শুধু পাঁচটা নয়, মানুষের আছে আরও অনেক ইন্দ্রিয়

মিডজার্নি

ছোটবেলা থেকে আমরা জানি, মানুষের ইন্দ্রিয় নাকি মাত্র পাঁচটি। দেখা, শোনা, গন্ধ নেওয়া, স্বাদ নেওয়া আর স্পর্শ করা। স্কুলের বই, চার্ট, এমনকি আলাপের মধ্যে এই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের কথা ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টা এত সরল নয়। মানুষের ইন্দ্রিয় আসলে পাঁচটির অনেক বেশি। কেউ বলেন ২২টি, কেউ বলেন ৩৩টি পর্যন্ত।

নতুন গবেষণা বলছে, অনুভব করার ক্ষমতা কোনো একক সেন্সর দিয়ে কাজ করে না। চোখ, কান, নাক, জিব আর ত্বক আলাদাভাবে কাজ করে না। এরা সব সময় একসঙ্গে কাজ করে। একে অন্যকে প্রভাবিত করে। সব মিলেমিশে আমাদের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

প্রতিদিনের জীবনে ইন্দ্রিয়গুলো একদম নীরবে কাজ করে চলে বলে আমরা খুব একটা খেয়াল করি না। সকালে দাঁত মাজতে গিয়ে টুথপেস্টের ঝাঁজ, গোসলের সময় পানির শব্দ আর শরীরে পানির স্পর্শ, শ্যাম্পুর গন্ধ—সবকিছু মিলিয়েই আমাদের সকাল শুরু হয়। এই অনুভূতিগুলো কখনোই আলাদাভাবে কাজ করে না। আমরা সচেতনভাবে এগুলো তেমন টের পাই না।

আরও পড়ুন

ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, ইন্দ্রিয় বুঝি শুধু চোখ আর কানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আসলে আমরা সব সময়ই অনুভব করি। কোনটা কঠিন, কোনটা মসৃণ, কাঁধে টান লাগছে কি না, হাতে ধরা খাবারটা কেমন—এসব অনুভূতি আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত জানিয়ে দিচ্ছে।

প্রশ্ন হতে পারে, এত যদি ইন্দ্রিয় হয়, তাহলে পাঁচ ইন্দ্রিয়ের ধারণা এল কোথা থেকে? এর পেছনে আছেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। তিনিই প্রথম মানুষের পাঁচ ইন্দ্রিয়ের কথা বলেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, অ্যারিস্টটল একই সঙ্গে বিশ্বাস করতেন, পৃথিবী তৈরি হয়েছে পাঁচটি উপাদান দিয়ে। আধুনিক বিজ্ঞান আর এ ধারণা মানে না। একইভাবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঠিক তেমনি ইন্দ্রিয়ের সংখ্যাও পাঁচে আটকে নেই।

আমরা যেভাবে পৃথিবীকে অনুভব করি, তা আসলে আলাদা আলাদা অনুভূতির যোগফল নয়; বরং একধরনের মিলিত অভিজ্ঞতা। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক চুলের কথা। শ্যাম্পুর গন্ধ যদি সুন্দর হয়, তাহলে চুল আমাদের কাছে আরও মসৃণ মনে হয়। গোলাপের গন্ধ থাকলে চুল যেন বেশি সিল্কি লাগে। একইভাবে কম চর্বিযুক্ত দইও নির্দিষ্ট গন্ধের কারণে বেশি ঘন বা ক্রিমি মনে হতে পারে।

আরও পড়ুন

স্বাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক এমনই। আমরা সাধারণত ভাবি, জিব দিয়েই স্বাদ পাই। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, স্বাদ আসলে তিনটি ইন্দ্রিয় একসঙ্গে কাজ করার ফল। জিব আমাদের বলে দেয়, খাবারটা মিষ্টি, টক, নোনতা না তেতো? নাক গন্ধের তথ্য যোগ করে। আর মুখের ভেতরের স্পর্শ অনুভূতি জানায় খাবারটা শক্ত, নরম, ক্রিমি না খসখসে। এই তিনটি মিলেই তৈরি হয় আসল ‘ফ্লেভার’।

