদের দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এসেছিলেন। সবাই বাড়ি থেকে নিজের দেশের কোনো না কোনো খাবার নিয়ে এসেছিল। একে একে প্রতিটি পরিবার এমন কিছু সবার সামনে তুলে ধরল, যা তাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ।
প্রথমে আমার বন্ধু বেনজিরের মা আমাদের ইতালির একটি গল্প শোনালেন—লা চিকালা এ লা ফোরমিকা। এটি ঈশপের পিঁপড়া আর ঘাসফড়িংয়ের গল্পের ইতালীয় রূপ।
বন্ধু বেনজিরের মা বললেন, ‘আমি পিঁপড়ার চেয়ে ঘাসফড়িংকেই বেশি পছন্দ করি। আমার মনে হয় না, জীবন মানে শুধু সব সময় জিনিস জমিয়ে রাখা। স্বাধীনভাবে বাঁচা, সুন্দর কিছু তৈরি করা, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং পৃথিবীতে গান, গল্প আর দয়া রেখে যাওয়াও জীবনের অংশ।’
আমার আরেক বন্ধু রেইনের মা আমাদের একটি পুরোনো আইরিশ আশীর্বাদ শোনালেন—
‘বাতাস যেন সব সময় তোমাকে সামনে এগিয়ে দেয়।
সূর্যের আলো যেন তোমার মুখ উষ্ণ রাখে।
বৃষ্টি যেন তোমার মাঠে নরম হয়ে ঝরে।
আর আমাদের আবার দেখা না হওয়া পর্যন্ত
ঈশ্বর যেন তোমাকে তাঁর হাতের তালুতে রাখেন।’
গডউইন আর তার মা মিলে একটি সুন্দর মেক্সিকান গান গাইল।
আমার সহপাঠী শৌজোর মা জাপানি ভাষায় একটি বিখ্যাত গল্প শোনালেন—নাসেবা নারু। গল্পটা সামুরাই ইয়োজান উয়েসুগির নামে প্রচলিত।
শৌজোর মা বুঝিয়ে বললেন, ‘চেষ্টা করলে তুমি পারবে। কোনো কাজ কেন সম্ভব নয়, তা নিয়ে শুধু ভাববে না। কীভাবে কাজটি করা যায়, সেটি ভাবো। তারপর চেষ্টা শুরু করো।’
সবশেষে এল আমাদের পালা।
মা আর আমি ক্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর আমরা বাংলায় ট্রেনের কবিতাটি আবৃত্তি করলাম। আমি সেটাকে আবার ইংরেজিতে অনুবাদ করে বললাম। কবিতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার সহপাঠীরা হাততালি দিল। সেই প্রথম আমার মনে হলো, ওরা আমাকে বিচার করছে না। ওরা সত্যিই আমার গল্প শুনছে।
অনুষ্ঠানের শেষে সবাই মিলে নানা দেশের খাবার ভাগ করে খেলাম। পুরো ক্লাসরুমে যেন সারা পৃথিবীর গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের সন্দেশ, জাপানের মোচি, ইতালির ক্যানোলি, মেক্সিকোর ওরেহাসহ আরও কত মজার খাবার!
খাবার আর গল্প ভাগাভাগি করতে করতে আমি একটি কথা বুঝতে পারলাম— ক্লাসে আমিই একমাত্র মানুষ নই, যার মনের ভেতর দুটি বাড়ি আছে।
আমার অনেক সহপাঠীও নিজের নিজের যাত্রার মধ্যে ছিল। কেউ অন্য দেশ থেকে এসেছে। কারও মা-বাবা বা দাদা-দাদি, নানা-নানি অন্য দেশ থেকে এসেছেন। আমার প্রিয় কবিতার ট্রেনটির মতো আমরাও সবাই কোথাও না কোথাও থেকে যাত্রা শুরু করেছি। কারও যাত্রা অনেক লম্বা। কারও যাত্রা একটু বেশি কঠিন। কিন্তু কীভাবে যেন আমাদের সবার ট্রেন এসে একই ক্লাসরুমে থেমেছে।
সেদিন বিকেলে আমি অবশেষে কবিতাটির মানে নিজের মতো করে বুঝতে পারলাম। হয়তো ট্রেনের শুধু একটিই বাড়ি থাকে না। হয়তো সে যেখানে যায়, নিজের বাড়িটাকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। আমিও তো তা-ই করেছি।
বাংলাদেশে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর নিউইয়র্কে সেই যাত্রা এগিয়ে চলেছে। আমাকে এই দুটি জায়গার মধ্যে শুধু একটিকে বেছে নিতে হবে না। ট্রেনের মতো আমিও একটি বাড়িকে মনের ভেতর নিয়ে আরেকটি বাড়ি খুঁজে নিতে পারি।
সেদিনই প্রথম নিউইয়র্ককে আমার নিজের বাড়ি বলে মনে হলো।