এ কারণেই আমাদের জিবে ‘আম’ বা ‘স্ট্রবেরি’র জন্য আলাদা কোনো রিসেপ্টর নেই। ফলের স্বাদ মূলত আসে এর গন্ধ থেকে। চিবানোর সময় খাবারের গন্ধ মুখের ভেতর দিয়ে নাকে পৌঁছে যায়, আর তখনই আমরা পুরো স্বাদ অনুভব করি।

পাঁচটির বাইরে যে ইন্দ্রিয়গুলো আছে, সেগুলোর কথা আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক চার্লস স্পেন্সসহ অনেক বিজ্ঞানীর মতে, মানুষের ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা ২২ থেকে ৩৩–এর মধ্যে হতে পারে।

এর মধ্যে আছে প্রোপ্রিওসেপশন, যার সাহায্যে চোখ বন্ধ রেখেও আমরা জানি হাত-পা ঠিক কোথায় আছে। আছে ভারসাম্যবোধ, যা কানের ভেতরের ভেস্টিবুলার সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে। ইন্টারোসেপশন আরেকটি ইন্দ্রিয়, এর মাধ্যমে আমরা নিজের শরীরের ভেতরের পরিবর্তন বুঝি। ক্ষুধা লাগা, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তি অনুভব করা অন্য ইদ্রিয়। আমাদের এজেন্সি সেন্স আছে। এই অনুভূতি দিয়ে আমরা জানি, ‘এই হাতটা আমি নিজেই নড়াচ্ছি।’ আবার আছে ওনারশিপ সেন্স। নিজের শরীর যে নিজেরই, সেই বোধ।

আরও পড়ুন

স্ট্রোকের রোগীদের মধ্যে কখনো কখনো এই অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ নিজের হাতকে নিজের বলে মনে করতে পারেন না, আবার কারও মনে হয়, অন্য কেউ যেন তাদের হাত নাড়াচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ইন্দ্রিয় শুধু অনুভূতির বিষয় নয়। এগুলো আমাদের ‘আমি’ বোধের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

ইন্দ্রিয় নিয়ে গবেষণার দুনিয়ায় মজার সব ফল পাওয়া যাচ্ছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, নিজের পায়ের শব্দ যদি ভারী শোনানো হয়, তাহলে মানুষ নিজেকেও ভারী মনে করে। বিমানে খাবারের স্বাদ বদলে যায়; কারণ, বিমানের শব্দ আমাদের স্বাদ গ্রহণকে প্রভাবিত করে। এমনকি প্লেনে টমেটো জুস বেশি সুস্বাদু লাগে; কারণ, শব্দের কারণে উমামি স্বাদ তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়।

চোখও সব সময় একা সিদ্ধান্ত নেয় না। বিমানে উড্ডয়নের সময় অনেকেরই মনে হয়, কেবিনের সামনের দিকটা উঁচু। অথচ চোখে দেখা দৃশ্য প্রায় একই থাকে। আসলে কানের ভারসাম্য ব্যবস্থা আমাদের জানায়, আমরা পেছনের দিকে হেলছি। এই তথ্য চোখের সঙ্গে মিশে গিয়ে এমন অনুভূতি তৈরি করে। লন্ডনের এক প্রদর্শনীতে একবার মানুষকে একই ওজনের ছোট আর বড় আকারের পাথর তুলতে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় সবাই বলেছে, ছোট পাথরটা বেশি ভারী। পরে মেপে দেখা যায়, সব পাথরের ওজন একেবারে সমান।

এই ছোট ছোট বিভ্রম থেকে এখন বিজ্ঞানীরা জানেন, আমাদের ইন্দ্রিয় খুব জটিল, একে অন্যের সঙ্গে মিলে কাজ করে।

সূত্র: সাই-টেক ডেইলি

আরও পড়ুন